Md.Limon
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০১:১৩এ এম

চেতনায় একুশে ফেব্রুয়ারি

চেতনায় একুশে ফেব্রুয়ারি Ad Banner

ব্রিটিশের কবল থেকে সাতচল্লিশে পৃথক জাতি হিসেবে বেরিয়ে আসার পর ভেবেছিলাম স্বাধীনতা বুঝি পেলাম। কিন্তু বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গােষ্ঠী প্রমান করতে চাইলাে আমরা স্বাধীন বাঙ্গালী নই শুধুই আজ্ঞাবহ ।

পৃথিবীর বুক থেকে বাঙ্গালী জাতীয়তাবােধকে চির দিনের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দিতে ঐ দিন আঘাত হানলাে বাংলা ভাষার উপর। ওরা ভেবেছিল বাঙ্গালীর মুখ থেকে ভাষাকে কেড়ে নিতে পারলে ঘরের পােষ মানা গােলাম করে যেমন রাখা যাবে তেমনি জাতীয় চিন্তা চেতনার মূলােৎপাটনও করা যাবে। অথচ পশ্চিমারাও ওদের নিজের ভাষায় কথা বলে। অর্থাৎ পৃথিবীর যে কোন জাতির চিন্তা চেতনার মূলে রয়েছে ভাষার স্বাধীনতা।               

সভ্যতার আদিকাল থেকে মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে বসবাস করে আসছে। ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে ভাষা। দেশ জাতি অঞ্চল ভেদে এর ভিন্নতা ব্যাপক পরিলক্ষিত । প্রত্যেক জাতি তার আপন ভূমন্ডলে নিজস্ব স্বকীয়তায় চীর ভাস্বর। যে কোন জাতিকে উদীয়মান সূর্যের মত গৌরবের শীর্ষে উপনীত হতে হলে ভাষাকে মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মেলার স্বাধীনতা দিতে হবে। আমরা বাঙ্গালী। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, মনের ভাষা। একটি বাঙ্গালী শিশু "মা শব্দ মুখে নিয়ে বড় হয়"। পৃথিবীর অন্যান্য সমৃদ্ধ ভাষার মত আমরাও চেয়েছিলাম বাংলা ভাষা আপন মহিমায় বিকশিত হােক।

গােধূলীর আবিরে নিজেকে রাঙিয়ে পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিক মিষ্টি সুবাস। চেয়েছিলাম এই ভাষা গােধুলীর আবিরে নিজেকে রাঙিয়ে পৃথিবীময় মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দিক। চেয়েছিলাম পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগােষ্ঠী হিসেবে বাংলা হােক রাষ্ট্রের কথা বলার ভাষা। অথচ কুচক্রী শাসক গােষ্ঠী বাংলা ভাষাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। ফলে ফ্রেব্রুয়ারির একুশ এলে ওরা বন্দুকের নলে আঘাত হানলাে বাঙ্গালীর বুকে। সােনার ছেলেদের সােনালী তাজা রক্তে রঞ্জিত হলো রাজপথ। রফিক শফিক বরকত সালামের মত দামাল ছেলেরা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেল এদেশের মাটিতে। অবশেষে বাংলা ভাষা পেল স্বাধীনতা। হেসে উঠল রক্তিম লাল সূর্য্য। হাসি ফুটলাে মায়ের মুখে। ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা বীর সেনারা কোটি কোটি বাঙ্গালীর বুকে রক্ত গােলাপ হয়ে ফুটে রইল। সেদিন থেকে জন্ম নিল একটি চরণ               

"মোদের গরব, মােদের আশা                   

 আ-মরি বাংলা ভাষা ।             

আমাদের জাতীয় জীবনে একুশ মহান একটি দিন। তাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই দিনটিকে । একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ জাতি হিসেবে আমরা একুশকে সামনে রেখে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর কড়াল গ্রাস থেকে এই দেশকে মুক্ত করেছি। একুশ আমাদের হাসতে শিখিয়েছে সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করতে শিখিয়েছে। প্রমান করেছে এদেশ ঈশা খাঁ, তিতুমিরের মত বীরের দেশ। তাই একুশ আমাদের কাছে প্রতিদিনের প্রভাতের মতাে চিরসুন্দর। আজ শুধু দেশেই নয় বিদেশেও একুশ আন্তর্জাতিকমাতৃভাষা দিবস হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত যা বাঙ্গালী জাতির জন্য শ্রেষ্ঠ গৌরবময় অর্জন।             

একুশ আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। দিয়েছে বেঁচে থাকার অধিকার। দিয়েছে দেশ ও জাতির স্বাধীনতা। আর দিয়েছে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে মূল্যবােধের প্রগাঢ় ধ্যান ধারনা। সে দিনের একুশ ছিল পশ্চিমা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম। জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ সর্বস্তরের মানুষ সে দিন জয়ের নেশায় মেতে উঠেছিল। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পরাভূত করে মায়ের ভাষা মাকেই ফিরিয়ে দিয়েছিল। তারপর দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর। এভাবে প্রতিনিয়ত ছুঁয়ে গেছে একুশকে। যেহেতু জীবনের বিনিময়ে আমরা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি তাই মনের মন্দিরে জাগরুক করে রাখার জন্য বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাকে স্মরণ করে থাকি।

দেশ ব্যাপী প্রভাত ফেরির মাধ্যমে দিনের সূচনা হয়। শহীদ মিনারের পাদ দেশে তাজা ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলির মধ্য দিয়ে। রক্তিম সূর্যের উদয় হয় । আবাল বৃদ্ধ বনিতারা বিষন্ন মন নিয়ে প্রত্যুশেই জেগে উঠে। অলিগলি রাজপথ ব্যানার ফেস্টুন আর প্লাকার্ডে ছেয়ে যায়। দিকে দিকে সভা সমাবেশের আয়ােজনে মেতে উঠে তরতাজা তরুণের দল। মঞ্চের বেস্টনি থেকে ভেসে আসে আগুন ঝরা বক্তৃতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে বসে একুশের বই মেলা আর শিশু কিশোররা মেতে উঠে চিত্রাংকন প্রতিযােগিতায় । সকলের লক্ষ্য একটিই একুশের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারন করে মর্মস্পর্শী করে তােলা। এক সময় দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, আসে রাত্রীর নিরবতা। বাঙ্গালী বীর সন্তানেরা ক্লান্ত দেহে প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়ে পরে। একুশ ফিরে যায় তার নিজস্ব ঠিকানায়। বছর ঘুরে আবার আসে, চলে আনুষ্ঠানিকতার মাতম। এভাবে আমরা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে একুশকে তুষ্ট রেখেছি। যে ঐক্য নিয়ে সেদিন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলাম সেই ঐক্য নিয়ে কেন আজ দেশ গড়ায় আত্ননিয়াগ করতে পারি না? আমরা তাে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ জাতি।

দেশের জন্য আমাদের আছে প্রগাঢ় ভালােবাসা। ইচ্ছে করলে আমরাই পারি দেশকে সাফল্যের উচ্চ শিখড়ে পৌঁছে দিতে। অথচ স্বার্থ হানাহানি আর সংকীর্নতায় আমরা আমাদের মনকে আবিষ্ট রেখেছি। অন্যের উদারতায় বিদ্বেষের বিষ বাল্প ছড়িয়ে পরিবেশকে কলুষিত করছি। অবৈধ উপায়ে নিজের ভাগ্য ফেরানাের মধ্যে দেশের মঙ্গল খুঁজে ফিরছি। অধিক জনসংখ্যার উত্তাল ঢেউ উন্নয়নের সকল প্রচেষ্টাকে ঘুঁণে পােকার মত খেয়ে ফেলছে। প্রতি বর্গ কিলােমিটারে ষােল শ লােকের বসবাসের এমন দূর্ভাগ্যজনক বিরল ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। খাদ্য উৎপাদনে সফলতা সত্বেও শুধু সমবন্টন আর সচ্ছলতার অভাবে এখনও অনেক মানুষ অর্ধাহার অপুষ্টিতে দিনাতিপাত করছে।

স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ সময় পরও আমরা অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতে পারিনি। এটা আমাদের সমাজ ও জাতীয় জীবনে চরম ব্যর্থতা। অথচ আমাদের লােকবল আছে, মনােবল আছে, অফুরন্ত সম্পদ আছে। আছে বঙ্গমাতার স্নেহের পরশ। এখন দরকার দেশের জন্য একটু খানি প্রেম। এই প্রেম ভালােবাসাই মনের কালিমা মুছে দিয়ে দেশের সকল মানুষকে নিয়ে ঐক্য গড়তে পারে। ভুললে চলবেনা যে, আমরা বাঙ্গালীরা বীরের জাতি। ঈশা খাঁ , তিতুমীর, সিরাজদৌলা, শেরে বাংলা, বঙ্গবন্ধু যদি বীর বেশে জাতির ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করতে পারে তবে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব। বাঙ্গালী জাতি সৌর্য্যবির্য্যের জাতি ।

মাথা উঁচু করে চলাই এ জাতির অভ্যাস। আমাদের ইতিহাস ভাষা আন্দোলনে সফলতার ইতিহাস। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতার ইতিহাস। আমরাই সৃষ্টি করেছি এ ইতিহাস। এখন আমাদের সৃষ্টি করতে হবে দেশ গড়ার ইতিহাস। এ জন্য আমাদের হতে হবে সৎ ও পরিশ্রমী। কেবল দেশের গান গেয়ে কিম্বা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে দেশ গড়া যাবে না।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লাঙ্গল, কোদাল, গাইতি হাতে কাজ করার মধ্যে দেশের সত্যিকার উন্নতি নিহিত। তবেই তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্ত মর্যাদা পাবে। অর্থবহ হবে একুশের রক্ত দান। তা না হলে পরপারের জগৎ যদি সত্য হয় আর রফিক শফিক করকতের সঙ্গে দেখা হয় আর যদি বলে একুশের জন্য তােমরা কি করেছ ? কি জবাব দেব আমরা ? আসুন, আমরা সকলে মিলে এর যথাযথ উত্তর খুঁজি ।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ