Belal Uddin
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০২:১৩পি এম

নজর

নজর Ad Banner

[১] গা গুলিয়ে বমি আসছে৷ মনে হচ্ছে এক ঝাঁক মৌমাছি মাথার ভিতর গোল্লাছুট খেলছে। কাঁপা কাঁপা পায়ে বেসিনে গেলাম৷ মাথায় পানি ঢেলে কোনোমতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম৷ ঘুমোতে চেষ্টা করছি৷ কিন্তু কিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারছিনা৷     

আজ দেড় বছর হয় অর্ণবের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে৷ এই দেড় বছরেও অর্ণব আমার সাথে এত খারাপ আচরণ করেনি৷ যেটা আজ করলো! এমনকি গায়েও হাত দিতে নিয়েছিলো। পাশের রুম থেকে শ্বাশুড়ি এসে ধরায় আর গালে চড় মারতে পারেনি৷ কীভাবে পারলো ও! কীভাবে!     

কয়েকমাস পর আমাদের অনাগত সন্তান দুনিয়ায় আসছে সেটা জেনেও আমার সাথে এমন করলো! আর কোনো কিছু ভাবতে পারছেনা আয়রা৷ অর্ণবের এহেন আচরণে বিরাট বড় ধাক্কা খেয়েছে সে৷ নিজেকে যেন কোনোভাবেই সামলাতে পারছেনা। 

মোবাইল হাতে নিয়ে ফেইসবুকে লগ ইন করে ছোট্ট স্ট্যাটাস শেয়ার করে সে। খুঁটিনাটি সবকিছুই ফেইসবুকে শেয়ার করতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে আয়রা।     

[ ২ ] বেশ ক্লান্ত হয়ে কলেজ থেকে ফিরেছে রুহি। খাবারের টেবিলে খেতে বসে ভাইয়া ভাবির খোঁজ নিতে যেয়ে মায়ের মুখে সকালের সব ঘটনা শুনে খুব অবাক হয় সে।     

- "কিহ্!! ভাইয়া ভাবীর গায়ে হাত তুলেছে!" এক রাশ বিস্ময় নিয়ে মা'কে প্রশ্ন করে রুহি।   

-"চড় দিতে যাচ্ছিলো, আমি গিয়ে বাধা দেই।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের প্রশ্নের উওর দেয় আনোয়ারা বেগম।     

খাবারের পর্ব কোনো রকমে শেষ করে অর্ণবের সাথে কথা বলার জন্য নিজেকে গুছিয়ে নেয় রুহি। প্রায় অনেক দিন ধরেই অর্ণবের সাথে আয়রার সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চেয়েছিল সে। নানান ব্যস্ততার কারণে আর বলা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আজ যে করেই হোক, ভাবীকে নিয়ে কথা গুলো বলা অনেক প্রয়োজন।     

[ ৩ ]  খুব মন খারাপ নিয়ে বাসার ছাদের এক কোণে বসে আছে অর্ণব।     আয়রার সাথে করা এত বাজে আচরণ তার মনে খুব পীড়া দিচ্ছে। প্রায় অনেকদিন ধরেই তাদের সম্পর্কে বেশ টানাপোড়েন চলছিল। তবে আজকের মতো এত বাজে পরিস্থিতি কখনো হয়নি তাদের মাঝে। খুবই ছোট্ট বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে গিয়ে কত বড় কাহিনি ঘটে  গেলো।   

 - ভাইয়া, ভাইয়া!     রুহির ডাকে সংবিৎ ফিরে পায় অর্ণব।     

- কিরে কখন এলি?     

- এইতো কিছুক্ষণ হয়৷   

- হুম, ঠিকাছে। কিছু বলবি নাকি?   

- তেমন কিছুনা। তোমার কি মন খারাপ?   

- নাহ্।   

- ভাবীর সাথে ঝগড়া হয়েছে?   

- সব-ই তো শুনেছিস মনে হয়। নতুন করে তো জিগ্যেস করার কিছু নেই। যা বলতে এসেছিস, বলে চলে যা।   

- আহ্ হা ভাইয়া! এত রাগ করছো কেনো? একটু শান্ত হও প্লিজ৷ আমি ভাবিকে নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাচ্ছি৷   

- তো বল!   

- ভাইয়া? তার আগে আমাকে একটা কথা বলো। তুমি তো ঐ হাদিস টা জানোই। ঐ যে বদনজর যে সত্য আর এর প্রতিক্রিয়া যে কত ভয়াবহ এই নিয়ে যে হাদিস আছেনা?(১)

- হু! অনেক হাদিস এসেছে এই নিয়ে। অনেকে বদনজর বিশ্বাস করেনা৷ তবে বদনজর সত্য৷ আর এর ফলে অনেকে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন ও হচ্ছে৷         - এক্সাক্টলি ভাইয়া! তুমি কি খেয়াল করেছ? বেশ কয়েকমাস ধরেই তোমাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে?     

- আজকে এ বিষয়ে চিন্তা করছিলাম। দেড় বছর ধরে আয়রার সাথে থাকি। আমিও কখনো ওর সাথে এত বাজে ব্যবহার করিনি আর আয়রা ও কখনো আমার মুখে মুখে তর্ক করেনি, চিৎকার চেঁচামেচি করেনি।   

-  প্রেগন্যান্সির সময় তো প্রচুর মুড সুইং করে। আমার মনে হয় ভাবীর মাসনূন আমল গুলো নিয়মিত করা উচিত এবং তোমার রুকইয়াহ (২) করা উচিত ভাইয়া। আমি বদনজরের আশংকা করছি।   

- কিন্তু রুহি? ও তো বাহিরেই বের হয় না। কার নজর লাগবে। আর আমি তো তেমন কারো সাথে ব্যাক্তিগত কথাও শেয়ার করিনা৷     

- ভাইয়া, ভাবী তো প্রায় সব কিছুই ফেইসবুকে শেয়ার করে। হয়তো সেখান থেকেই কারো নজর লেগেছে। যদিও আমি একবার এ বিষয়ে ভাবীকে সর্তক করেছিলাম, আমার মনে হয় তোমার আরেকবার ভাবীর সাথে এ বিষয়ে কথা বলা উচিত। কারণ আমি দেখেছি ভাবী যখন থেকে ভাবীর রান্না করা খাবারের ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করতো, তার কিছুদিন পর থেকেই ভাবী আর রান্নায় মন বসাতে পারতনা। কোনো কিছুই ঠিকভাবে রান্না করতে পারতোনা৷ অথচ ভাবীর মতো পাক্কা রাধুনি আর কয়জন আছে বলো? যেকোনো কিছু শুরুর আগে আল্লাহর নাম স্মরণ করা, বদনজর থেকে বাঁচার দুআ ইত্যাদি বিষয় গুলো ভাবীকে বুঝিয়ে বলো। আর হ্যাঁ এখন আর এত রাগ করে থেকো না প্লিজ।   

বদনজরের বিষয় টা অর্ণবের মাথায় গেঁথে দিয়ে রুহি নিজের রুমে চলে যায়। এদিকে অর্ণব মোবাইলে বের করে ফেইসবুকে ঢুকে আয়রার টাইমলাইন চেক করতে থাকে৷ স্ক্রল করতে করতে আয়রার একটা পোস্ট সামনে আসে, যেখানে লিখা ছিলো-   

"আজকে আমার সবচেয়ে খুশির দিন৷ আমি আমার মাঝে একটা প্রাণের স্পন্দন অনুভব করছি৷ অর্ণবকে বলার পরে, অর্ণব আমার জন্য আমার প্রিয় ব্ল্যাক ফোরেস্ট কেক নিয়ে এসেছে৷ অফিস থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি ও নিয়েছে৷ বিয়ের পর থেকে অর্ণবের এত কেয়ারিং আচরণ আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করছে। ভালোবাসি প্রিয়।"      স্ট্যাটাস টি পড়ে কমেন্ট সেকশনে যায় অর্ণব। কমেন্ট পড়তে পড়তে একটা কমেন্টে চোখ আটকে যায় তার। ছানাবড়া চোখ নিয়ে কমেন্টের দিকে তাকিয়ে আছে অর্ণব।       

[ ৪ ]     "ভাইয়া, ভাইয়া! তাড়াতাড়ি আসো " - রুহির ভয়ার্ত ডাকে দৌড়ে রুমে যায় অর্ণব।     

আয়রার কন্ডিশন খুব খারাপ। হঠাৎ পেটে মারাত্মক ব্যাথা শুরু হয়েছে৷  কিন্তু দুই দিন আগেই তো চেকআপ করিয়েছিলো, সবকিছুই ভালো আছে। তাহলে এই ব্যাথা?!  আগেপিছে না ভেবেই মেডিকেলের উদ্দেশ্য রওনা দেয় অর্ণবরা।     

মেডিকেলের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে অর্ণব। এরমধ্যে রুহি এসে ভাইয়ের হাত ধরে। ভারাক্রান্ত স্বরে অর্ণবকে বলে - "ভাইয়া, ভাবির Miscarriage হয়েছে!"    "Miscarriage" শব্দটা বজ্রধ্বনির মতো কানে গিয়ে বাজে অর্ণবের। চোখ যেন ঝাপসা হয়ে আসছে৷ ঝাপসা চোখেই যেনো আয়রার পোস্টের কমেন্ট ভেসে আসে অর্ণবের সামনে৷     

একটা কমেন্ট! যে কমেন্টে লিখা ছিলো- "আয়রা, তোর এত সুখ দেখে মাঝে মাঝে বড্ড হিংসা হয় আমার। তোর জামাই কত ভালো। সন্তানের মাও হচ্ছিস কিছুদিন পরে। কিন্তু আমাকে দেখ, আমি না পেয়েছি স্বামীকে দিয়ে সুখ, না পারছি একটা সন্তানের মুখ দেখতে। এ নিয়ে কতবার আমার Miscarriage হলো। তুই এত Lucky কেন বলতো!"       এত গুলোর শব্দের গহীনে কোথাও আল্লাহর নাম নেই। Lucky শব্দের আড়ালে ছুঁয়ে যায় দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাসের সাথে ধেঁয়ে আসে নজর! বদনজর!     


রেফারেন্সঃ   

(১)     ★ আবূ হুরায়রা (রাঃ) আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বদনজর সত্য। [ মুসলিম:৪০৬৪ ]   

★ আব্দুর রহমান বিন জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত,  রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরের পর আমার উম্মতের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হবে বদনজরের কারণে।  [ মুসনাদে আবূ দাউদ ত্বয়ালিসী : ১৮৫৮, সনদ হাসান ]   

(২) আভিধানিক অর্থে রুকইয়াহ অর্থ ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র ইত্যাদি। শরীয়াহর পরিভাষায়, কোনো ব্যাক্তি যখন কুরআনের আয়াত,  দুআ কিংবা আল্লাহ তাআলার কোনো নাম বা সিফাত বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে - যেমনঃ নিজের বা অন্যের সুস্থতার জন্য, কিংবা অন্য কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য -একমাত্র আল্লাহর সাহায্য যেয়ে পাঠ করে, পরিভাষায় সেটাকে "রুকইয়াহ" বলা হয়৷ উল্লেখ্য, রুকইয়াহ শারইয়্যাহ এর সংঙ্গাও এটাই। [ রুকইয়াহ বইঃ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ]         

ফুটনোটঃ   

১/ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ব্যাক্তিগত কিছু শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং সবক্ষেত্রেই আল্লাহর নাম স্মরণ করা উচিত।     

২/ উপরের চিত্রটি "বদনজরের" জন্যেই হয়েছে কি হয়নি সেটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লাই ভালো জানেন৷ যেহেতু বদনজর সত্য, আর এর থেকে আমাদেরকে সর্তক থাকতে বলা হয়েছে৷ তাই আমরা সর্বদা সর্তকতা অবলম্বন করবো।     উপরের চিত্রটি শুধুমাত্র একটা রিমাইন্ডার দেওয়ার জন্যই তুলে ধরে হয়েছে৷ তবে এমন ঘটনাও বিরল নয়।   

৩/ হিংসা-বিদ্বেষ, অতিমাত্রায় মুগ্ধতা কিংবা ঈর্ষাকাতর চাহনি, যেখানে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়না এসবই বদনজরের উৎস৷ তবে কেউ মাসনূন দুআ-যিকির ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা করলে এসবে সহজে আক্রান্ত হয়না। আরো বিস্তারিত জানতে "রুকইয়াহ" ( আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ভাইয়ের) বইটি পড়তে পারেন ইনশাআল্লাহ।     

[ বিঃদ্রঃ প্রেগন্যান্সির সময়ে রুকইয়াহ করাকে অনুৎসাহিত করা হয়। তবে নিয়মিত মাসনূন আমল করতে পারবেন  ]   

~ ফাতেমা আক্তার মনিরা 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ