Belal Uddin - (Dhaka)
প্রকাশ ১৩/০২/২০২১ ০২:৩৩পি এম

কাশ্মীর থেকে বাবরি!

কাশ্মীর থেকে বাবরি! Ad Banner

কাশ্মীরে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বলা যায়, কাশ্মীরের আশিলাখ মুসলিমানের সঙ্গে পুরো মুসলিমজাহানই বেদনার প্রচ-তায় স্তব্ধ বিমূঢ়। এর মধ্যে আবার একটা আঘাত এলো হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষ হতে আদালত ও বিচারপ্রহসনের নামে।

অবশ্য আমরা যা আশঙ্কা করেছিলাম শেষ পর্যন্ত তাই ঘটেছে। যারা অতিশয় আশাবাদী তারা অবশ্য ভেবেছিলেন, আদালত, বিচারক ও প্রধানবিচারপতি অন্তত বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে রায় প্রদান করবেন।

আমরা তা ভাবিনি; যা হয়েছে তাই ভেবেছি। অর্থাৎ অতিআশাবাদীরা প্রতারিত হয়েছেন; আমরা প্রতারিত হইনি, পরাস্ত হয়েছি।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, অযোধ্যার বাবরি মসজিদের বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমিতে রামমন্দির তৈরী হবে। তবে আদালত ‘উদারতা’ প্রদর্শন করে বলেছেন, বাবরি মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রায় দ্বিগুণ জায়গা পাঁচ একর ভূমি দেয়া হবে।

কেন দেয়া হবে, যদি মসজিদের অস্তিত্বের কোন বৈধতাই না থাকে! মুসলমানরাই কেন গ্রহণ করবে অন্যায় ভিক্ষা! হায়দারাবাদের প্রখ্যাত মুসলিম নেতা আসাদুদ্দীন ওয়াইসি ঠিকই বলেছেন, ঐটুকু জমি মুসলমানরাই যোগাড় করে নিতে পারে। এখনো মুসলমানদের এত দুরবস্থা হয়নি যে, হিন্দুদের কাছে হাত পাততে হবে মসজিদের জায়গার জন্য।

বিচারের জন্য বিচারকদের যে বেঞ্চ, একজন ছাড়া সবক’জনই হিন্দু, একজন রাখা হয়েছে মুসলিম! প্রশ্ন হতে পারে মাত্র একজন কেন? সমান সংখ্যা নয় কেন? কিন্তু আমরা এ প্রশ্ন উত্থাপন করছি না।

রায়ে বলা হয়েছে, ‘বাবরি মসজিদ কোন ফাঁকা জায়গায় তৈরী হয়নি।...

মুসলমানরা কবে দাবী করেছে যে, মসজিদ ফাঁকা জায়গায় তৈরী হয়েছে। মুসলিমপক্ষ (সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড) তো যথাযথ প্রমাণ দাখিল করেছে, ভূমির মালিকানার। এখন আদালত যদি বলে, মুসলিমপক্ষ প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি তাহলে কী করার আছে! শুধু প্রশ্ন করা যায়, হিন্দুপক্ষ কি প্রমাণ করতে পেরেছে, এটা হলো রামের জন্মভূমি? এখানে মন্দির ছিলো? হিন্দুদেরই বিবেকবান পুরোহিত বলছেন, অন্তত পঞ্চাশটা জায়গা সম্পর্কে হিন্দুদের দাবী হলো, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরই হলো রামের প্রকৃত জন্মভূমি। কিন্তু কারো পক্ষেই কোন প্রমাণ নেই।’

স্বয়ং আদালত স্বীকার করেছেন, ‘পুরাতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে দেখা গিয়েছে মসজিদের নীচে আরো প্রাচীন একটি কাঠামো ছিলো, তবে তা যে কোন মন্দিরেরই কাঠামো তা প্রমাণিত নয়।...’

তাহলে কিসের ভিত্তিতে রায় হলো? মসজিদ তো কয়েক শবছরের একটি বাস্তবতা ছিলো, যা সরকারের রহস্যজনক নীরবতার সুযোগে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। মুসলিম আইনজীবীগণ সঙ্গত প্রশ্নই তুলেছেন, যদি মসজিদটি বিদ্যমান থাকতো, যদি স্থানটি খালি করা না হতো তাহলে কি এ রায় দেয়ার সুযোগ ছিলো? বাস্তব অবস্থাকে অস্বীকার করে দুর্বলতম ধারণার ভিত্তিতে, যার পক্ষে কোন প্রমান নেই বলে স্বীকার করা হচ্ছে, এত সংবেদনশীল বিষয়ে রায় কীভাবে দেয়া হলো? প্রশ্ন আছে, জবাব নেই? কাশ্মীর সম্পর্কেও হাজারো প্রশ্ন আছে, গায়ের জোর ছাড়া কোন জবাব নেই।

আদালতের কী চমৎকার যুক্তি, ‘সেই কাঠামোটি যদি হিন্দু স্থাপনাও হয়ে থাকে তাহলেও আজকের দিনে এসে এর ভিত্তিতে ঐ জমিকে হিন্দু জমি বলে ধরে নেয়া যায় না।’

আদলতের এটা অবশ্যই অত্যন্ত ন্যায্য কথা। তারপরের বক্তব্য হলো, ‘তবে ওই স্থানকে যে, হিন্দুরা রামের জন্মস্থান হিসাবে বিশস করেন তা নিয়ে কোন সংশয় নেই।’

‘বিশস করেন’ এটা নিয়ে সংশয় নেই। কিন্তু বিশসের পক্ষে যুক্তি? প্রমাণ? তাহলে কি বিশসই যথেষ্ট বিচারের জন্য?

আদালত নিজেই বলেছেন, ‘যেহেতু বিশসের উপর দাঁড়িয়ে জমির মালিকানা নির্ধারণ করা সম্ভব নয় সেহেতু আইনের মাধ্যমেই জমির মালিকানা ঠিক করতে হবে।...’

বেশ! আইন এখন কী বলে? যেহেতু ‘খালি ও পতিত জমি’ সেহেতু ‘আপাতত’ কেন্দ্রীয় সরকার ঐ জমির মালিকানা পাবে।...’

প্রশ্ন উঠতে পারে, আইনের ভিত্তিতে পাওয়া মালিকানা ‘আপাতত’ হতে যাবে কেন? প্রশ্ন আছে. উত্তর নেই! তাছাড়া জমিটা খালি ছিলো, নাকি খালি করা হয়েছিলো? আর সেই খালি করাটা কি বৈধ ছিলো? একই কথা, প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই।

আদালতের আদেশ, ‘কেন্দ্রকে তিন মাসের মধ্যে বোর্ড অব ট্রাস্ট গঠন করে তাদের হাতে বিতর্কিত জমি তুলে দিতে হবে। ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে বিতর্কিত জমিতে মন্দির নির্মাণ করা হবে।...’

অর্থাৎ নতুন পক্ষ সৃষ্টি করা হলো জমির মালিকানা হস্তান্তর করার জন্য! প্রশ্ন হতে পারে, সরকার যদি মালিকানা হস্তান্তর করেই তাহলে তো বাবরি মসলিজদ -কর্তৃপক্ষের কাছেই হস্তান্তর করতে হবে! শত শত বছর ধরে মসজিদটি বিদ্যমান ছিলো এবং শত শত বছর ধরে সেখানে নামায-ইবাদত হয়েছে। হিন্দুরা রাম জন্মভূমি বলে বিশস করেন, তাতে যেমন সন্দেহ নেই, তেমনি মসজিদের বাস্তবতা সম্পর্কেও তো সন্দেহ নেই, আর বিশসের ভিত্তিতে তো ফায়ছালা করা যায় না! প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই।

হায়রে আদালত! হায়রে বিচার! হায়রে বিচারক! আদালত নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছে, ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা বেআইনি ছিলো। তবে বিতর্কিত জমির উপরে রামলাল (মামলার একপক্ষ)-এর অধিকার স্বীকার করে নেয়াটা আইন শৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পৃক্ত।...

অর্থাৎ মুসলমানদের হাতে যদি আইনশৃঙ্খলাপরিস্থিতি সৃষ্টি করার মত শক্তি থাকতো? রায় তাহলে একটি পক্ষের শক্তিকে বিবেচনায় নিয়ে, যুক্তি ও প্রমাণকে বিবেচনায় নিয়ে নয়? দ্বিতীয় কথা হলো, একটি সম্প্রদায়কে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে আসলেই কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষিত হবে? হয়?

সুপ্রিম কোর্টে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী জাফর জিলানি সংবাদসম্মেলনে বলেছেন, ‘বাবরি মসজিদের জমির মালিকানার পক্ষে সবধরনের প্রমাণ সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করে নিয়েছেন। মসজিদটি অযোধ্যায় ১৫২৮ সালে নির্মিত হওয়ার পর থেকে ১৯৪৯ সালের ২২/২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় চারশ বছর  সেখানে নিয়মিত নামায হয়েছে। আদলাত এ সত্য স্বীকারও করেছেন, তারপরো রায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি।

জনাব জিলানী আরো বলেন, ‘আমরা অসন্তুষ্ট; এটা ন্যায় বিচার হতে পারে না। আমরা আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি; শুধু একটুকরো জমি, বা একটা মসজিদের জন্যই না। আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে যাচ্ছি। আমরা যদি আত্মসমর্পণ করি, তাহলে দেশের কোন মসজিদই নিরাপদ থাকবে না। কোন সংখ্যালঘুই আর নিরাপদ বোধ করবে না।’



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ