MD ABU NASER MAJNU
প্রকাশ ২৪/০১/২০২১ ০৮:১৩পি এম

মহম্মদপুরের প্রতাপশালী রাজা সীতারাম রায়

মহম্মদপুরের প্রতাপশালী রাজা সীতারাম রায় Ad Banner

এক কালে মাগুরার মহম্মদপুরে এক শক্তিশালী রাজা ছিল। সেই রাজার কঠোর শাস্তির ভয়ে এই রাজ্যে কোন চুরি-ডাকাতি ছিল না। শোনা যায়, তার ভয়ে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল পান করতো। সীতারামের হাতিশালে হাতি ছিল। ঘোড়াশালে ঘোড়া ছিল।

এসব কিংবদন্তির ইতিহাস শুনতে শুনতে বাংলার শিশুরা মায়ের কোলে ঘুমিয়ে যেত। 

কে এই সীতারাম?  সীতারাম ছিলেন ভূষণা পরগনার ফৌজদারের অধীন একজন তহশিলদার উদয়নারায়ন রায়ের পুত্র। ভূষণা বলতে বর্তমান ফরিদপুর জেলাসহ  বর্তমান যশোরের উত্তর-পূর্বের নলদি পরগনা, সাতোর ও মুকিমপুর পরগনা এর অন্তর্ভূক্ত ছিলো।

উদয়নারায়ন ছিলেন মুর্শিদাবাদের উত্তর রাঢ়ীয় কায়স্থ। শায়েস্তা খানের আমলে ১৬৬৪ সালে উদয়নারায়ন তহশিলদার পদে উন্নীত হন এবং তাকে ঢাকার নিকটবর্তী ভূষনায় বদলী করা হয়। যদিও ভূষণা ছিল নাটোর রাজার অধিকৃত অঞ্চলের একটি অংশ, তবুও এটিকে একটি স্বতন্ত্র জমিদারি হিসেবে সবসময় গণ্য করা হতো। কয়েক বছর পর তিনি মধুমতি নদীর পূর্ব তীরে হরিহরনগরে তার বাসস্থান নির্মাণ করেন এবং পরিবার সেখানে স্থানান্তরিত করেন। ।

১৬৫৮ সালে সীতারাম কাটোয়ার অন্তর্গত মহিপতি গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার রাজ-চাকরির সুবাদে সীতারামের শৈশব কাটে ঢাকায়।  ঢাকায় অবস্থানকালে সীতারাম আরবী, উর্দু  ও  ফার্সি ভাষা শিক্ষা করেন। পরবর্তীতে তিনি সেনাদলে ভর্তি  হন  এবং রণকৌশল আয়ত্ব করেন।   

পাঠান রাজত্বের পর বিখ্যাত মোঘল রাজবংশ এ উপমহাদেশের বিশাল অঞ্চল জুড়ে তাদের স্মরণীয় শাসনকালের সূচনা করে। এ সময় সুবিখ্যাত মোঘল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) প্রথম এ অঞ্চলে ফৌজদার নিযুক্ত করে শাসন কার্য পরিচালনা করতেন। বার ভূঁইয়াদের অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্য এ সময় এ জেলা শাসন করতেন। যশোরের প্রথম ফৌজদার ছিলেন ইনায়েত খাঁ। এরপর  সরফরাজ খাঁ, নুরুল্লা খাঁ পর্যায়ক্রমে যশোর এর ফৌজদার নিযুক্ত হয়ে আসে।     

সীতারামের রণকৌশলের কারণে বাংলার সুবাদার আনুমানিক ১৬৮৩ সালে স্থানীয় আফগান বিদ্রোহী,  বর্গী বা মগ ও ফিরিঙ্গী দস্যুদিগকে দমন, নিয়মিত খাজনা প্রদানের অঙ্গীকারে নলদী পরগনার ( বর্তমান নড়াইল) জায়গীর দান করেন। সুশাসনের জন্য পরবর্তীতে তিনি আরও কয়েকটি পরগনার জমিদারী লাভ করেন। এসময় সীতারাম নিজস্ব লোকদের নিয়ে সেনাবাহিনী গঠন করেন। মেনাহাতি, রূপচাঁদ ঢালী, বখতিয়ার খান, মৃতরা সিংহ, গোবর দলন প্রমুখ তার বিখ্যাত সেনাপতি ছিল।

রাজ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি যথাশক্তি নিয়োগ করেন। ১৬৮৪ সালে সীতারামের পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের শ্রাদ্ধ কার্য শেষ করে  তিনি কয়েকজন সহযোগী নিয়ে ধর্ম কাজে গয়া গমন করেন। গয়ায়  ধর্ম-কর্ম সমাপনান্তে  সীতারাম দিল্লীতে মোঘল সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হন।

সম্রাট আওরঙ্গজেব তখন মোঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি। সম্রাটের নিকট সীতারাম ভূষণাকে মোঘল সাম্রাজ্যের অধীন ‘সামন্ত রাজ্যের’ দাবী জানান। ১৬৮৮ সালে সীতারামের দাবী মেনে নিয়ে তাকে ‘রাজা’ উপাধি দেয়া হয় এবং বাংলার নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর অনুমতি ও সনদ বলে দক্ষিন বাংলার সুন্দরবন পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত করেন।  উত্তরে পাবনা থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন এবং পশ্চিমে নদীয়া থেকে পূর্বে বরিশাল পর্যন্ত সীতারামের রাজ্যভুক্ত ছিল। 

তিন দিকে বিল-বাওড় এবং পূর্বদিকে মধুমতি নদী বেষ্টিত মহম্মদপুরে সীতারাম তার রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন। রাজ্যের ভিতরে সীতারাম  চারকোনাকার  দুর্গ নির্মাণ করেন। দুর্গকে সুরক্ষিত করতে তার চারপাশে পরিখাও খনন করেন। অসংখ্য দিঘী, জলাশয়, ভবন, মন্দির প্রভৃতি স্থাপন করে মহম্মদপুরকে সীতারাম উন্নত সুযোগসুবিধা সম্পন্ন ব্যবসায়িক নগরীতে পরিণত করেন। তিনি তার সেনাবাহিনীতে কামান সংযুক্ত করেন এবং ‘কালে খাঁ’ ও ‘ঝুমঝুম খাঁ’ নামে দুটি কামান স্থাপন করেন। ক্রমে ক্রমে রাজা সীতারাম রায় পরাক্রমশালী হয়ে ওঠেন। তার মধ্যে স্বাধীন চেতনার ভাব জাগ্রত হয়। মোঘল শাসনের অধীনে সামন্ত রাজা হয়েও তিনি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।

তিনি মোঘল সম্রাটকে খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং স্বল্পকালস্থায়ী সার্বভৌম হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।    রাজা সীতারামের এই ঔদ্ধত্ত্ব দমনের জন্য তৎকালীন বাংলার সুবাদার আজিম-উশ-শাহ, মীর আবু তোরাবকে ভূষণার জমিদার করে পাঠান।

আবু তোরাবের প্রাথমিক কাজ ছিল সীতারামকে বশে আনা। সীতারাম এই শাস্তিকে মেনে নিতে না পেরে কৌশলের আশ্রয় নেন। ইতিমধ্যে ১৭১৩ সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ পুনশ্চঃ বাংলার নবাব হন। মীর আবু তোরাব মুর্শিদ কুলি খাঁর সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হন।

অগত্যা  মীর আবু তোরাব তার সেনাধক্ষ্য পাঠান সেনা পীর খানকে প্রেরণ করেন সীতারামকে কব্জা করতে। মধুমতির তীরে মেনাহাতির নেতৃত্বে তার কৌশলী গেরিলা বাহিনীর হাতে মীর আবু তোরাব পীর খান সহ নিহত হন।  এখবর মুর্শিদাবাদে পৌঁছবামাত্র  মুর্শিদ কুলি খাঁ তাঁর শ্যালক বক্স-আলী খাঁকে  ভূষণার ফৌজদার নিয়োগ করে পাঠান এবং  অধিনস্ত সব জমিদারদের নির্দেশ দেন বক্স-আলী খাঁকে সাহায্য করতে।

প্রাদেশীয় সেনাবাহিনীর প্রধান সংগ্রাম সিংহ, নাটোর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দয়ারাম রায় তাদের সৈন্য সামন্ত নিয়ে বক্স-আলী খাঁর সাহায্য এগিয়ে আসেন এবং চারিদিক থেকে সীতারামের রাজ্যকে ঘিরে ফেলেন। যুদ্ধে সীতারাম পরাজয় বরণ করেন। সৈন্য সামন্ত সহ রাজা সীতারাম বন্দী হন।

মেহাতিকে হত্যা করে তার মাথা কেটে মুর্শিদাবাদে প্রেরণ করা হয়। দেশাদ্রোহিতার অপরাধে ১৭১৪ সালে বিচারে রাজা সীতারামের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তার আত্মীয়-স্বজনদের দেয়া হয় আমৃত্যু কারাবাস।   এখন নেই রাজা সীতারাম রায়। নেই তার হাতি-ঘোড়া-সেনাপতি। নেই সেই ক্ষমতাও। কিন্তু সে ছিল। কালের অমর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সীতারামের ভগ্ন প্রাসাদ আজও সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ