Rakib Monasib
প্রকাশ ২০/০২/২০২১ ০৯:৫৮এ এম

মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রভাব কমছে মধ্যপ্রাচ্যে

মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রভাব কমছে মধ্যপ্রাচ্যে Ad Banner

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের মিত্রতা ঐতিহাসিক ও কৌশলগত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের বন্ধুত্ব ভিন্ন মাত্রা পায়। বিশেষত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (সংক্ষেপে এমবিএস নামে পরিচিত) সঙ্গে ট্রাম্প ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের ব্যক্তিগত হৃদতা উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাদের সম্পর্কের আলোয় চাপা পড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানোর নামে এমবিএসের হাত ধরে ইয়েমেনে সৌদি হস্তক্ষেপের মতো আলোচিত-সমালোচিত ইস্যু। তবে ট্রাম্পের বিদায়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ঠিকই, তবে ঔজ্জ্বল্য হারাতে বসেছেন এমবিএস। বাইডেন প্রশাসনের শুরুর দিককার কার্যকলাপে অন্তত এমন ইঙ্গিত মিলছে। 

সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজের বয়স ৮৫ বছর। দায়িত্ব চালিয়ে গেলেও বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকেন। সৌদি আরবের ক্ষমতার লাগাম মূলত ৩৫ বছর বয়সী যুবরাজ সালমানের হাতে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে তরুণ নেতা এমবিএসের প্রভাব ও গুরুত্ব বেশ ভালো। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তার সমালোচনার অন্ত নেই। বিশেষত তুরস্কের মাটিতে সৌদি রাজতন্ত্রবিরোধী সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ বিগত দিনগুলোয় এমবিএসের সমালোচনার পাল্লা ভারি করেছে।

ট্রাম্প জামাতা কুশনারের সঙ্গে এমবিএসের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ উষ্ণ। এ সম্পর্ক ট্রাম্প আমলে রিয়াদ-ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নির্ধারণে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত থাকার পরও এমবিএসকে রীতিমতো দায়মুক্তি দেন ট্রাম্প। এমনকি সৌদি আরবে অস্ত্র সরবরাহ জোরদার করেন তিনি। হুতি বিদ্রোহীদের দমনের নামে সেসব অস্ত্র ইয়েমেনের নিরীহ মানুষের ওপর প্রয়োগ করেছেন এমবিএস—এমন অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সৌদি আরবে একের পর এক ধর্মীয় ও নারীবাদী সংস্কারককে আটক ও হয়রানি করা হলেও টুঁ শব্দ করেনি হোয়াইট হাউজ। এসবই হয়েছে ট্রাম্প-কুশনার-এমবিএসের উষ্ণ সম্পর্কের জেরে।

খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর এমবিএসের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউজ কার্যত নীরব থাকলেও সরব ছিলেন ডেমোক্র্যাট দলের রাজনীতিকরা। ওই সময় তারা প্রকাশ্যে দাবি তোলেন, জড়িত থাকলে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এমবিএসকে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারের সময় বাইডেনের কণ্ঠেও অনেকটা একই সুর শোনা গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল বাইডেন ক্ষমতায় গেলে এমবিএসের সঙ্গে হোয়াইট হাউজের উষ্ণ সম্পর্কে ভাটা পড়তে পারে। নতুন মার্কিন প্রশাসনে গুরুত্ব হারাতে পারেন এমবিএস।

বাস্তবেও এখন তেমন ইঙ্গিত মিলছে। বাইডেন প্রশাসন এমবিএসের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার তুলনায় সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক নতুন করে ঝালাই করে নিতে বেশি আগ্রহী। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তি নয়, বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহ বেশি নতুন মার্কিন প্রশাসনের।

বাইডেন ক্ষমতা নেয়ার পর বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের হারাতে বসা ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে ঝালিয়ে নিচ্ছেন পররাষ্ট্রনীতির মারপ্যাঁচগুলো। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছিল বাইডেন কি আলাদা করে এমবিএসের সঙ্গে কথা বলবেন? কেননা বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পূর্বসূরি ট্রাম্প এমবিএসের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতেন। পরামর্শ আদান-প্রদান করতেন। 

তবে এ সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জেন পাস্কি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তার স্পষ্ট উত্তর, প্রটোকল মেনে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সমমর্যাদার অধিকারী সৌদি বাদশাহ সালমান। তাই বাইডেন সুবিধাজনক সময়ে সৌদি বাদশাহর সঙ্গে কথা বলবেন। জেন পাস্কির এমন মন্তব্য থেকে এটাই বোঝা যায়, হোয়াইট হাউজের অগ্রাধিকার তালিকায় এখন আর নেই এমবিএস। ট্রাম্প-কুশনারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে গুরুত্ব হারিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্পের শাসনামলের শুরুর দিকে রিয়াদ-ওয়াশিংটনের মিত্রতায় কিছুটা শীতলতা নেমে আসে। ওই সময় একগুঁয়ে ও হঠকারী ট্রাম্পকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি সৌদি প্রশাসন। বাধ্য হয়ে ওয়াশিংটনের আস্থা অর্জনে কুশনারকে বেছে নেন এমবিএস। এ কৌশলে তিনি পুরোপুরি সফল। অস্ত্র বিক্রি বাড়ানো, খাসোগি হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইয়েমেনের মতো গুরুতর ইস্যুতে ট্রাম্পের নীরবতা এর প্রমাণ। ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে কার্যত এমবিএসকে উচ্চাভিলাষ পূরণের পথে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন তিনি। ওই সময় কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও মিত্র দেশগুলোর অবরোধ আরোপের পেছনে মূল কলকাঠি নেড়েছেন ট্রাম্প ও এমবিএস। এমনকি এমবিএসের হাত ধরে সৌদি আরবকে ইসরায়েলমুখী করতে সফলতার দাবি করতে পারেন ট্রাম্প।

এসবই এখন অতীত। বাইডেন ব্যক্তি এমবিএসের পরিবর্তে রাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষায় বেশি আগ্রহী। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি বলেছিলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ট্রাম্পের নীতি থেকে ওয়াশিংটনকে সরিয়ে আনা হবে। সম্প্রতি জেন পাস্কি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কাজ করবে বাইডেন প্রশাসন। এবং এক্ষেত্রে সমমর্যাদার ব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে। অর্থাৎ এটা সুস্পষ্ট যে মার্কিন-সৌদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে মূলধারার কৌশল অবলম্বন ও প্রচলিত পথে হাঁটতে চাইছেন বাইডেন।

ক্ষমতা গ্রহণের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রির পথ সংকুচিত করে এনেছেন বাইডেন। তিনি চান না, মার্কিন অস্ত্রে ইয়েমেনে আর রক্ত ঝড়ুক। কেননা তিনি ও তার দল ডেমোক্রেটিক পার্টি বরাবরই ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনের সমালোচনা করে এসেছেন। তাই মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে এ অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও এমবিএসের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণে সম্মতি নেই তার। বাইডেনের এমন নীতি এমবিএসের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে এতে সন্দেহ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সৌদি আরবকে উপেক্ষা করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র। ইরান-ইসরায়েল-তুরস্ক-সৌদির মধ্যকার প্রভাব বিস্তারের লড়াই চলমান থাকলে আখেরে ওয়াশিংটনের লাভ বেশি। সম্পর্ক ভালো থাকলে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলোর ওপর রিয়াদের প্রভাব কাজে লাগাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রও। এমনকি জ্বালানি তেলের বাজারে প্রভাব বিস্তার ও মূল্য নির্ধারণের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে রিয়াদের শক্তিশালী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মূলত এসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে ঐতিহাসিক মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর বাইডেন। তবে সে পথে এমবিএসের প্রভাব কতটা কমবে তা সময়ই বলে দেবে।

এ বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক তালহা আব্দুল রাজাক বলেন, হোয়াইট হাউজের সাম্প্রতিক কৌশল দেখে মনে হচ্ছে বাইডেনের সৌদি আরবকে প্রয়োজন, তবে এমবিএসকে নয়। তবে চাইলেও তিনি তরুণ এ নেতাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। কেননা এমবিএস সৌদি আরবের পরবর্তী শাসক। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তার প্রভাব রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাইডেনকে অবশ্যই এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ