Belal Uddin
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০৪:১০পি এম

হাদী ভাইয়ের কবর যাত্রা

হাদী ভাইয়ের কবর যাত্রা Ad Banner

আপদমস্তক কালো কম্বল মুড়িয়ে বিছানার ঠিক মাঝখানটায় বসে আছেন হাদি ভাই। শুধু বসে আছেন বললে অবশ্য ভুল হবে, মোরাকাবায় আছেন। বাংলায় যেটাকে বলি ধ্যান সাধনা! তবে তথাকথিত মেডিটেশনের মতো নয়। দেখতে প্রায় একই রকম ঠেকলেও, উদ্দেশ্য ভিন্ন।     

প্রত্যহ মাগরিব নামাজান্তে, আধঘন্টা করে মোরাকাবায় সময় দেন তিনি। কখনো মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী জগৎ, কখনো-বা সৃষ্টি সম্পর্কীত ভাবনা, কখনো আবার স্রষ্টার পরিচয়– এসবই খেলে চলে তার মস্তিষ্কে। মাঝে মাঝে আবার পুরো সময়টাতে নিজেকে নিয়ে ভাবেন, জীবনের অমীমাংসিত হিসাব মেলান!     

হাদী আপদমস্তক কালো কম্বল মুড়িয়ে বিছানার ঠিক মাঝখানটায় বসে আছেন হাদি ভাই। শুধু বসে আছেন বললে অবশ্য ভুল হবে, মোরাকাবায় আছেন। বাংলায় যেটাকে বলি ধ্যান সাধনা! তবে তথাকথিত মেডিটেশনের মতো নয়। দেখতে প্রায় একই রকম ঠেকলেও, উদ্দেশ্য ভিন্ন।     

প্রত্যহ মাগরিব নামাজান্তে, আধঘন্টা করে মোরাকাবায় সময় দেন তিনি। কখনো মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী জগৎ, কখনো-বা সৃষ্টি সম্পর্কীত ভাবনা, কখনো আবার স্রষ্টার পরিচয়– এসবই খেলে চলে তার মস্তিষ্কে। মাঝে মাঝে আবার পুরো সময়টাতে নিজেকে নিয়ে ভাবেন, জীবনের অমীমাংসিত হিসাব মেলান!     

হাদী ভাইয়ের আরবি শিক্ষক জনাব আমতাজ উদ্দিন মিয়াজি। তিনি আবার একখানা রাজকীয় ডায়েরির মালিক ছিলেন। ডায়েরির পুরো দেহ জুড়ে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা ছিল মোরাকাবা সম্পর্কীত কিছু উপদেশনামা। সেটা অবশ্য পরে হাদি ভাইয়ের কুক্ষিগত হয়। তারই গুটি কয়েক আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমার এখনও মনে আছে, শীর্ণ মলিন ডায়েরিটার কোনো এক পাতায় লিখা ছিলো —    “যখন তুমি বুঝিতে পারিবে, এই জগত সংসারে সকল রূপ লাবণ্য, সুখ স্বাচ্ছন্দ স্রষ্টার তরফ হইতেই আসিতেছে। তখন কেবলি তাঁহাকে অন্বেষণ ব্যতিত সবকিছু মূল্যহীন হইয়া পড়িবে! তাই সময় থাকিতে তাঁহাকে হৃদয়মাঝে টানিয়া লও।”   

যদিও সেই ডায়েরিটা এখন বিলুপ্ত। হাদী ভাইয়ের মা রাহেলা বানু, আচ্ছামতন ধোলাই শেষে মলাট সুদ্ধ ডায়েরিটা কাজী মাস্টারের পঁচা ডোবায় নিক্ষেপ করেছেন। ওদিকে মিয়াজিকেও খানিক ঝাড়ফুঁক করে ছেড়ে দিয়েছেন। ঝাড়ফুঁকের বিশেষ কিছু সংলাপ, অস্পষ্টভাবে এখন অব্দি আমার স্মৃতিপটে বিরাজমান।       

ঘটনাটা হচ্ছে, নিত্যদিনকার ন্যায় সেদিনও মিয়াজি পাঠদান শেষে সানন্দে হাদী ভাইকে ধ্যানের শিক্ষা দিচ্ছেন। হাদী ভাই চোখ দু'টো বন্ধ করে নিশ্চল হয়ে বসে আছে। আকস্মাৎ তীব্র গতিতে রাহেলা বানু ওঘর থেকে ছুটে এলেন। হাদি ভাইয়ের ঠিক বোধগম্য হলো না, তার জন্মদাত্রী অতিশয় গোপন ব্যাপারটির সম্পর্কে অবগত হলেন কী করে! পরে অবশ্য বুঝতে বাকি ছিল না যে এটা তারই গুণধর ছোটবোন তিন্নির কাজ। সে-ই দৌঁড়ে গিয়ে আন্টির কাছে গোপন তথ্য ফাঁস করে রীতিমতো হিরো বনে গেছে। বয়স কম হলে হবে কী, বেজায় ধুরন্ধর! বন্ধুবেশে গুপ্তচরবৃত্তি!   

আন্টি এসেই হাদি ভাইয়ের একটা কান ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে মেঝের উপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। মেঝের উপর দন্ডায়মান হাদি ভাই ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। মনে মনে সম্ভবত বড়দোয়াও পড়ছিলেন। কারণ তার শ্রদ্ধেয় আম্মাজান একবার বকা দেওয়া শুরু করলে, আর নিস্তার নেই। একেবারে সাত ঘাটের জল খাইয়ে তবেই ছাড়বেন। তাও আবার বাংলা-ইংরেজির মিশ্রণ!   

এই মিশ্রণ যে শুধু বাড়িতেই প্রয়োগ হয় তা কিন্তু নয়, কলেজের শিক্ষার্থীরাও নিস্তার পায় না। হাজার হোক রাহেলা বানু ইংরেজি বিভাগের প্রধান বলে কথা! ধমক দিতে নিলেই জবান দিয়ে সংক্রীয়ভাবে ইংরেজি শব্দমালা বের হয়ে আসাটা অস্বাভাবিক নয়। তার এই ইংরেজি শব্দের বহুমুখী ব্যবহার থেকে মিয়াজিও রেহাই পেলেন না।

রাহেলা বানু হুঙ্কার দিয়ে বললেন—    “আর ইউ ক্রেজি? পাগল নাকি আপনি? আপনাকে আমি রেখেছিলাম আরবি টাচ্ দেওয়ার জন্য। আর আপনি এসব কি শেখাচ্ছেন ছেলেকে?   আধ্যাত্মিকতা? দরবেশগিরি? আমি বুঝতে পারছি না এসব ভণ্ডামির মানে কি! এগুলো শিখে সংসার জীবনের কোনো ডেভলপ করতে পারবে ও? ও তো ঘর-সংসারের চিন্তা চেতনা থেকে ডিসকানেকট হয়ে যাবে একদম! ওহ আচ্ছা! আপনি তাহলে আমার ছেলেকে এভাবে নষ্ট করে দেওয়ার পায়তারা করছেন, তাইনা? কি হলো? চুপ করে আছেন কেনো? জবাব দিন!”   

মিয়াজির দৃষ্টি সদর দরজায়। তার হয়ত ইচ্ছে করে এক ছুটে এখান থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু শিষ্টাচার নামক মানবীয় গুণ তাকে এহেন কর্ম হতে বিরত রাখল। তিনি প্রায় সময়ই আমাদের একটা উপদেশ দিতেন— “রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা এই তিন জিনিস মানবজীবনকে অতিষ্ঠ করে দেয়। এটাকে যতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ততটাই সুখী হবে!” গোটা জীবন জুড়েই তিনি এই তিন জিনিসকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সেদিনও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।     

রাহেলা বানু মিয়াজির নিরবতায় আরও রেগে গেলেন। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নাক সিঁটকানো সুরে বললেন —  “ক্লাউন একটা!”   

হাদী ভাই আর ঠিক থাকতে পারলেন না। বুকে সাহস সঞ্চার করে প্রতিবাদ করলেন–  “আম্মু এভাবে বলবে না প্লিজ! এখানে উনার কোনো দোষই দেখছি না আমি। উনি তো...”   

“চুপ। একদম চুপ। একটা কথাও বলবি না তুই। গোপনে গোপনে পীর সাজা হচ্ছে তাই না? দু'দিন পর এই বাসাটাকে আস্ত একটা মাজার বানিয়ে ফেলবি আর বাইরে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে লিখে দিবি; “হাদীবাবার হুজুরা শরীফ!” এরপর দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসে হাদীবাবার পানি পরা নিয়ে যাবে? তাইনা? এটাই তো! আর কি বোঝাতে চাচ্ছিস আমায়? ছুটিয়ে দিবো তোর দরবেশগিরি দাঁড়া। ওয়েট এন্ড সি!”   

আমি আন্টির কথা শুনে ঠোঁটে রাজ্যের প্রশান্তি টেনে বলেছিলাম —  “এটা তো আনন্দের খবর আন্টি। সেদিন একটা পত্রিকায় দেখলাম; বিশেষ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশের পীর গোষ্টিদের মাসিক গড় আয় ৩৭ লক্ষ টাকা। চিন্তা করুন একবার সংখ্যাটা! রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার এটাই সর্টকাট রাস্তা! অবশ্য মার্কেট পেতে সময় লাগবে হাদী ভাইয়ের। আর একবার যদি মার্কেট পেয়ে যায়, তাহলে আর আটকায় কে! শুধু দেখে যাবেন আপনি, আপনার ছেলের নামে দেশের কয়েক জায়গায় বড় বড় খানকা হবে, ওরস শরীফ হবে, সারা দেশের মানুষ গরু, ছাগল, চাল, ডাল নিয়ে হুহু করে ছুটে আসবে। ধীরে ধীরে আসবে মন্ত্রীরা। মন্ত্রীরা একবার এসে গেলে আর কোনো চিন্তা নেই। দেশব্যাপী প্রসিদ্ধ পীর সাহেব হয়ে যাবেন আমাদের হাদীবাবা।”   

মিয়াজি এবং হাদী ভাই আমার বক্তব্য শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন যেন। হা করে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। আন্টি ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে বিকট একটা ধমক দিলেন আমাকে। ধমক শুনে আমার প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। অতঃপর গুটি কয়েক চেনা অচেনা ইংরেজি শব্দের মিশ্রণে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করলেন আমায়।    এরপর ওখানটাতে কী হয়েছিল, তা জানার আর সৌভাগ্য হয়নি আমার। তবে কিছুক্ষণ পর দেখলাম হাদী ভাই মিয়াজিকে রুম থেকে বের করে নিয়ে এলেন।

মিয়াজি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হনহন করে হেঁটে যেতে লাগলো। হাইস্কুলের বটতলা পর্যন্ত ওনাকে এগিয়ে দিলাম আমরা। এতদূর পথ হেঁটে এলাম, একটি কথাও বললেন না তিনি। শুধু বিদায় নেওয়ার সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন-“তোমরা যেখানে আছো, এখান থেকে অনেক দূর পথ পারি দিতে হবে তোমাদের। আর সেই পথে এমন অসংখ্য পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে। সামলে থেকো!” 

মিয়াজির বিষণ্ন মুখখানি দেখে খুব খারাপ লাগছিলো আমার। হাদী ভাই মাটির দিকে তাকিয়ে চোখ মুছলেন। তার মুখ থেকে ক্ষমা সূচক শব্দটাও বের হলো না। শেষে আমিই মিয়াজিকে সালাম জানিয়ে বললাম- “আমাদের জন্য দোয়া করবেন মিয়াজি!”   

সেদিন আমি শেষ বারের মতো মিয়াজিকে মিয়াজি বলে ডাকতে পেরেছিলাম। আর কখনোই ডাকার সুযোগ হয়নি। এরপর হঠাৎ একদিন তিনি তার নিজের বাড়ি নেত্রকোনায় চলে গেলেন। আর কখনো এমুখো হননি।   

কিন্তু হাদী ভাইয়ের ধ্যান-কার্য অব্যাহতই আছে।একবার ধ্যানে বসলে, কোনো দিকে মন থাকে না। পুরো দেহ-মন যেন ভাবনার বিষয়বস্তুর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকে। আমার তো মনে হয় এতোদিনে খানিকটা ট্যালিপ্যাথিক শক্তিও হাসিল করে ফেলেছেন তিনি! তবে ট্যালিপ্যাথিক কোনো শক্তি হাসিল অবশ্য এ ধরনের মোরাকাবার উদ্দেশ্য নয়। এসব নস্যি বিষয় থেকে সবসময় দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন মিয়াজি।   

যাক সে কথা। অনেকক্ষণ যাবত বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা দুজন। হাত পা অবশ হওয়ার জো, কিন্তু হাদী ভাইয়ের ধ্যান-কার্যের ইতি ঘটার কোনো নাম-গন্ধ নেই! আরজু আর আমি পালাক্রমে কয়েকবার গলা খাঁকারি দিলাম। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। আরজু ফিসফিস করে বললো-    — সুরসুরি ট্রিটমেন্ট প্রয়োগ করবো নাকি আরিফ ভাই? 

আমি হাতের ইশারায় বাঁধা দিয়ে বললাম-  — না থাক। কারো ইবাদতে এতোখানি বিরক্ত করা উচিত হবে না।    বেশ কিছুক্ষণ পর হাদী ভাই আপনা-আপনিই চোখ খুলে তাকালেন। অতঃপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সালাম বিনিময় করলেন। ভাবখানা এমন যেন তিনি আগে থেকেই জানতেন আমরা তার রুমে এসে দাঁড়িয়ে আছি! এরপর একটা নরম বালিশ পিঠে ঠেকিয়ে খাটে হেলান বসলেন।

পরম যত্নে পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা খিলি পান বের করে মুখে পুরতে পুরতে বললেন-    — দাঁড়িয়ে কেনো তোমরা। বসো! 

আমি নিচু স্বরে বললাম-  — বাসায় আন্টি নেই তো! 

— আহা! বিলকুল নেই। শুধু আম্মু নয়, বরং আব্বু, আম্মু, তিন্নি কেউই নেই। সবাই মিলে মামার বাসায় বেড়াতে গেছে আজ দু'দিন। তাই একদম নিশ্চিন্তে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবো আমরা। হিহি।   

কথাটা বলতে পেরে হাদী ভাই যেন ভীষণ আরাম পেলেন। আরামের হাসি হাসলেন। এই হাসিটা বরাবরই মধুর কিন্তু ছোঁয়াচে হয়। আমিও ফিক করে হেসে মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বললাম। বাসায় আন্টি থাকলে সব পরিকল্পনা একদম ভেস্তে যেত। শেষমেশ হয়তো কঠিন বকুনি আর পিটুনি খেয়ে দেয়াল টপকে চোরের মতো পালাতে হতো! আগের বারের ন্যায় লাফ দিতে গিয়ে একবারটি যদি হাঁটুতে আঘাত লাগে, তাহলে আর রক্ষে নেই। কয়েক দিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা ফ্রী! ওদিকে পালাতে ব্যর্থ হলেও মহাবিপদ! আন্টির রাগ সহ্য করার মতো ক্ষমতা কারুর নেই। রীতিমতো ভুমিকম্প বয়ে যাবে বাড়িতে!     

এইতো দিন কয়েক আগের কথা। তিন্নির অংক টিচারকেও কিনা নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে! ভুলটা ছিলো শুধু আন্টিকে খালাম্মা না ডেকে বিপরীতে ভাবি বলে সম্বোধন করেছিল! তিন্নি হা হয়ে তাকিয়ে ছিলো সেদিন। তিন্নি বেচারি গণিত বইটা কোন রকমে গুটিয়ে দিল এক ভৌ-দৌড়! সোজা বাবার কাছে। হাদী ভাইয়ের বাবা খালেকুজ্জামান সাহেব তখন আন্টির শূল দৃষ্টির আড়ালে এক টুকরো সুপারি মুখে চালান করার চেষ্টা করছিলেন।

তিন্নি হাঁপাতে হাঁপাতে বললো- “আম্মু স্যারকে বেদম পেটাচ্ছে, বাবা!”

খালেকুজ্জামান সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিন্নিকে কোলে নিয়ে বললেন- “এটা কোনো ব্যাপার না মা, এরকম কতো ধকল গেছে আমার জীবনে! এ বাড়িতে সাচ্ছন্দ্যকে একটা পানও খেতে পারি না আমি!” খালেকুজ্জামান সাহেব ফের লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। জানালা দিয়ে তাকাতেই মতিনের পানের দোকানটা স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। দোকানটা চোখে পড়তেই নাকে যেন সেখানকার হেনাপাতি জর্দার সুগন্ধ এসে ঠেকে, এখান থেকেই। পুরোনো সেই দিনগুলোর কথা উঁকি দেয় মনের কোণে!   

বলে রাখা ভালো, হাদী ভাইয়ের বাবা একদা প্রচুর পরিমাণে পান খেতেন। পানের সাথে থাকতো তেরো পদের জর্দা। জর্দা পান চিবুতে চিবুতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরতেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবস্থানরত রিকশার টুংটাং শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে তিনিও ছরাৎ করে পানের পিক ফেলতেন। প্রতিদিনই পান খেয়ে ঠোঁট মুখ লাল করে বাসায় ফিরতেন। শুধু নিজে যে পান খেতেন তা নয়, ছেলেকেও একটু আধটু খেতে দিতেন। সেই থেকে হাদী ভাইও পান খাওয়া শিখে গেল। কিন্তু হঠাৎ একদিন আন্টির সামনে হাতেনাতে ধরা পড়ে রাতের ঘুম নিমিষেই হারাম হয়ে গেলো তাদের!

টানা তিন ঘন্টা বারান্দায় নীল ডাউন করে রাখা হলো বাপ ছেলে দুটোকেই! হাদী ভাই অবশ্য এখানো লুকিয়ে লুকিয়ে দিনমানে দুই একটা পান খায়। কেনো খায় সে নিজেও জানে না। পান খাওয়া গুণটা হয়তো জন্মসূত্রে লাভ করা। শুনেছি হাদী ভাইয়ের দাদাও নাকি পান ভক্ত ছিলেন। তিনি আবার সবার উপরে ছিলেন, খেতেন একুশ পদের জর্দা দিয়ে। এতোটাই পান খেতেন যে তার নামের সাথে পান শব্দটা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে অবশেষে নাম হলো পান কাসেমী। পান কাসেমী-কে চেনে না, এলাকায় এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।     

হাদী ভাই ছরাৎ করে পানের পিক ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। এভাবে পানের পিক ফেলার অর্থ হলো- “আমার আম্মাজান আজও আসবে না, এই দেখো তার প্রমাণ, এই যে ছরাৎ! (পানের পিক ফেলার শব্দ) আমি এখন লা-পরওয়া বে-পরওয়া মুডে আছি, হিহি!”     

হাদী ভাইয়ের বেপরোয়া মুড দেখে আমিও তাই নিশ্চিন্তে মাথার টুপিটা ঠিক করতে করতে চেয়ারে বসলাম। চেয়ারে বসেই ক্ষান্ত হলাম না বরং পায়ের উপর পা তুলে একটু রাজকীয় ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিলাম। কিন্তু কে জানতো চেয়ারটা পঙ্গু ছিলো!     যেমনি হেলান দিলাম অমনি চিৎপটাং! ভাগ্যিস লুঙ্গিটা ঠিকমতো বাঁধা ছিলো! উল্টে পরার পর তাৎক্ষণাৎ চেয়ারের পঙ্গু হওয়ার ইতিহাস আমার স্মৃতিপটে দৃশ্যমান হলো। সেদিন আন্টিদের আঙ্গিনায়, এই চেয়ারটার উপর ভর দিয়েই একটা পেঁপেঁ পেড়েছিলাম। কিভাবে যেন নড়চড় হয়ে ধুম করে একটা পায়া ভেঙে গেল। আন্টির ভয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে রুমে এনে কোনমতে পায়াটা লাগিয়ে রেখে দিয়েছিলাম! কে জানতো আজ সেই অপরাধের শাস্তি স্বরূপ নিজেকেই এভাবে উল্টে পড়ে যেতে হবে!     

আলোচনার প্রারম্ভেই আমার এহেন অবস্থা দেখে আরুজু হোহো করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাদী ভাই প্রচন্ড হুঙ্কার দিয়ে বললেন–   — “দাঁত কেলিয়ে হাসবে না আরজু। দিলে মরণ ডাকবে না। মনে রাখবে আল্লাহর জিকির করতে এসেছো তুমি!”    আরজু হাসি আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। তার অবস্থা দেখে আমিও না হেসে পারলাম না! এ ধরনের হাসি যে বৈদ্যুতিক শক্তি বহন করে তা আমার আগে থেকেই জানা। এক শরীর থেকে আরেক শরীরে সঞ্চারিত হতে বেশ শক্তিশালী এটা।    তবে আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আমাদের। গম্ভীরতা কাম্য। আমি নতুন একটা চেয়ার এনে ঠিক করে বসলাম। আরজু এখনো মিটমিট করে হাসছে। এই বয়সের ছেলেরা একটু বেশি হাসে। আবার বেশি কাঁদেও। আমি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সরাসরি কাজের কথায় চলে এলাম।     — আমরা কখন রওনা করবো হাদী ভাই?   

হাদী ভাই খানিকটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন-  — ভালো মতন রাত না হলে তো যাওয়া যাবে না! কি কও আরজু!    আরজু তখনও দাঁত বের করে আছে। বেচারা এখনো কিছু একটা ভেবে হাসছে! শুনেছি লাফিং গ্যাস বেশি হলে মানুষ হাসি থামাতে পারে না। আমার মনে হয় এই ঘরের সমস্ত লাফিং গ্যাস আরজুর মুখে গিয়ে জেঁকে বসেছে।

হাদী ভাই আবারো ধমক দিলেন।     — দাঁত কেলানি বন্ধ করবা তুমি?   

ধমক শুনে হাসির মাত্রা যেন প্রবলতর হলো! পেটে হাত দিয়ে চেয়ারে বসে খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলো সে। আমি বুঝতে পারছি এটা তার জন্য বেশ কঠিন একটা মুহুর্ত। হাসি রোগ যার আছে, তার হাসি একবার মাথাচাড়া দিলে আর থামানো মুসকিল।   

— সরি ভাই। বলেন আপনারা। খিকখিকখিক...(আবারো হাসি) 

আমি তার দিকে না তাকিয়ে বললাম-  — শুনেছি বুড়িকাঁদুনি গোরস্থানে ইদানীং ভুতপ্রেতের উপদ্রব বড্ড বেশি ভাই! এতো রাতে সেখানে যাওয়া কি উচিত হবে আমাদের? তারচেয়ে আজিমপুর কিন্তু বেশ নিরাপদ! তবে সমস্যা হলো সেটা অনেক দূরে।   

মুহুর্তেই আরজুর হাসি বন্ধ হয়ে গেলো। সে দ্বিতীয়বার কোনো গোরস্থানে যেতে চায় না। বুড়িকাঁদুনি গোরস্তানের নাম শুনলেই তার কলিজা শুকিয়ে পানিশূণ্য হয়ে যায়।

হাদী ভাই মুচকি হেসে বললো-  — দেখো কান্ড! বুড়িকাঁদুনির নাম শুনতেই বেচারা আরজুর চোখমুখ একেবারে শুকিয়ে গেছে! ওকে যে এতদিন ধরে শেখালাম ভুতপ্রেত বলতে কিচ্ছু নেই এরপরেও ভয়? নাহ। এটা তো ভালো কথা না আরজু। তোমাকে এই ভয়কে জয় করতেই হবে। কাফনের কাপড় এনেছো তুমি? 

— জ্বি ভাই এনেছি। কিন্তু আমি তো এটা জানতাম না যে আপনারা গোরস্তানে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন! জানলে আরিফ ভাইয়ের সাথে আমি কখনোই আসতাম না। আপনারা কি সত্যি সত্যি যাবেন ভাই? নাকি শুধু শুধু আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন!   

হাদী ভাই আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন। আমি পাঞ্জাবীর পকেট থেকে মোমবাতি গুলো বের করে হাদী ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলাম। মহূর্তেই আরজুর গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠলো! তার মানে সত্যি সত্যিই এরা গোরস্তানে যাবে!   

#জাগরণ এক্সক্লুসিভ


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ