• 0
  • 0
রায়হান আহম্মেদ
Posted at 12/01/2021 10:15:pm

বাংলা সাহিত্যের ফেরিওয়ালা

বাংলা সাহিত্যের ফেরিওয়ালা

মগ্ন মধ্যাহ্ন-২২

বুলবুল,

আলমগীর রেজা চৌধুরী

০১

দূর মফস্বলের সদ্য যৌবনে পা দেওয়া যুবকের রাজধানী ঢাকা শহরে আগমণ ঘটে ১৯৬৪ আগস্ট মাসে। বিশাল এ ঢাকা শহর তখন মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত নিয়েও অনেক বেশি সবুজাভ। রাস্তাগুলো অপ্রশস্থ। তারপরও মফস্বলের রাস্তার চেয়ে বেশ বড়। পথঘাট, মানুষজন অচেনা। তাছাড়া যার চলনে-বলনে গ্রাম্য ঘামে ভরা তারতো সবকিছু বিস্ময়। ফ্লোরোসেন্ট আলোর আদিখ্যেতা না থাকলেও নিমগ্ন প্রেমিকের টুকরো টুকরো স্বপ্নের ঊর্ণাজাল ছিল । যা বুননের জন্য নকশিকাঁথা মাঠের প্রয়োজন হয়। সেই মাঠ, পথ, মত আবিষ্কার করতে গিয়ে শাহাদাত হোসেন বুলবুল নামের একজন দুঃখবিলাস কবির সঙ্গে পরিচয় হয়। ওই কবির নামের কবিতা তখন শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যের পাতা দখল করে প্রতিশ্রুতিশীল অভিধায় চিহ্নিত। ঢাকা শহরের মতো সে কবিও যুবকের বিষণ্ন কাতরতা। ভালোবাসা।

সম্ভবত ‘আজাদ’-এর পাতায় বুলবুলের একটি কবিতা পড়েই তাকে আত্মার আত্মীয় মেনে নিয়েছিলাম।

প্রয়াত সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ, শাহাদাত বুলবুল তখন কলাবাগান বসির উদ্দিন রোডের বাসিন্দা। নগরের আগন্তুক হিসেবেই তাঁদের ডেরায় আশ্রয়। ফরহাদ খাঁ তখন সুলেখক ইব্রাহীম খাঁর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শাহাদাত বুলবুল কোনও এক দৈনিকের প্রুফরিডিংয়ে চাকরিরত। শেষ ষাটের কবি শাহাদাত বুলবুল। যার অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মতো দ্রোহী অবস্থান। আর তাঁর কারণে শাহাদাত বুলবুলের কবিতা হয়ে উঠেছিলো অভিজ্ঞতাজারিত কালিক উচ্চারণ। নির্মাণ করেছিলেন অন্যরকম এক কাব্যভাষা। যা তাকে সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হতো। আর আমি তাঁর কাব্য সরলতার প্রেমে পড়েছিলাম।

বুলবুল ভাই থেকে পরবর্তীতে আমাদের সম্পর্ক তুই-এর মধ্যে চলে আসে। তারপর কলাবাগান, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, আলেয়া চৌধুরী, আকলিমা বউ হিসেবে ঘরে আসার পর আমাদের জীবনযাপনের বিচ্ছেদ ঘটলেও সম্পর্কের নোঙর আমূল প্রথিত ছিল ভালোবাসায়। যা আমৃত্যু অটুট।

০২

আশাকে পিটার সেন্ডার বারবনিতার মতো দেখছে। তাঁর পিছনে ঘুরতে চায় নি কবি। তারপর তাঁর মনে হয়েছে, এক সময় আশাও তাঁকে ত্যাগ করেছে।

ল্যু স্যুন লিখেছেন,. নিরাশা, আশার মতোন, এটাও দেমাক।

কবি শাহাদাত বুলবুল লিখেছে, আশা চিঠি দিও। কবি তাঁর বোধের কুলুঙ্গিতে ধারণ করেছে যে আশার পৃথিবী, তা অপূর্ণতায় পরিপূর্ণ। আর এই অপূর্ণতা নিয়েই শাহাদাত বুলবুল-এর কবিতা। লিখেছে আমৃত্যু। না! কোনও প্রাপ্তি চায় নি। শুন্যতাই ছিল তাঁর কাব্যিক ভুবন।

১৯৪৬ ফেব্রুয়ারি ১৯ তারিখ লক্ষ্মীপুরে জন্ম। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাশ। সাংবাদিকতা দিয়ে জীবন শুরু করলেও ১৯৭৫-এ বাকশাল প্রবর্তনের পর সংবাদকর্মী হিসেবে সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারী হিসেবে যোগদান। অবসর পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিল। ২০১১ মে ৩ তারিখ মৃত্যু। ৬৫ বছর আয়ুষ্কালে লিখেছে অজস্র কবিতা । প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : অন্য রকম নির্মাণ, দুই ভুবনের মানুষ, বিশ্বাস জানিয়ে দাও অনন্তকে। ছড়াগ্রন্থ :ডালে ডালে পাতায় পাতায়। পাণ্ডুলিপি রেখে গেছে দুটি :গালগল্পে দিন যায়, যুদ্ধ দিনের কবিতা।

কবি শাহাদাত বুলবুল ধ্যানস্থ ঋষির মতো শুধু কবিতা নিয়ে কাজ করেছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যে কবিতা কবিতা খেলায় কখনও প্রতিযোগী হয় নি। শুধু নিজ বিশ্বাস, সরল আশা-আকাক্সক্ষায় নিয়ে গেছে অনন্তের কাছে। সত্যিকার অর্থে এমন বিরলপ্রজ নিরহংকার মানুষের সঙ্গে যাপিত জীবন অত্যন্ত মোহময়, সুখকর।

শাহাদাত বুলবুল কবি। রক্ত মাংসে কবি। কবিতার বিচিত্র যে রূপ, তার অমিয়সুধা পান করতে করতে তাঁর অনন্ত বিদায়। কবিতার ব্যাকরণ জানতো। প্রতিনিয়ত নিজকে শাণিত করতে বই ছিল আরাধ্য। অসাম্প্রদায়িক। নিভৃতচারী। বন্ধুবৎসল। শত অর্থকষ্টের মধ্যে ওর অফিসে গিয়ে আপ্যায়িত হয় নি এমনজন খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তারপরও তাঁকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতায় ভিন্নতর ঋজু কাঠামোর উপর দাঁড়া করিয়ে দিয়েছে। বুলবুল, তোমাকে নমস্য সম্মান।

০৩

কবি শাহাদাত বুলবুল

বন্ধুবরেষু

বৈচিত্র’ সম্পাদক কবি শাহীন রেজা কাছ থেকে তোমার মৃত্যু সংবাদ শুনে আমি বিরক্ত হয়েছি। কবি কামার ফরিদ বলে উঠলো, ‘আহ!’ কবি সুজাউদ্দিন কায়সার বলল, এটা কী ঠিক হলো?’ কবি বদরুল হায়দার বলল, ‘না, এটা ঠিক না।’ কবি কামরুজ্জামান বলল, ‘রেজা ভাই আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।’ কবি সমর চক্রবর্তী বলল, ‘অনন্ত বেঁচে থাকে।’ কবি রাসেল আশেকী বলল, ‘বুলবুল ভাই, ভালো মানুষ ভালো কবি।’

এমন তো হবার কথা ছিল না। বহমান সময় যতই নিষ্ঠুর হোক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হওয়া উচিত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘ন্যায়-অন্যায় জানি না।’

কাব্যকীট বুকে সেই কবে ঢাকা শহরে এসেছিলে! তারপর কত এই ধুলো খেলাখেলি। অতপর তোমার অনন্ত বিদায়। খুব বেশি কী চাওয়ার ছিল তোমার? মনে হয় না। দীর্ঘ আটত্রিশ বছর তোমার সঙ্গে যাপিত জীবন। সব সময় সুখকর বলব না। তবে সত্যিকার অর্থে, আমি বোধ হয় তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। অথবা তুমি আমাকে।

আচ্ছা, তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? বয়স ব্যবধানে তুমি আমার দশ বছরের বড়। তারপরও আমরা অবলীলায় এ রকম ভাষা ব্যবহার করতে পেরেছি। অর্থাৎ ১৯৭৫ দিকে তুমি আমাকে একটি চিঠি লিখেছিলে, ‘আলমগীর, আদর নিও। তোর জন্য অনেকক্ষণ বসে থেকে চলে এলাম। মনটা ভীষণ খারাপ। আজ আমার দুঃখের দিনে কেউ পাশে নেইরে। বড় কষ্টে দিন যাচ্ছে। তোর ভাবীকে আনার জন্য ছুটি নিয়েছে অথচ হাতে পয়সা নেই। কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। হীরা, শুধু দুঃখের সাগরেই ভাসিয়ে গেল না। ভাসিয়ে গেল কলঙ্কের মহা সমুদ্রে। আমি সরল থাকতে চেয়েছি। ২৯.১.৭৫

বুলবুল

আমি দীর্ঘ সময় ধরে আলেয়া চৌধুরীর সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা বুঝতে পারি নি। আর বুঝতেও চাই নি। আমি শুধু অনুধাবন করেছি আকলিমা নামের হৃদয়বতী এক কালো সুন্দরী তোমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে গভীর মমতায়। এও কম কিসে? তোমার সঙ্গে আমার কোনও চাওয়া পাওয়া হিসেব ছিল না। অথবা অর্থনৈতিক। এ জীবনে যতটুকু পেরেছি, স্পর্শ করতে চেয়েছি।

তোমার সরলতার সুযোগ নিয়ে যাঁরা তোমার কাব্যধ্যান নষ্ট করে বাংলা কবিতার ক্ষতি করেছে, তাঁরা প্রকৃতির বিধানেই শিল্পের মহার্ঘ্য পাবে না। শুধু হাউ হাউ করবে।

তোমাকে মনে রাখবো। ভাইয়ের মমতা নিয়ে চৌধুরী ফেরদাউস যেভাবে বলল, ‘বুলবুল ভাই সব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে শুধু কবিতাকে ভালোবাসে।।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ