Manir Ahmed Azad
প্রকাশ ২১/০১/২০২১ ১১:৩৯এ এম

মানুষ ফেরেস্তাও নয় শয়তানও নয়

মানুষ ফেরেস্তাও নয় শয়তানও নয় Ad Banner

বিয়ের পর থেকে অধরা বলে আসছিল তার বরটি রোগা। পছন্দ ও অপছন্দের বিষয় জড়িত ছিল। দেখতে দেখতে বছরান্তে কোল জুড়ে আসল সন্তান। এভাবে তিন বছরের মধ্যে আর এক বাচ্চার জন্ম। তারপরও মনের অপ্রাপ্তি ও প্রত্যাশা কিছুতেই মিটছিল না। বড্ড অপছন্দ ছিল স্বামীকে। সর্বদা বিশ্বস্মার্ট ভাবা নারীর কি অপছন্দের স্বামী নিয়ে জীবন চলে? শুরু হয় মিথ্যের মেলা। সোনার টুকরো মেয়ের কথায় পরিবারের সবার মন বিগড়ে যায়। 

বিয়ের পর থেকে পাহাড় সম বোঝা যেন অপ্রশস্থ কাঁধে চড়ে বসে পরিবারে। তার ওপরে রয়েছে সঙ্গে থাকা বাচ্চার বাড়তি বোঝা। কিছুতে দুঃখের যন্ত্রনা ভুলতে পারছে না। এ টেনশনে কত নির্ঘুম রজনী পার হয়েছে হিসেবে ছাড়া। 

বর রোগা বলে বাচ্চা-বউ পরিপালন করতে পারেনা এমন মিথ্যেচার ছিল এলাকা জুড়ে। ইনিয়ে বিনিয়ে মেয়ের কথা শুনে বাবা-মা ছিল চিন্তাযুক্ত।   

ছদ্মবেশি ভন্ড পীরের কন্যারা বেশ্যাবিত্তি করলেও জেনা হয়না এ সমাজে। আর গরীবের ছেলে বটতলায় দাঁড়িয়ে নারী দেখলেও অপরাধ। যত দোষ গরীবের ছেলের। অধরার বাবা ছিলো একজন ভন্ড সাধুর মুরব্বী। ভক্ত অনুরাগীদের  মাঝে  তার অনেক কদর। এক সময় ওই সাধু বাবার আঙ্গুলের ইশারায় অনেক অপকর্ম চলতো এই জনপদে। কেউ জনপ্রতিনিধির কাছে প্রতিকার চেয়ে বিচার প্রার্থী হলে তার ক্ষমতার দাপটে রাতারাতি বদলে যেতো বিচার প্রক্রিয়া। দুর্বলের কথা শুনতো না বিচারক। যারা সৎ লোকের শাসন চায়, তারাই ন্যায় বিচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। করে ক্ষমতার অপব্যবহার। 

বরের পরিবারের বিরুদ্ধে অধরার বাবা মেয়েকে ঠকানোর নালিশ নিয়ে হাজির হল এলাকার বড় মুরব্বীর কাছে। মুরুব্বী তার কথা আমলে নিল। ধর্মীয় উর্দি পরা লোকগুলো প্রকাশ্যে কিছু করে না। যা করে গোপনে করে। আর আল্লাহ যে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কিছু দেখেন কিন্তু তারা তা  মনে রাখতে পারে না। কারণ তারা তো আত্মপুজারী। শুধু দুনিয়ায় লাভের জন্য ধর্মকে তারা ব্যবহার করে। তাই অধরার স্বামী নামক মানুষটি ছিল অসহায়। সমাজে গরিবের কোন মূল্য নেই, শিক্ষিত হলেও সম্মান থাকে না। গরীবের জন্মটাই আজন্মই মহাপাপ। যেটুকু সংসারে প্রয়োজন সেইটুকুই ছিল। আরাম-আয়েশ করে লবঙ্গের চিতা থেকে সমদ্দুর পর্যন্ত বেড়ানোর সামর্থ্য হয়তো ছিল না। মাঝে মাঝে রাজ প্রসাদেও লবনের অভাব পড়ে। সেই সময় প্রতিবেশী থেকে এক বাটি লবন ধার নেয়া কি রাজার গরিবী অবস্থা বলা যাবে? সেই অবস্থাটা দৃশ্যমান করতে বরের  যে গাড়ি চালিয়ে জীবন জীবিকা চলে  সেই গাড়ি ভেঙে  তারা। এভাবে  অতিষ্ট করে তোলে বরের জীবন। এ ধরণের দুরাচারীরা প্রয়োজনে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে ক্ষতিও করতে পারে। এক সময়  প্রচার প্রচারণায় এলাকা জুড়ে বর  অসুস্থ ও মানসিক রোগী হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। এ অজুহাতে ঘর ভাঙলো। মানুষের সহ্যেরও সীমা আছে। সবুরে মাওয়া ফলে। কয়েক বছরের ব্যবধানে যে চলে গেল সেই অধরা এখন দেহ ফেরী করে। আসলে জগৎ সংসারে কেউ  দোষমুক্ত নেই। তবে প্রত্যেক মানুষ নিজের দোষ নিজে দেখতে পায় না। 

সুতরাং অন্যকে উপদেশ দিবার মত কর্তব্য ও অধিকার কারুরই নেই । আজকের সমাজে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে নির্দোষ ব্যক্তির কষ্ট দৃষ্টিগোচরই হয় না । কেহ সুদখোর তো কেহ ঘুষখোর । কেহ নারী ভোগকারী তো কেহ অত্যাচারী । কেহ পকেটমার, আবার কেহ লুঠেরা । আবার কেউ সুস্থও নয়। কেউ না কেউ অন্তত এ্যাসিডিটিতে ভোগে আর কেউ প্রেসারে ভোগে। এ যেন সবার কমন রোগ। এককথায় মানুষের মেলায় নির্মল চরিত্রের মানুষ মেলা দায় । তাহলে কে কাকে হিতোপদেশ দেবে ? ভাববার বিষয়। মানুষ চিরকালই মানুষ । মানুষ মানেই দোষ এবং গুণের সমন্বয় । মানুষ মানে অসুস্থ। কেউ শারীরিকভাবে সুস্থ নয়। মানুষের চরিত্র কোনদিন শুধু গুণ আর গুণে গুনান্বিত ছিল না । আবার এমন ও কোনদিন আসবে না বা ছিল না যে, মানুষ শুধুমাত্র দোষের আকর । প্রতিটি মানুষের মাঝে কিছু আছে দোষ, যা তাকে করে লাঞ্ছিত ও অধঃপাদিত । আবার তারই মাঝে আছে কিছু গুণ যা তাকে দেয় স্বস্তি ও আনন্দ । শুধুই গুনের দ্বারা মানুষের চরিত্র গঠিত হলে মানুষ তো আর মানুষ থাকত না, সে হত ফেরেস্তা। পক্ষান্তরে শুধুই দোষ থাকলে হ'ত অভিশপ্ত শয়তান। আদতে মানুষ ফেরেস্তাও নয় শয়তানও নয়, মানুষ মানুষই । মানুষের মাঝে দোষ ও গুণ উভয়ই থাকবে প্রভেদ শুধু কম বেশির । পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে কারো মাঝে দোষ বেশী গুণ কম, আবার কারো মাঝে গুণ বেশী দোষ কম। কারো মাঝে সমান সমান । যে সমস্ত ব্যক্তির মাঝে গুণের সমাহার বেশী আমরা তাদেরকে সৎ ব্যক্তি বলেই চিহ্নিত করে থাকি, পক্ষান্তরে যার মাঝে দোষ বেশী তাদেরকে অসৎ ব্যক্তি রূপেই পরিগণিত করি।  হ্যাঁ, তবে নিজের মাঝে মূল্যায়ণ ক্ষমতার অভাবহেতু কখন ভালকে মন্দ এবং মন্দকে ভাল বলে, ভুলও করি ।

পরিসংখ্যানে দোষ-গুণের সমাহার যাই হোক না কেন, সবার মাঝে একই ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না । ফলতঃ যার মধ্যে যে দোষ নাই সে অন্যকে নিজের মাঝে ভিন্নধর্মী দোষ থাকা সত্বে ও হিতোপদেশ দিয়া থাকে। কখনও কখনও একই দোষ অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ার কারনে, সে বিষয়ে ও কেহ কেহ হিতোপদেশ দিয়ে থাকে । এর যে একটা যুক্তিগ্রাহ্য কারন আছে তা বলাই বাহুল্য । উল্লেখ্য যে,ব্যক্তিমাত্রেই স্বার্থ নামক দোষ বা গুণের কবলিত । তাই নিজ স্বার্থেই মানুষ একে অপরকে হিতোপদেশ দেয় । যেমন মদখোর মদের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকলেও নিজে চায়না যে গাড়ির ড্রাইভার মদ খেয়ে তার গাড়ি চালাক । নিজে ঘুষখোর হলে কি হবে, অন্যে যেন দুধে জল না মিশ্রিত করে, কারণ দুধ কিনতে গিয়ে তাকেই সে দুধ কিনতে হতে পারে । এতো গেল একটা দিক। অন্য পক্ষে নিজেকে এবং অন্যকে হিতোপদেশ না দেওয়া হল পুরোপুরি শয়তানের ধোঁকা।

শয়তান চায় না যে, এই ধুলির ধরায় মানুষেরা সুখে শান্তিতে বসবাস করুক। বরং চরিত্রে এবং পরিবেশে ধুলাবালি আর নোংরায় ধুসরিত হয়ে থাকুক। কেহ কাউকে যেন ভালকথা না বলে । পাছে ভাল কথার প্রভাবে কোন বদ সৎ হয়ে গেলেই তো বিপদ। তাই এত যুক্তির বিস্তার। আদতে ভালর বিপক্ষে যত যুক্তি আমরা দেখি সবই শয়তান বা মানবরুপী শয়তানের কুযুক্তি কিংবা প্রবঞ্চনা। নীতিবোধ, ন্যায় এবং সমাজ ও সময়ের দাবী। আমার কর্তব্য। আমার প্রতি দায়িত্ব। অন্যে যদি আমার হিতোপদেশের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে বা সে মতে কার্য করতে অক্ষম হয় সে বিফলতা আমার নয় বরং তারই যে হিতোপদেশ মত কাজ করতে পারল না।    



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ