Belal Uddin
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০৪:১৪পি এম

গৃহস্থ পরিবার

গৃহস্থ পরিবার Ad Banner

গোয়াল ঘরে রাখা পরিত্যক্ত ভাঙা খাটটায় পান্তা ভাত নিয়ে ষাটোর্ধ্ব দুজন বৃদ্ধ - বৃদ্ধা ইফতারের অপেক্ষা করছেন। পাশের ঘরেই তাদের মেয়ে রিপা ও নাতনি রাহি। রিপা এক গ্লাস পানি এবং কয়েকটা চাউল নিয়ে ইফতারের অপেক্ষা করছে আর রবের তাসবিহ্ পাঠ করছে।  গতকাল রাতে রান্না করেছিল সাহরির জন্য, আজকে মেয়ে খেয়েছে আর যা ছিল মা আর বাবাকে দিয়েছে। বিকালে আর রান্না করতে ইচ্ছে হয়নি, ইফতার করে, সালাত আদায় করে তারপর রান্না করবে।     

এই গোয়াল ঘরে একটি গরু ও দুইটি ছাগল থাকতো, ছাগল দুটি দেড় মাস আগেই বিক্রি করতে হয়েছে, ছেলের চিকিৎসা করার জন্য। বারান্দার চাল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে এখানে খাট পেতে থাকতে হচ্ছে, চাল ঠিক হয়ে গেলে আবার ওখানেই থাকতে পারবে।  ইদানীং এলাকায় বখাটে গুলোর উৎপাত বেড়ে গেছে, যে কারণে মেয়েটা ঘরেই থাকে।   

এইতো বছর দুয়েক আগের কথা- ছেলে, বৌমা, পরিবারের সকলে মিলে কত গল্প, সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করা হতো। একটা ঝটকাতেই যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার ছিল তাদের, নারিকেল, সুপারির ব্যবসা করে কোনো রকম দিন কাটতো। রিপা পর্দাশীল আর বেশ নম্র-ভদ্র মেয়ে। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছিল এক গৃহস্থ পরিবারে সাঈদের সাথে।

গ্রামের ছাত্তার ঘটক সম্বন্ধটি নিয়ে এসেছিল। সে বলেছিল, 'পোলার বাড়ি পাশের গ্রামে আর ধনীও বটে- খেয়ে পরে ভালো ভাবে থাকতে পারবে। এখানে মেয়েটাকে দাও, কোনো দাবিদাবা নাই তাদের।'     

তারপর, ভালোভাবে বিয়েও হয়েছিল, বিয়েতে বরের পাঞ্জাবি আর জুতাটা কম দামি হয়েছিল বলে বেশ কথাও উঠেছিল বটে। পাশের গ্রামে বিয়ে হ‌ওয়ার সুবাদে আসা যাওয়া ঘন ঘন হতো। বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় নারিকেল, সুপারি না নিয়ে গেলে যেন মান সম্মানের টানাটানি পড়ে যেত। পিঠা, পায়েস খেতে হলে যেন ওই নারিকেল ছাড়া মজাই হয় না। টানাটানির সংসার থেকে বাধ্য হয়ে নিয়ে যেতে হতো। অবশ্য তার শ্বশুর খুব ই নিষেধ করতেন, কিন্তু অন্যেদের কথার অত্যাচার সহ্য সীমা অতিক্রম করছিল।     

বিয়ের বছর দেড়েক পর কোল জুড়ে রাহি আসলো, শ্বশুর বাড়ির লোকজনের মুখে আষাড়ের মেঘ ছেয়ে গেল, কারণ তাদের আশা ছিল ছেলে হবে। আস্তে আস্তে অবশ্য মানিয়েও গিয়েছিল।     

রাহির বয়স যখন সাত বছর, তখন রিপা আবার গর্ভবতী। সে এবার বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে। যে কারনে সাঈদ তাকে বাবার বাসায় রেখে যায়। প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেশ খোঁজ খবর নিত সে, কিন্তু দিন বাড়ার সাথে সাথে খোঁজ খবর নেওয়া ও কমে যায়।     

অসুস্থতা আর হতাশার মাঝেই রিপার অনাগত বাচ্চাটি নষ্ট হয়ে যায়। যে কারনে সবার মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।   রিপা একটু সুস্থ হলে, সাঈদ এসে তাকে বাসায় নিয়ে যায়। আগের মতো এখন আর অতটা যত্নবান না সে। সম্পর্কে কেমন যেন মরিচা পড়েছে।     

বিয়ের পর থেকে এতোদিন পর্যন্ত পর্দা রক্ষা করতে খুব একটা সমস্যা হতো না কারণ তার শ্বশুর অনেকটা সহায়তা করতো। কিন্তু ইদানীং শ্বশুর বাড়ির লোকজন অনেকটা চাপাচাপি করছে একটু ছাড় দিয়ে চলার জন্য। অনেকের কথা হলো- মেয়েটা বড় হয়ে গেছে এখন অতো দরকার নেই। সাঈদ কিছু না বললেও তার নিরবতায় বোঝা যাচ্ছে সে ও সবার কথায় একমত।   রিপা কারো কথায় কান না দিয়ে জোর করেই পর্দা রক্ষা করে চলছে। কিন্তু এখন আর সম্ভব হচ্ছে না, যখন-তখন হুট করেই রুমে, রান্না ঘরে নন- মাহরাম চলে আসে।

সাঈদকে এসব ব্যাপারে বললে প্রথম দিকে সে বলতো একটু মানিয়ে নাও, পরবর্তীতে এসে সে বলতো  মানাতে না পারলে বাবার বাসায় চলে যাও। এমনকি একদিন কয়েকটা থাপ্পড় ও মারে আর কটু কথা শোনায়- কি এমন চেহারা যে কারো সামনে যাওয়া যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি । এটি শুনে রিপার অনেক খারাপ লাগে আর পরের দিন মেয়েটিকে নিয়ে বাবার বাসায় চলে আসে।   

সে ভেবেছিল হয়তো সাঈদ তাকে নিতে আসবে, কিন্তু না! তার কিছুদিন পর ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দেয় সে। রিপা যেন হতভম্ব হয়ে গেল, কিছুটা স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিলো, কি হচ্ছে এসব। এতটুকুতেই সে ডিভোর্স পেপার পাঠালো! চোখের পানি আটকে রাখতে পারছিল না মোটেও।  অন্যদেরকে দিয়ে সাঈদকে বোঝানোর চেষ্টাও করেছিল কিন্তু কাজ হয়নি, শেষে ডিভোর্স হয়ে যায়।   

পরবর্তীতে রিপা জানতে পারে, আসলে তার স্বামী অন্য একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল আর তাকেই সে বিয়ে করতে চায়, যে কারনে সে এমনটি করেছে।     

তারপর রিপাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল তার পরিবার, কিন্তু হয়নি। পরবর্তীতে রিপা আর বিয়ের জন্য এগোয়নি। তার খরচ পত্র ভাই আর বাবা চালাতো। রিপা মাঝে মাঝে সেলাইয়ের কাজ করতো।     কিন্তু এর মাঝেই এক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে, গত বছর রমজানের আগে রিপার ভাই হঠাৎ প্যারালাইজড হয়ে যায়। বাবাও আর ব্যাবসা করতে পারে না, বয়সের ভার এসে পড়েছে চোখে মুখে। কিছু ঋণ ছিল, সেগুলো শোধ করার জন্য গরু বিক্রি করতে হয়, দেড় মাস আগে হঠাৎ ভাই বেশি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় ছাগল দুটিও বিক্রি করতে হয়, কিন্তু ভাইকে আর বাঁচানো গেল না, হাসপাতালে মৃত্যু হয়। ভাই মারা যাওয়ার পর ভাবি বাবার বাসায় চলে গিয়েছে, রিপাও আর বেশি জোরাজুরি করলো না, এটা ভেবে যে - ওখানেই হয়তো ভাবি ভালো থাকবে।     

বর্তমানে রিপা সেলাইয়ের কাজ করে, তা দিয়ে যা টাকা পায়, তাই দিয়ে সাংসারিক খরচপত্র জোগাড় করার চেষ্টা করে।  এশার সালাত শেষ করে মা বাবার কাছে এসে বসলো রিপা। সবার মাঝে নিরবতা, একসময় রিপার মা নিরবতা ভেঙে বললো, তোর চাচা একটা বিয়ের কথা বলছিল যে - "গৃহস্থ পরিবার, পাত্রের আগের পক্ষের একটা ছেলে আছে, রিপা ভালোই থাকবে সেখানে।" এখন ভেবে দেখ তুই কি করবি!     

"গৃহস্থ পরিবার" কথাটি মনে পড়তেই রিপার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো! 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ