S M Salman Rashid Shanto
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০৬:১০পি এম

গল্পে গল্পে মনোবিজ্ঞানঃ Post Traumatic Stress Disorder (PTSD)

গল্পে গল্পে মনোবিজ্ঞানঃ Post Traumatic Stress Disorder (PTSD) Ad Banner

Post Traumatic Stress Disorder (PTSD)   

নুরুল ইসলাম সাহেব সেনাবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। তিনি জীবনে অনেকগুলো সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং যুদ্ধ জয় করেছেন। শান্তি রক্ষা মিশনে গিয়েও তার সাফল্যের ধারা অব্যাহত ছিলো। কিন্তু কিছুদিন আগে সে একটা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে যেখানে তার সহযোগী অনেক যোদ্ধা হতাহত হন, অনেক বেসামরিক নাগরিক হত্যা ও ধর্ষণের স্বীকার হন। যুদ্ধে তাদের বিজয় হলেও এসব বিষয় তার মাথা থেকে সরছিল না।

বারবার তিনি এসব বিষয়ে চিন্তা করে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। খুব সামান্য বিষয়ে অযথা রেগে যাওয়া, খারাপ ব্যবহার করা শুরু করেন। তিনি শত চেষ্টা করেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছিলেন না। এডভেঞ্চার প্রিয়, যুদ্ধ জেতা নুর সাহেব কিনা কোনো মুভির একশন দৃশ্য পর্যন্ত এখন দেখতে পারেন না। রাস্তায় গাড়ির হর্ণ শুনলেও বিচলিত হয়ে যান দৃঢ়চেতা এই সৈনিক। তার পরিবার তার ব্যাপারে উদ্বীগ্ন হয়ে পড়ে। তারা নুরুল ইসলাম সাহেবকে নিয়ে একজন প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানীর কাছে যান। তিনি বলেন, নুর সাহেব PTSD বা Post Traumatic Stress Disorder এ আক্রান্ত হয়েছেন।     

আসুন এবার পিটিএসডি সম্পর্কে জানি। দেখা যাক নুর সাহেবের সত্যিই পিটিএসডি হয়েছে কিনা।   

🌿PTSD কি?   

Post Traumatic Stress Disorder বা PTSD হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা যখন একজন ব্যাক্তি কোন ট্রমাটিক ইভেন্ট বা আঘাতজনিত ঘটনার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে বাধাগ্রস্ত হয়। যেমনঃ সম্মুখ যুদ্ধ, যেকোনো ধরণের গুরুতর দুর্ঘটনা, ধর্ষণ, অপহরণ, শৈশবের খারাপ অভিজ্ঞতা তথা চাইল্ড এবিউজ ইত্যাদি। এসব ঘটনা ব্যক্তির নিজের সাথে ঘটলে বা চাক্ষুষ দেখলে অনেক সময় সে ঐ ঘটনার কথা ভুলতে পারেনা। দুর্ঘটনা বা আঘাত পরবর্তী ব্যক্তির মানসিক অবস্থাকেই PTSD বলা হয়ে থাকে।   

🌿PTSD এর লক্ষণঃ   

সাধারণত কোনো একটি ট্রমাটিক ইভেন্টের এক মাসের মধ্যেই ব্যক্তির মধ্যে PTSD এর লক্ষণগুলো দেখা যায়। কখনো কখনো একবছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও এর লক্ষণ প্রকাশিত হতে পারে। PTSD এর লক্ষণগুলোকে আমরা চারটি পর্বে ভাগ করতে পারি।     

√ Intrusive Memories:     -আঘাত জনিত ঘটনার স্মৃতি বার বার মনে হওয়া।  -এমনভাবে এই ঘটনাটিকে অনুভব করা যেন বর্তমানে ঘটনাটি সংঘটিত হচ্ছে।  -এমন কোন সংকেত বা শারীরিক চিহ্ন যা ব্যক্তিকে ঘটনা সম্পর্কে মনে করিয়ে দেয়। (Flashback)    -ট্রমাটিক ইভেন্ট সংক্রান্ত দুঃস্বপ্ন দেখা।   

√ Avoidance:     -আঘাতজনিত ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ভুলে থাকার চেষ্টা করা।  -ঘটনা মনে করিয়ে দেয় এমন ব্যক্তি, স্থান, জায়গা, বা বিষয়কে এড়িয়ে চলা।   

 √Negative Changes in thinking and mood:    -নিজের বা অন্যের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা।  -ভবিষ্যত সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত হওয়া।  -পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি হওয়া।  -পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া।  -আঘাতজনিত ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মনে করতে না পারা।   -নিজেকে আবেগহীন মনে করা এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করতে না পারা।   

√ Changes in physical and emotional reactions:    -কোনো কিছু নিয়ে সহজেই ভীত সন্ত্রস্ত হওয়া।  -সারাক্ষণ এই চিন্তায় মগ্ন থাকা যে এই বুঝি খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে।  -ব্যক্তি অনেক সময় নিজের ক্ষতি করে থাকে। যেমনঃ অত্যধিক মদ্যপান, ড্রাগ এডিকশন বা আত্মহত্যার চেষ্টা করা।  -PTSD তে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুমে সমস্যা হয়। সহজেই কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে পারেনা।   -সামান্য কারণেই ব্যক্তি বিরক্ত হয়, রেগে যায়, বা আক্রমণাত্মক আচরণ করে।      **ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যাদের বয়স ৬ বছর বা তার নিচে তারা খেলার মাধ্যমেই তাদের PTSD এর লক্ষণগুলো প্রকাশ করে। অনেক সময় তারা আঘাতজনিত ঘটনা সংক্রান্ত স্বপ্নও দেখে থাকে।     

🌿PTSD এর কারণঃ   

সাধারণত কোনো একটি দুর্ঘটনার বাস্তব অভিজ্ঞতা বা চাক্ষুষ সাক্ষী হলে ব্যক্তির মধ্যে  Post Traumatic Stress Disorder দেখা দিতে পারে। এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে যেগুলো সচরাচর PTSD এর ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। 

-কোনো একটি ট্রমাটিক ইভেন্ট যদি ব্যক্তির মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটায়। এক্ষেত্রে ঘটনার ভয়াবহতার উপর নির্ভর করবে PTSD  কেমন প্রভাব ফেলবে।       -Anxiety বা Depression এর পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ব্যক্তির PTSD হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। 

 -মানব মস্তিষ্কের রাসায়নিক ও হরমোন ক্ষরণ জনিত তারতম্য এর একটি কারণ।  -বংশগত আচরণ, মানসিক ও দৈহিক প্রকৃতি বা মেজাজ ও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।   

🌿 Risk Factors:   

কিছু বিষয় PTSD এর ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তি জীবনে এসবের প্রভাব পিটিএসডিকে তরান্বিত করে। যেমনঃ দীর্ঘদিন যাবত কোনো ট্রমাতে থাকলে, চাইল্ড এবিউজের স্বীকার হলে, জীবনের ঝুঁকি থাকে এমন কাজ করলে (মিলিটারি জব), পরিবারের বা বন্ধুদের সাপোর্ট না পেলে, উদ্বেগ বা বিষন্নতায় ভুগলে, ড্রাগ এডিকশন থাকলে, পরিবারের কারো মানসিক সমস্যার ইতিহাস থাকলে ব্যক্তির মধ্যে PTSD এর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।   

🌿 প্রতিকার ও চিকিৎসাঃ   

আঘাতজনিত দুর্ঘটনা পরবর্তী মানসিক সমস্যার জন্য আমরা একজন ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারি। এক্ষেত্রে ওষুধ ও থেরাপি দুটোই কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। Cognitive Behaviour Therapy (CBT), Family Therapy এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। রোগীর অবস্থা বেশি নাজুক হলে ওষুধ দেয়া যেতে পারে।   

PTSD এর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো আত্মহত্যার প্রবণতা। ব্যক্তি সামাজিকভাবে এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে আমরা অনেকে বুঝতেই চাই না যে তার একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ দরকার। এই অবস্থায় পরিবার ও কাছের মানুষের সহযোগিতা ও প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে। তাই সকলের উচিত কাছের মানুষটির খোজ নেয়া। যেমন করে নুর সাহেবের পরিবার তার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেছেন।   

©সালমান রশিদ শান্ত  মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাবি।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ