Belal Uddin - (Dhaka)
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০৪:২০পি এম

"আমিও ভালোবাসতে চাই"

"আমিও ভালোবাসতে চাই" Ad Banner

[১]  রাত দুটো বাজে।রাতের শেষ ভাগ। কিন্তু রাসেলদের ক্যাম্পাসে শেষ রাত বলতে কিছুই নেই। সবই প্রথম রাত।সব সময় এক ঝাক তুরুণদের পদচারনায় মুখরোতি থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। চোখে তাদের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন,শিরায় শিরায় জয়ের নেশা। যে কোন ইস্যুতে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো এক ঝাক তরুনদের মধ্যে রাসেল ও একজন।রাসেল থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে।

হলের ক্যাম্পাসে দিনে যতটুকু হৈ হুল্লোড় থাকে। তার থেকে বেশি জমজমাট থাকে রাতের বেলায়। শীত কালে দেখা যায় গুচ্ছো গুচ্ছো তরুনেরা দল করে এক এক জায়গায় বসে তাদের জীবনের গল্প বলে বেড়াচ্ছে। শুকনো পাতা ও খড় কুটোয় আগুন দিয়ে কেউ বা গিটারের তারে সুরের ঝংকার তুলছে,আর কেউ বা সে সুরে বিষাদের গন্ধ  পাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ব্যাডমিন্টন খেলে নিজেদের জমা রক্তকে উষ্ণ করছে।কেউ বা নিরিবিলি জায়গায় বসে প্রেমিকার সাথে ফোনালাপ করছে।মোট কথা কোথা ও শান্ত নেই।এই বয়সটা তো শান্ত থাকার বয়স না।   

[২]  দুর থেকে দেখা যায় আম গাছটার নিচে বসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে লম্বা বাবরি ওয়ালা একটা ছেলেটা কবিতার পশরা বসিয়েছে।সে একা।আবার তার একটু দুরে কয়েক জন মিলে নেশার সাগরে ডুবে আছে।রাসেল ও তাদের একজন।রাসেলের নিঃশ্বাস থেকে বের হওয়া প্রতিটা ধোয়া দূষিত করে দিচ্ছে স্নিগ্ধ শীতল বাতাসকে।ওদের অদ্ভুত আওয়াজ করে বলা কথা গুলো কবিকে খুব বিরক্ত করছে।নেশায় থাকলে মানুষের শুধু কথা না,পুরো মানুষটাই অদ্ভুদ বাজে লাগে।

এক পর্যায়ে কবি কবি ভাবের ছেলেটা নিঃশব্দে উঠে  গেল।আর বলে গেল...  "কাটিল জীবন নেশার ঘোরে,  বাকি রইল না কিছু।  অক্ষি কেবল দেখিল ধোয়া   নেশা ছাড়িল না পিছু।"    রাসেল একটু উঠে পাশ থেকে মদের বোতলটা তুলে ছুড়ে মারল।

আর বলল-  "তুই ও তো কবিতায় আসক্ত।কবিতার নেশা তোকে বলদ বানিয়ে দিল।" 

পাশ ফিরে আবার বসতে যাবে, ঠিক তখনই চোখ পড়ল দোতলায়। বিরাট একটা নামাজের রুম।প্রায় সব জানালা গুলোই বন্ধ। একটা জানালা থেকে আলো বের হচ্ছে। আর জানালার চারপাশ আলোকিত করে রেখেছে। স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে কেউ একজন দাড়িয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে দুটো হাত তুলে কান্না করছে। মনে হচ্ছে জানালা থেকে বের হওয়া আলোর ফোয়ারা গুলো ওর মুখমন্ডল থেকে বের হচ্ছে।

সে কি নূরানি চেহারা। আরবের নীল চোখ ওয়ালা সুদর্শণ যুবকদের মত। মদের নেশার কারনে বার বার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে রাসেলের।কাছে পানির বোতল ও নেই।তাই কিছুটা মদ হাতে নিয়ে নিজের মুখে মারল নেশা কাটাবার জন্য। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এলোমেলো পায়ে ঢুলতে ঢুলতে কবির কাছে গেল।ওকে এভাবে দেখে কবি একটু ভীত হয়ে বলল-  কি হে বৎস?   

রাসেল কবির কাধে ভর দিয়ে পাশে জোর করে বসালো। এরপর ঝাপসা ঝাপসা চোখ নিয়ে কবিকে জিজ্ঞেস করল ঐ জানালায় তুমি কি দেখতে পাচ্ছো?   

কবি তার চাশমাটা একটু ঠেলে উপরে  ভালো করে তাকাতে লাগাল। তারপর অনুসন্ধিৎসু চোখে ভালো করে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল-    "ঐ বৎস তাহার সঙ্গীদেরকে গল্প বলায় ব্যাস্ত।  এ দিকে তোমার জীবন আয়ুর হয়ে যাচ্ছে অস্ত।"   

একে তো কুয়াশা। তার ওপর রাসেল এখনো ঝাপসা দেখছে।কবির পকেটে হাত দিতেই কবি আবার বলে উঠল-    "বই কিনে খুইয়েছি সব  পকেটে নেই কোন কড়ি।  ক্ষুধা পেলা কবিতা খাই  গাড়িতে নাহি চড়ি।"   

এবার রাসেল একটু রেগে বলল , ওরে ভাই, আমি বাটপার না। আমি তোমার পকেটে পানি খুজছিলাম। কড়ি না। আছে কি পানি?    কবি এবার একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিল। বলল- "বাম পকেটে পানি থাকে না  তাহার জায়গা ডানে।  ডান পকেট রেখে বাম পকেটে  হাত দেয়ার নেই যে কোন মানে।"   

রাসেল এবার আরো বিরক্ত।এটা মানুষ নাকি অন্য কিছু।একে কিভাবে মানুষ সহ্য করে।তারপর বাম পকেটে হাত দিয়ে পানির বোতলটা বের করে মাথায় ঢেলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো তোমাদের বাংলা বিভাগের সবাই কি তোমার মত বুদ্ধিজীবি নাকি সাধারন পাবলিক ও আছে?কবি কোন উত্তর দিল না।এই কনকনে শীতের রাতে এভাবে মাথায় পানি ঢালার মত পাগলামো করতে দেখে কবি বলে উঠল- "তুমি বৎস মাতাল হইয়াছো  ....................................... 

 এবার রাসেল কবিকে একটা ধমকি দিয়ে বলল চুপ করে শালা কবির বাচ্চা।আর শুনতে চাই না তোর ঘ্যান ঘ্যান।পানির জন্য এসে ছিলাম।পানি পেয়েছি। এবার যা এখান থেকে।কবি ভয়ে ঘাপটি মেরে বসে পড়ল। বলল কবিদের সাথে এমন ব্যাবহার করতে নেই।স্রষ্টা তোমায় সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করুন।ভালো থাক বৎস...  এরপর নিজের ব্যাগ গুলো গুছিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।   

[৩]  রাসেলের চোখ অনেকটা ঠিক হয়েছে।এখন সত্যই দেখছে সেই দাড়ি-টুপি ওয়ালা ছেলেটা অনেক গুলো ছেলেদের সাথে কি যেন আলোচনা করছে।এই ছেলেটার নাম শরীফ।এই মধ্য রাতে, নির্জন নামাজের রুমে এত গুলো ছেলেদের কি বলছে? নিশ্চয় সমস্যা আছে। আগে ও ওকে তেমন সুবিধের ঠেকে নি। কিন্তু কিছু না পাওয়ায় ধরতে পারে নি।এর মাঝে রাসেলের মাথা গরম হয়ে গেল।আজ হাতে নাতে ধরতে হবে জঙ্গিটাকে। একটা কাঠ মোল্লা।শুধু দাঙ্গা খাড়া করা এদের কাজ।

সমাজে সম্প্রিতি ভালোবাসা দেয়ার পরিবর্তে সব ছেলেদের জিহাদের শিক্ষা দেয়।কিছু হলেই যুদ্ধ করব।এই করব, সে করব। নাহ্,আর দেরি করা ঠিক হবে না।ফোনটা বের করে কয়েক জনকে ফোন দিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে দশ বারোটা মটর সাইকেল ভো ভো শব্দ করতে করতে হাজির।তাদের সবার হাতে কম হলে ও একটা করে স্ট্যাম্প।

সবাইকে নিয়ে রাসেল সগর্বে বুক ফোলাতে ফোলাতে যাচ্ছে।পেছনে সব সাগরেদরা।সামনে রাসেল,বার বার শার্টের কলার ধরে উপরে তুলছে আর বলছে আজ রক্ষে নেই।এত রাতে এত গুলো মটর গাড়ির শব্দ পেয়েই সবাই বুঝে ফেলল কিছু একটা হতে যাচ্ছে।গিটারের ঝংকার ও নেই,নেই কোন গানের পশরা।সবাই দৌড়ে যার যার রুমে চলে গিয়েছে। আল্লাহ্ না করুন যদি খুনাখুনি হয়ে যায় তবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হবে। কে এই ঝামেলা সহ্য করে।আস্তে করে সব ছেলে গুলো রুমে ঢুকে গেল। শেয়াল মুরগি চুরি করে যেমন গর্তে পলায়ন করে। দশ তলা বিল্ডিংয়ের একটি বাতি ও এখন জ্বলে না।

মনে হচ্ছে সেই প্রথম রাতেই সবাই গভীর নিদ্রা দিয়েছে।এ দিকে রাসেল সবাইকে নিয়ে সিড়ি দিয়ে উঠে গেল।এত উদ্দীপনার ভেতরে ওর মনে নেই যে প্রচন্ড নেশা করে ছিল।কবির পানি দেয়ার কারনে যে টুকু নেশা কেঁটে ছিল তা আবার আসতে শুরু করেছে। রাসেলের কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম তার প্রমান। বৃদ্ধা আঙ্গুল দ্বারা একটা টান দিয়ে ঘাম গুলো ছিটিয়ে ফেলল। এরই মাঝে নামাজ রুমে উপস্থিত হওয়ায় সেখানের ছেলে গুলো খুব ভয় পেয়ে পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু দুটো দরজার সামনেই হাতে হাড় ভাঙা যন্ত্র নিয়ে অতন্দ্র প্রহরীর মত রাসেলের বাহিনি দন্ডায়মান।পালাবে কোথায় আজ? আজ কেচ্ছা খতম করে দিব। 

এর মাঝে রাসেল পাশের এক জনের হাত থেকে একটা স্ট্যাম্প নিয়ে শরিফের দিকে আগাচ্ছে আর বলছে ভদ্রতার মুখোশ ধারী দাঙ্গাবাজ।তোমাকে দেখে আগেই ভেবে ছিলাম সমস্যা আছে।হাতে নাতে ধরতে পারি নি। আজ কোথায় যাচ্ছ?আগামি কাল পত্রিকার শিরোনামে আমাদের বিরত্ব গাঁথা কথা থাকবে।রাসেল ও তার সঙ্গীদের ধোলাইয়ে জঙ্গী নেতা শরিফ নিহত।   

শরিফ খুব শান্ত চেহারা নিয়ে বলল দেখুন আপনারা ভুল করছেন। আমি ওদের শেখাচ্ছিলাম একজন মুমিনের জন্য সালাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কে শোনে কার কথা?শরিফকে আজ বিশ্বাস করা হবে রাসেলের জীবনের সব থেকে বড় বোকামি।তাই স্ট্যাম্পটা উঠিয়ে যেই না শরিফকে মারতে যাবে ঠিক তখনই রাসেলের মুখ থেকে বের হয়ে এলো দুর্গন্ধ যুক্ত বমি ও রক্ত। আর সে গুলো একদম গিয়ে শরিফের সাদা পাঞ্জাবির ওপর পড়ল।

রাসেল কাত হয়ে পড়ে যাবে ঠিক তখন শরিফ হাত বাড়িয়ে নিজের কোলের মধ্যে ধরে ফেলল। নেতার এমন অসুস্থতা দেখে তারা আর কিছু না বলে দ্রুত হসপিটালে নিয়ে গেল।রাত তখন প্রায় সাড়ে চারটা।সেই নোংরা পাঞ্জাবি পড়ে শরীফ ও আস্তে করে ওদের সাথে গেল। রাসেলকে ডাক্তাররা এমার্জেন্সিতে রেখেছে।বলেছে নিয়মিত মদ্য পান করার কারনে পাকস্থলীতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।এভাবে কেঁটে গেল আরো দুই ঘন্টা।

রাসেলের জ্ঞান ফিরেছে। জ্ঞান ফিরতেই দেখে শরিফ সেই নোংরা পাঞ্জাবি পড়া অবস্থায় ওর পাশে বসে মুনাজাত করছে আর বলছে -হে আল্লাহ্।রাসেল আমার মুসলিম ভাই।সে অবুঝ।তাকে মাফ করুন।তাকে সুস্থতা দান করুন। সঠিক পথে পরিচালিত করুন।"   

আর বাকিরা সবাই টেবিল-চেয়ারে গভীর ঘুমের দেশে ভ্রমন করে বেড়াচ্ছে।রাসেল তার হাতটা শরিফের দিকে বাড়িয়ে বলল ভাই শরিফ আমি তোমাকে মারতে চেয়েছি,তোমার শরীরে বমি করে দিয়েছি।তোমাকে মন্দ কথা বলেছি।তারপর ও তুমি আমার জন্য এত কিছু কেন করছ?  শরীফ একটু মুচকি হেসে বলল আমার রাসুলের (সাঃ) ভালোবাসা আমাকে এটাই শিক্ষা দেয়।   

শরিফ এবার একটু উঠে বসার চেষ্টা করল।কিন্তু পেটে প্রচন্ড ব্যাথা।তাই পারল না।শরীফকে বলল ভাই শরিফ তুমি একটু আমার কাছে আমি।আমি উঠে বসতে ও পারছি না,আবার জোরে কথা বলতে ও পারছি না।শরীফ একটু কাছে যাবার পর রাসেল শরীফের হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলল- যে রাসুলের (সাঃ) ভালোবাসা মানুষকে এত আন্তরিক ভাবে ভালোবাসতে সেখায়, আমি ও সে রাসুলকে (সাঃ) ভালোবাসতে চাই।     


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ