• 0
  • 0
Younus Ali
Posted at 08/01/2021 03:43:pm

ভ্যাক্সিন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভারত-ফ্রান্সের নাগরিক

ভ্যাক্সিন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভারত-ফ্রান্সের নাগরিক

অনেক সাধ্য-সাধনার পর করোনা প্রতিরোধক ভ্যাকসিন যখন বাজারজাত হতে চলেছে তখন নাগরিকদের মধ্যে নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়াও এখন ভারত পর্যন্ত এ দ্বন্দ্ব বিস্তৃত। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী একই অবস্থা তৈরি হয়েছে ফ্রান্সের নাগরিকদের মধ্যেও।  এএফপির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে টিকার পেছনে ছুটছে সবাই।  সে দৌড়ে বেশ এগিয়েও গেছে ভারত।

গণটিকাকরণ কর্মসূচি চালাতে তাদের হাতে আছে দুটি টিকা। কিন্তু সর্বশেষ এক জরিপের ফল বলছে, টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করতে রাজি নন বেশির ভাগ ভারতীয়। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬৯ শতাংশ বলেছেন, তারা এখনই টিকা নেবেন কি না এ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। অনলাইনভিত্তিক সমীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা লোকাল-সার্কেলস এ জরিপ চালায়। টিকা নিয়ে এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের খবর শুধু ভারতে নয়, অন্যান্য দেশের গণমাধ্যমেও আসছে। 

ভারতে লোকাল-সার্কেলস পরিচালিত জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন করা হয়- ‘ভারতে প্রথম কভিড-১৯ টিকা এখন অনুমোদন পেয়েছে।  এ টিকা গ্রহণের বিষয়ে আপনার মতামত কী?’ মোট ৮ হাজার ৭২৩ জনের কাছ থেকে উত্তর এসেছে। তার মধ্যে মাত্র ২৬ শতাংশ বলেছেন টিকা পাওয়ামাত্রই তারা গ্রহণ করবেন। করোনার টিকা নিয়ে সংস্থাটি জনসাধারণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আসছে গত বছরের অক্টোবর থেকে। এর মাধ্যমে তারা বোঝার চেষ্টা করছে টিকা গ্রহণে অনীহা বা দ্বিধাগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কমছে নাকি অপরিবর্তিত থাকছে।

অক্টোবরে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তখন কভিড-১৯ টিকা গ্রহণ নিয়ে দ্বিধায় থাকা ভারতীয়র সংখ্যা ছিল ৬১ শতাংশ। পরে ফাইজার ও মডার্না তাদের উদ্ভাবিত টিকার ব্যাপক কার্যকারিতার ফল প্রকাশ করলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। নভেম্বরে টিকা গ্রহণ নিয়ে দ্বিধায় থাকা ভারতীয়র সংখ্যা ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। সেরাম ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা তৈরির খবরে ভারতে নতুন আশার সঞ্চার করে। কিন্তু লোকাল-সার্কেলসের জরিপে দেখা যাচ্ছে, এ খবর টিকা নিয়ে ভারতীয়দের দ্বিধা আরও বাড়িয়েছে।

এখন করোনার টিকা নেবেন কি না তা নিয়ে দ্বিধায় ৬৯ শতাংশ ভারতীয়।  টিকা নিয়ে এ অনীহার পেছনে বিভিন্ন কারণ সামনে আসছে। বড় দুটো কারণ হচ্ছে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগে এর কার্যকারিতার ফল নিয়ে সংশয়। জনসাধারণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীরাও এ দুটো কারণকে বড় করে দেখছেন। গত ডিসেম্বরে আরও একটি স্বতন্ত্র জরিপ চালিয়েছেন লোকাল-সার্কেলসের সদস্য চিকিৎসক আবদুল গফুর। এতে দেখা গেছে, ভারতের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদেরও বড় অংশটি (৫৫ শতাংশ) এখনই করোনার টিকা নেওয়ার বিষয়ে দ্বিধায় আছেন। বেশির ভাগই বলেছেন তারা হয় এ টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন, নয় তো কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত নন।

জরিপে অংশ নেওয়া স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর আনুমানিক ৬০ শতাংশই কভিড-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত। টিকা গ্রহণে অনীহার ক্ষেত্রে আরেকটি কারণ হচ্ছে ভারতে করোনা সংক্রমণের হার কমে যাওয়া। এ ছাড়া টিকা দুটোর অনুমোদন নিয়ে তড়িঘড়ি করার কারণেও এক ধরনের সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সেও করোনার টিকা নিতে নাগরিকদের অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এর উত্তর খুঁজতে গেলে ৮০ বছর বয়সী জেন ডেবুচে জানান, তিনি প্রতি বছর ফ্লুর টিকা নেওয়ার সময় সামনেই থাকেন। তবে করোনাভাইরাসের প্রশ্ন উঠতেই অবসরপ্রাপ্ত এই ট্রাকচালক জানান ‘যোগ্য বিবেচিত হলেও তিনি টিকা নেবেন না। ’ প্যারিসের এই বাসিন্দা বলেন, ‘জানি না এর মধ্যে কী আছে?’  ২৭ ডিসেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা প্রদান শুরু করেছে ফ্রান্স। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য সদস্যরাও একই সময়ে তা শুরু করে।

ডেবুচে বলেন, ফ্রান্স টিকাদানে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নার্সিং হোমে বসবাসকারীদের। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে তারা বয়স্কদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। ’ ডেবুচে একা নন। অডোক্সা পোলিং গ্রুপ এবং লা ফিয়াগোরো সংবাদপত্রের এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী ফ্রান্সের ৫৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী কভিড-১৯-এর টিকা নিতে আগ্রহী নয়। যুক্তরাজ্যে এ সংখ্যা ৩৩ শতাংশ আর যুক্তরাষ্ট্রে ৪১ শতাংশ। প্যারিসভিত্তিক থিংকট্যাংক জেন জাউরসের গবেষক অ্যান্টনি ব্রিসটিয়েলে বলেন, ‘বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এবং সরকার যা বলছে তা বহু মানুষ বিশ্বাস করছে না। ’  তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা সরকারের প্রতি অবিশ্বাস। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দুটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেন ব্রিসটিয়েলে।

ওই সময় হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা প্রচলন ও রক্তদূষণ কেলেঙ্কারিতে সরকারের সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা থেকে ফ্রান্সে বহু মানুষ ভয় পাচ্ছে। হেপাটাইটিস-বি টিকা গণহারে প্রয়োগের সময় একসঙ্গে বেশ কিছু রোগ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই দুটির মধ্যে সম্পৃক্ততা খুঁজতে থাকেন। তবে গবেষণায় কোনো সময়ই এর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ১৯৯১ সালে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য কেলেঙ্কারি ঘটে। সরকার দেখতে পায় জেনেশুনে এইচআইভি আক্রান্তদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এর কারণে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়।

ফরাসি সরকার প্রাথমিকভাবে রক্তদূষণের কথা আগে থেকে জানার কথা অস্বীকার করে। পরে তিন মন্ত্রীকে গণহত্যায় অভিযুক্ত করা হয়। পরে একজনের বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হলেও কোনো সাজা দেওয়া হয়নি। ফলে ফরাসি নাগরিকদের সরকারের প্রতি অবিশ্বাস থেকে গেছে। আজকের দিনে কভিড-১৯-এর টিকা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য যোগ হয়ে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়েছে। ব্রিসটিয়েলে বলেন, ‘বহু কথিত বিশেষজ্ঞ টেলিভিশনে গিয়ে মিথ্যা তথ্য বলছেন।

তারা যা বলছেন তা সত্যি না হলেও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তা প্রচার হওয়ায় অনেকেই তা মেনে নিচ্ছেন। ’  ব্রিটেনে করোনার স্মার্ট প্যাচ : বিশ্বের প্রথম করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্যাচ উদ্ভাবনের কাজ ব্রিটেনে এগিয়ে চলেছে। ধূমপান প্রতিরোধী নিকোটিন প্যাচের মতো দেখতে এ ভ্যাকসিনটি নিয়ে কাজ করছেন ব্রিটেনের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।

করোনার জন্য ডিজাইন করা ডিভাইসগুলো বিতরণ ও ব্যবহার সহজ এবং কম ব্যয়বহুল হওয়ায় ভবিষ্যতে এ প্যাচটি অন্য সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় ব্যবহার করা যাবে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র মাইক্রো নিডল বা সুচ দিয়ে ভ্যাকসিনটি শরীরে প্রয়োগ করা যাবে। প্যাচ ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। চলতি বছরের মার্চের মধ্যে এ প্রতিষেধকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত হবে বলে আশা করছেন উদ্ভাবকরা।

তবে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করতে এখনো দুই বছরের বেশি লাগবে। ভ্যাকসিনটি উদ্ভাবন প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকা ড. সঞ্জীব শর্মা বলেছেন, ভ্যাকসিনটিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে প্রকল্প সহযোগী লন্ডন ইমপেরিয়াল কলেজের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মানবদেহে প্রয়োগ করা হবে। স্মার্ট ভ্যাকসিন ডিভাইস নামের এ প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে ব্রিটেনের ওয়েলস সরকার ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ইউরোপিয়ান রিজিওনাল ডে ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ