Belal Uddin
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০৪:২৩পি এম

জোনাকপাখি

জোনাকপাখি Ad Banner

[১]  রুহি প্রথম যেদিন আমাদের বাসায় এসেছিল সেদিন আলোয় ঝলমলিয়ে উঠেছিল চারিপাশ। আলোকিত হয়েছিল আমার পৃথিবী। ওর ভেতরের তীব্র আলো আমার হৃদয়ে ঠিকরে ঠিকরে পড়ছিল। জ্বলে-পুড়ে ঝলসে যাচ্ছিলো আমার নিশ্চল দৃষ্টি। আমার রুহির তেমন রূপ ছিল না বটে, কিন্তু তার চোখের ভেতরে থাকা অসহ্য মায়া, কঠিন আলোকচ্ছটা- আমায় নিঃশেষ করে দিয়েছিল। আদর করে নাম দিয়েছিলাম- জোনাকপাখি।   

এমন একজন জোনাকপাখির সাথে এই ঠুনকো মানুষের সংসার হতে পারে- তা আমার কাছে ছিল অকল্পনীয় বিষয়। পুরোটা ঘরময় ওর আলোর বিন্দু মিশে মিশে থাকতো। পরিবারের সবাইকে এতটা ভালোবাসা যায়, এতোটা আগলে রাখা যায় ওকে না পেলে কখনো বুঝতামই না। মাঝে মাঝে মনে হতো আমিই বাড়ির পর কেউ, আর ও-ই এ বাড়ির নিজের মেয়ে- সবার যেন চিরচেনা এক আপনজন। জানালার গ্রিল ভেদে হুড়মুড় করে বাতাসেরা ঘরে ঠাঁই করতো, শুধু জোনাকপাখির একটু স্পর্শ নেবে বলে। আমার জোনাকপাখিকে আমি বড্ড ভালবাসতাম- এ কথা বললে ভুল হবে; ও বাধ্য করেছিল ভালোবাসতে।   

কিন্তু ওর জন্যে সবার ভালোবাসা কর্পূরের মত উবে গিয়েছিল সেদিন, যেদিন সবাই জেনে গিয়েছিল লুকিয়ে রাখা সেই রহস্যটা। আমি বিয়ের আগে থেকেই জানতাম রুহি একজন ধর্ষিতার মেয়ে। কিন্তু কখনোই কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি। কারণ এতে তো তার কোনো দোষ ছিল না, না ছিল তার মায়ের। আমার শাশুড়ি ছিলেন রুহির নানু-নানির একমাত্র মেয়ে। উনার জীবনের সেই দুঃস্বপ্নকে কেন্দ্র করেই রুহির আগমন। ওকে জন্ম দেবার সময় আমার শাশুড়ি আম্মা মারা যান। নানু-নানিই রুহিকে বড় করেছেন। কখনো ওকে জানতে দেননি কিছুই। বলেছেন ওর মা-বাবা কেউ নেই। রুহি অন্যান্য বাচ্চাদের মতো জিজ্ঞেস করেনি- কেন নেই? ওর যতটুকু আছে ততটুকু নিয়েই ও বাঁচতে শিখেছে সেই ছেলেবেলা থেকেই।   

[২]  আমার মা কিভাবে বিষয়টা জেনেছিলেন তা আজ অব্দি আমি জানিনা। ডিভোর্স পেপার পর্যন্ত রেডি করেছিলেন। কিন্তু আমি কোনোভাবেই রুহিকে খুঁইয়ে দিতে চাইনি। অনেক বোঝানোর পর মা শান্ত হয়েছিলেন। সেদিন রুহি আমার চোখে চোখ রেখে একটাই প্রশ্ন করেছিল,     এসব কি সত্যি?    আমি শুধু নিশ্চুপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দ্বিতীয়বারের জন্য আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি ও।   

সেদিনের ঘটনার দু'দিন বাদে জোনাকপাখি আমায় জানিয়েছিল আমাদের ছোট্ট একটা জোনাকছানা হবে। আমি স্তব্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। সেই অনুভূতিটা অপ্রকাশিত থাক- সেটা ব্যক্ত করবার ক্ষমতা আমার নেই। আমি দৌঁড়ে মাকে খবর দিতে গিয়েছিলাম। খুশিতে গদগদ হয়ে বলেছিলাম, তুমি দাদুমুণি হবে, মা। মা রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে বলেছিলেন নোংরার পেট থেকে আরও একটা নোংরা এ বংশে তিনি চান না। অনেক বছর পর সেদিন আমি বাচ্চার মতো কেঁদেছিলাম। রুহিকে বলেছিলাম বাসা ভাড়া নিয়ে আমরা আলাদা থাকবো।

কিন্তু ও না করে দিয়ে বলেছিল, আপনি আব্বু-আম্মুর একমাত্র সন্তান। উনাদের হক্বের ব্যাপারে এতো নির্লিপ্ত কিভাবে হতে পারলেন? আমার জোনাকপাখিটা! কতটা যন্ত্রণা সয়ে গেছে নিশ্চুপ হয়ে। ওর উপর কত নির্মম নির্যাতনের ঝড় বয়ে গেছে তা আমি জানি। ও কোনদিনও নালিশ করেনি ঠিকই, কিন্তু ওর মায়াবী চোখে জমে থাকা অজস্র অথৈ নোনাকষ্টেরা আমায় সবটুকু বলে দিত।   

[৩]  একদিন অফিসে বসে বসে কাজ করছিলাম। হঠাৎ বাসা থেকে ফোন আসে। আব্বু বললেন, রুহি আইসিইউ-তে। হন্তদন্ত হয়ে হসপিটালে ছুটে গেলাম। ডক্টর বললেন, আজ‌ই ডেলিভারি করতে হবে, আর বাচ্চার পজিশন ভালো না। আমার মাথায় সবকিছু জট পাকাচ্ছিলো। ডেলিভারি ডেইট ছিল আরও পনেরো দিন পর। রেগুলার চেকআপে সবসময় বাবুর পজিশন‌ও ভালো ছিল।     

তবে সব জট খুলেছিল- যেদিন খালাবুয়া আমায় রান্না ঘরে ডেকে নিয়ে চুপিচুপি সব খুলে বলেছিলেন। রুহি শুধু মা'র চুলে সেদিন হাত দিয়ে বলেছিল, কতদিন আপনার চুলে তেল দিয়ে দিইনা, মা! আজ একটু দিই? মা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন ওকে। ও টেবিলের কর্ণারে ছিটকে গিয়ে পেটে আঘাত পেয়েছিল। তবুও মা রুহিকে ওঠাতে যাননি। আব্বু আর খালাবুয়া এনে ভর্তি করিয়েছিলেন হসপিটালে।     

[৪]  রাত হয়েছে বেশ। বাড়ির পাশের লেকের ধারে লন্ঠন কাঁধে ভিড় জমিয়েছে জোনাকিরা। বাতাসের দল সামনের কামিনী গাছে লুটোপুটি খাচ্ছে। কামিনী ফুলেরা ঝরে ঝরে পড়ছে কবরের ওপরটায়। ফুলেদের আস্তরণে কবরটা সাদা চাদরের মতো দেখাচ্ছে যেন। আমার হাতের মুঠোয় জোনাকছানার হাত। মাথাটা বাঁকিয়ে উপরে তুলে আমায় বললো, বাবা, তুমি আমাকে এখানে আনলে কেন? তুমি তো আমাকে আম্মুর কাছে নিয়ে যাবে বলেছিলে!    আমি কবরটার দিকে ইশারা করে বললাম, তোমার আম্মু এখানটায় থাকে, সোনা।     

জোনাকছানা অন্যান্য বাচ্চাদের মতো জিজ্ঞেস করলো না- আম্মু এখানে থাকে কেন? একদম আমার জোনাকপাখির মতো স্বভাব পেয়েছে। দ্বিতীয়বার কিছু জিজ্ঞেস করে না। জোনাকছানার ভেতর নিজের সবটুকু আলো পুরে দিয়ে তাকে পৃথিবীতে এনে সেদিন হারিয়ে গেছে আমার জোনাকপাখি। হাতের মুঠোয় দিয়ে গেছে জোনাকছানার ছোট্ট হাত।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Khandokar Ismail Hossain - (Tangail)
প্রকাশ ১৪/০২/২০২১ ১২:৪৭পি এম