Saturday -
  • 0
  • 0
জাহাঙ্গীর আলম কবীর
Posted at 13/01/2021 01:21:pm

মৎস্য শিকার নির্ভর শিল্পে জীবিকা নির্বাহ করছে শত শত মানুষ

মৎস্য শিকার নির্ভর শিল্পে জীবিকা নির্বাহ করছে শত শত মানুষ

সৌখিন মৎস্য শিকারীদের কল্যাণে সাতক্ষীরা শহরে গড়ে উঠেছে মৎস্য শিকার নির্ভর শিল্প ও প্রতিষ্ঠান। বড়শি তৈরী, বড়শি টেম্পার বা পাইন, বড়শি বাঁধা, মশলা প্রস্তুত ও এর কাঁচা মাল কেনা বেচা এই শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে কয়েক শ’ মানুষ জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করছেন। গড়ে উঠেছে শহরের প্রাণ কেন্দ্রে মৎস্য শিকার সরঞ্জাম বিক্রির ছয়টি দোকান। এছাড়াও শহরের বাইরে বিভিন্ন হাট বাজারে ছোটখাটো দোকান।

শহরের কালিগঞ্জ সড়কে মেসার্স সুন্দরবন ফিস হুক, ইমন ফিস হুক, মুক্তিযোদ্ধা সড়কে সাতক্ষীরা ফিস হুক ও সাতক্ষীরা ফিসিং হাউস এই চারটি দোকানকে ঘিরে চলছে বিরাট কর্মযজ্ঞ। দোকানগুলো সম্পূর্ণ মৎস্য শিকার সামগ্রী বিক্রি নির্ভর। এখানে বিক্রি হয় মৎস্য শিকারের জন্য সকল প্রকার মালামাল। সাতক্ষীরা ফিস হুকের মালিক শফিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দোকানগুলোতে অত্যাধুনিক হুইল, ছিপ, মশলা সামগ্রী, পিঁপড়ার টোপ বা ডিম, বড়শি, ঝুপি বড়শিসহ বিভিন্ন মালামাল পাওয়া যায়। কেনা বেচাও ভাল।’

এসব দোকানে স্থানীয়ভাবে তৈরী বড়শি, বাঁধা বড়শি, মশলা তৈরীর জন্য মিষ্টির গাদ, ঘি, ঘিয়ের ছ্যাকা, ভুট্রার গুড়া বা ছাতু, নাবিস্কো বিস্কুট, সরিষার খৈল, নারিকেলের খৈল, নারিকেলের তেল, মধু, গুড়া মশলা, জায়ফল, জৈত্রী, জটাফল, এলাচ, দারুচিনি, একাঙ্গী প্রভৃতি বিক্রি হয়। সারা বছরই এ ব্যবসা চলে। তবে জমজমাট ব্যবসা চলে বছরের সাত মাস। অর্থাৎ এপ্রিল মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত।

এসব দোকানে স্থানীয়ভাবে তৈরী বড়শি সরবরাহ করে প্রায় ২০ জন ব্যক্তি। তারা বাড়িতে স্টীলের তার দিয়ে বড়শি বানায়। বড়শি তৈরী করতে পুরাতন সাতক্ষীরা, পলাশপোল ও কাটিয়া লস্করপাড়ায় গড়ে উঠেছে কুটির শিল্প। এই শিল্প গড়ে তুলেছে পুরাতন সাতক্ষীরার আব্দুল আলিম, আব্দুল মোমিন, সাগর হোসেন, আকবর আলী, পলাশপোলের আব্দুস সামাদ, আব্দুল অহিদ, বাদল এবং লস্করপাড়ার কাজল। এরা আকার অনুযায়ী দৈনিক ৫০ থেকে ২০০টা বড়শি বানাতে পারে। ১০০টি কাঁচা বড়শি দোকানে বিক্রি করে আয় করতে পারে ৫শ’ থেকে ৭শ’ টাকা পর্যন্ত। দোকানদার এই কাঁচা বড়শি কিনে টেম্পার বা পাইন দিয়ে নেয় অন্যের কাছ থেকে। পাইন দিতে ১০০ বড়শিতে লাগে ১শ’ থেকে ১শ’ ৩০ টাকা।

পাইন দেয়া বড়শি দিয়ে আবার সেট তৈরী করা হয়। এই সেট তৈরী করার জন্য আবার আলাদা লোক আছে। সেট তৈরী করে হাতে গোনা কয়েক জন ব্যক্তি। থানাঘাটার নূরুজ্জামান, দোহাকুলার লাল মিয়া, ইটাগাছার রাসেল ও মধুমল্লারডাঙ্গীর সাংবাদিক আব্দুল মান্নান সবুজ সহ ৬ থেকে ৭ জন। আব্দুল মান্নান সবুজ বলেন, ‘আমরা বড়শি বাঁধা সূতা, সুপার গ্লু ও সুইবল দিয়ে বড়শি বাঁধি। সেট বিক্রি হয় ১৫ থেকে ১শ’ ৫০ টাকা পর্যন্ত।

দোকানগুলোতে মাছ ধরার জন্য পিঁপড়ার টোপ বিক্রি করা হয়। এই টোপ সরবরাহ করে বিভিন্ন গ্রামের দু’শতাধিক ব্যক্তি। তারা বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে আম, কাঁঠাল, জামরুল, দেবদারু, মেহগনি, লিচু, লেবু, মেটে আলুসহ মোটা পাতাওয়ালা গাছ থেকে টোপ সংগ্রহ করে। তবে শীতকালে টোপ কম পাওয়া যায়।

এই টোপ বিক্রি করে সংসার চালায় সুলতানপুরের সেলিম হোসেন, সুলতানপুর সরদারপাড়ার অজেদ আলী, দোহাকুলার নূর ইসলাম, মেহের আলী, জেহের আলী, আতিয়ার রহমান, নছি, আব্দুল হামিদ, আব্দুস ছাত্তার, আছিরউদ্দিন, পারুলিয়ার আলহাজ ও কালিগঞ্জের সোবহান সহ অসংখ্য ব্যক্তি। প্রতিদিন মেসার্স সুন্দরবন ফিস হুক, ইমন ফিস হুক, সাতক্ষীরা ফিস হুক ও সাতক্ষীরা ফিসিং হাউস এই চারটি দোকনে ২ থেকে আড়াই মণ টোপ বিক্রির জন্য আনা হয়। মওসুম অনুযায়ী দোকানদাররা প্রতি কেজি টোপ ৮শ’ থেকে দেড় হাজার টাকায় কিনে থাকে। তবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার ৩ থেকে ৪ মণ পিঁপড়ার টোপ দোকানগুলোতে জমা হয়। এই টোপ প্রতি শুক্রবার মাছ শিকারের জন্য স্থানীয় শিকারীদের চাহিদা মেটানোর পর সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সবচেয়ে বেশী টোপ যায় ঢাকা ও বরিশালে। টোপ ঢকায় নিয়ে যাবার জন্য ব্যবহার করা হয় ঢাকার জন্য সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস এবং বরিশালের জন্য চাকলাদার পরিবহন। প্রতি কেজি টোপ পাঠাতে খরচ হয় ১৫ টাকা।

দোকানদাররা ভ্যান পাঠিয়ে মিষ্টির গাদ সংগ্রহ করে আনেন মিষ্টির দোকানগুলো থেকে। প্রতি কেজি গাদ কেনেন ২০ থেকে ৩০ টাকায়।

একইভাবে ঘিয়ের ছ্যাকা কিনে আনেন প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৯০ টাকায়। যারা ঘি তৈরী করেন তাদের কাছ থেকে এই ছ্যাকা সংগ্রহ করেন।

আবার কখনো কখনো ঘোষেরাও দোকানে দিয়ে যায়। এ দুটো ব্যবহার হয় মাছের চার তৈরীর মশলার কাজে। এভাবেই চলছে মৎস্য শিকার নির্ভর শিল্পের নীরব বিপ্লব।   


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ