Thursday -
  • 0
  • 0
জাহাঙ্গীর আলম কবীর
Posted at 07/01/2021 04:30:pm

সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার

সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার

সুন্দরবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ ভয়ঙ্কর যে প্রাণীটি বাস করে তার নাম রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই বন ছাড়া সার পৃথিবীর আর কোথাও এই বিচিত্র প্রজাতির প্রাণীর বাস নেই। যেমন এর সুন্দর চেহারা, তেমনি এর বিশালত্ব। সারা বিশ্বের কাছে আমাদের জাতীয় প্রতীক হয়ে আছে এই ডোরা কাটা বাঘ। আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার। 

রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বৈজ্ঞানিক নাম প্যান্থেরা টাইগ্রিস। এর মাথার ওপর ও নিচের অংশ, সারা শরীর, লেজ ও বুকের রং উজ্জ্বল হলুদ।

তার ওপর কালচে ডোরাকাটা দাগ। গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকায় এরা সহজেই জঙ্গলে ও তৃণভূমিতে প্রকৃতির রঙের সাথে গা মিশিয়ে অবস্থান করতে পারে। এরা লম্বায় ১০ থেকে ১২ ফুট এবং উচ্চতায় ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ওজন ২ থেকে ৩ কুইন্ট্যাল। স্বভাব অতিমাত্রায় প্রকৃতির। শিকারের সময় এদের রূপ থাকে ভয়ঙ্কর। জীবজন্তু শিকারের পর এরা প্রথমে কাঁধের দিক থেকে রক্ত পান করে। আর শিকারকে এরা পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে।


বাঘের খাদ্য তালিকা: বাঘের প্রিয় খাদ্য মাছ, কাছিম, কাঁকড়া এবং তারপর হরিণ। মাছ, কাছিম ও কাঁকড়া খুবই ভালবাসে। বাঘ হরিণকে আক্রমণ করে অনন্যোপায় হয়ে। হরিণকে বাঘ আক্রমণ করার আগে সুন্দরবনের বানররা হরিণকে আওয়াজ দিয়ে সাবধান করে দেয়।

বাঘের মানুষ খাওয়া প্রায় অস্বাভাবিক ঘটনা।অনেক সময় শিকার ধরতে গিয়ে বাঘ আহত হয়। তখন আর তার স্বাভাবিক শিকার ধরার ক্ষমতা থাকে না। তখনই বাঘ হয়ে ওঠে মানুষখেকো। যে কয়াট মানুষখেকো বাঘ ধরা বা মারা পড়েছে, সবক্ষেত্রেই দেখা গেছে তাদের হাতে বা পায়ে রয়েছে মারাত্মক ক্ষত।

বাঘের রাজ্য সীমা: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের যে খাদ্য শৃঙ্খল বা ‘ফুড চেইন’ রয়েছে তার পিরামিড শীর্ষে অবস্থান করছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। প্রতিটি প্রাণীই খাদ্যের জন্য অপর কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রয়েল বেঙ্গল টাইগার কারো খাদ্য তালিকায় নেই।

সবার ওপরে এই বাঘ, তাই অন্য কোন প্রাণীর খাদ্য হয়ে প্রাণ হারাবার ভয়ও নেই তার। আর একারণেই সুন্দরবনের একচ্ছত্র অধিপতি হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনের রাজাও বলা যেতে পারে তাকে। এর অন্যতম রাজকীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিটি বাঘের বিচরণের একটি নির্দিষ্ট সীমানা আছে। এই সীমানার বাইরে সাধারণত সে যায় না। অন্য বাঘও তার সীমানায় প্রবেশ করে না। সুন্দরবনের একেকটি বাঘের রাজত্বের সীমানা মোটামুটি ৪০ বর্গমাইল। সীমানার চার পাশে গাছে নখের আঁচড় দিয়ে এবং প্র¯্রাব করে বাঘ তার রাজ্যসীমা চিহ্নিত করে রাখে। এই সীমানার মধ্যে তার সঙ্গী বাঘিনী ছাড়া আর কারও প্রবেশ নিষেধ।


বাঘ ভীতির কারণে: সুন্দরবনের সব ধরনের বন্যপ্রাণী বাঘকে সমঝে চলে। এমনকি মানুষও। বনে কাঠ, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহ করতে যায় যে সব বাওয়ালী ও মৌয়ালরা, তারা ভয়ে কখনও বাঘের নাম উচ্চাণ করে না। বাঘকে তারা ‘বড় মিয়া’ বা ‘বন বিড়াল’ নামে সম্বোধন করে। হিন্দুরা বাঘকে ‘বড় মামা’, ‘বড় দাদা’ বা ‘গাজী ঠাকুর’ বলে থাকে। কিন্তু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এই আধিপত্য কিছুতেই মেনে নিতে চায় না দাঁতাল শুয়োর। তাদের মধ্যে লড়াই লেগেই থাকে। এই দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে লড়াইয়ে মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে সুন্দরবন।

বাঘের গোঁয়ার স্বভাব: গোঁয়ারতুমিতে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জুড়ি নেই। এরা সব সময় সোজাসুজি সাঁতার কেটে নদী পার হয়। তীব্র  টানে যদি সোজা পথে পার হতে না পারে তখন আগের স্থানে ফিরে আসে। আবার ষ৭াতার শুরু করে। সোজাসুজি নদী পার না হওয়া পর্যন্ত এরা চেষ্টা অব্যাহত রাখে।


বাঘের প্রজনন কাহিনী: আম্বিন-কার্তিক মাসে বাঘিনী গর্ভবতী হয়। ২ থেকে ৫টি বাচ্চা প্রসব করে। বাচ্চা প্রসবের পরপরই বাঘিনীর সাথে বাঘের সম্পর্ক বৈরী হয়ে যায়। কারণ পুরুষ বাঘ সব সময়ই বাঘিনীর বাচ্চা খেয়ে ফেলার সুযোগে থাকে। তাই বাচ্চা প্রসবের পর বাঘিনী বাচ্চা নিয়ে দ্রুত অন্যত্র সরে পড়ে।


রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যাযজ্ঞ: পৃথিবীতে যেসব প্রজাতির বাঘ ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে আসছে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তাদের মধ্যে অন্যতম। এদের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে বলে বন বিশেষজ্ঞদের অভিমত। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর নতুন নতুন প্রাচুর্যই এই বিরল প্রজাতির বাঘকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব এশিয়দের প্রাচুর্য আসার কারণে সুন্দরবনে এখন বাঘ শিকার ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। বাঘের শরীরের অংশ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে তৈরী ভেষজ ওষুধ খেলে মানুষের ক্ষমতা বাড়ে, এটা এশিয়ার অনেক দেশের মানুষের বদ্ধমূল ধারণা। একটা প্রাচীন বিশ্বাসও বটে। চীন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল।

বাঘের শরীরের অংশ দিয়ে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে চীনের স্থান এক নম্বরে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, চীন নিজ দেশের বাঘ এই পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করছে না। নিউইয়র্ক ভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ কনজার্ভেশন সোসাইটির (ডব্লিউসিএস) মতে, চীনা ভেষজ ওষুধের কাঁচামাল যোগানোর জন্যই পশু শিকারীরা গোপনে বাঘ শিকার করছে। সুন্দরবনে এ কারণেই বাঘ মারা পড়ছে। চীনারা বিশ্বাস করে বাঘের শরীরের হাড় দিয়ে তৈরী ভেষজ ওষুধে চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি শক্তি ও ছানি ভাল হয়। বাঘের মাংস দিয়ে তৈরী ওষুধ ব্যবহৃত হয় ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে। বাঘের বিশেষ অঙ্গ দিয়ে তৈরী ওষুধ পুরুষের মর্দানী শক্তি বৃদ্ধি করে। যৌন শক্তি বাড়ায় বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই বিশেষ অঙ্গের তৈরী এক বাটি স্যুপ বিক্রি হয় ৩৫০ মার্কিন ডলারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ বিশ্বাসের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

শুধু যে চীনে বাঘের শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে তৈরী ওষুধের বাজার রয়েছে তা নয়। জাপানেও এর ভাল বাজার রয়েছে। পশ্চিমের যে দেশগুলোতে প্রবাসী এশিয়দের সংখ্যা বেশী, সে সব দেশেও এসব পণ্যের বাজার আছে। চীন ও তাইওয়ানে এখন বাঘের তৈরী ওষুধ গোপনে বেচাকেনা হয়। আর জাপানে বিক্রি হয় প্রকাশ্যেই।

দেশের প্রভাবশালী ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা এর ক্রেতা। উপঢৌকন হিসেবে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কোন জুড়ি নেই। তাছাড়া ওষুধ হিসেবে বাঘের শরীরের নানা অংশের ব্যবহার ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

চীন-সীমান্ত এলাকায় বাঘের মাংসের তৈরী পণ্যের ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। বাঘ শিকারী ও এই ব্যবসার সাথে জড়িতদের একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি বাঘ বিক্রি হয় আকার ও ওজন অনুযায়ী ৪ থেকে ১০ হাজার মার্কিন ডলারে। কাজেই সুন্দরবন অঞ্চলের লোকজনকে বেশী বেশী পয়সা দিয়ে সহজেই বাঘ শিকারের জন্য কাজে লাগানো যায়।


বাঘ শিকারের বিভিন্ন কৌশলে: শিকারীরা সাধারণত পূর্ণিমা ও আমাবস্যার সময় বাঘ শিকারে বের হয়। সুন্দরবন এলাকার লোকজন জানায়, গভীর বনে বাঘ-বসতিপূর্ণ এলাকায় চোরা-শিকারীরা একটানা কয়েকদিন অবস্থান করে। গাছের ডালে মাচা বা টোঙ বেধে বাস করে।

লক্ষ্য রাখে বাঘের গতিবিধির ওপর। তার চলাচলের পথে বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তৈরী করে ফাঁদ। ভেতরে ‘আধার’ হিসেবে দেয় জ্যান্ত ছাগল কিংবা হরিণ। এই ‘আধার’ খেতে এসে বাঘ ফাঁদে আটকা পড়ে। আবার গুলি করে হত্যা করে কেউ কেউ। অজ্ঞান করে ক্লোরোফর্ম দিয়ে। কখনও আবার হরিণ মেরে তার শরীরে বিষ মিশিয়ে বনের মধ্যে রেখে দেয়। বিষ মাখানো হরিণ খেয়ে বাঘ মারা যায়। এভাবে শিকারীরা বাঘের চামড়া, দাঁত, হাড়, মাংস সংগ্রহ করে থাকে।


আরো যে ভাবে মারা পড়ে বাঘ: সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, রামপাল ও শ্যামনগর উপজেলায় বনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। মানুষ তাই অবাধে বনে ঢুকছে। স্থানীয় লোকেদের মতে, গাছ কাটা ও আগা মরা রোগের কারণে বনের গভীরতা কমে যাচ্ছে। ক্রমাগত হরিণ শিকার ও পানির মাছ, কাছিম ও কাঁকড়া ধরা পড়ছে। এসব কারণে বাঘের বসতি ও খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।

মার্কিন পরিবেশবিদ মর্গান ও ম্যাক ইন্টারের মতে, সুন্দরবনের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার নরখাদক হয়ে উঠছে। অপরদিকে বনদস্যু ও শিকারীদের তাড়া খেয়ে বাঘ শুকানো নদী পার হচ্ছে। গ্রামে প্রবেশ করছে বাঘ। অতি সহজেই এরা জঙ্গল ছেড়ে জনপদে চলে আসে। এরা বেশী হানা দেয় শীতকালে। শিকার করে নিয়ে যায় মানুষ ও গৃহপালিত পশু।

এদিকে ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর সুন্দরবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে অন্তত ৩০টি বাঘ মারা যায়। বন বিভাগের হিসাব মতে, এই সংখ্যা ছিল ৭টি। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে যে বাঘগুলো মারা যায় তার একটি দেহেও চামড়া পাওয়া যায়নি।

শিকারীরা ওই দুর্যোগের মধ্যেও মৃত বাঘের চামড়া খুলে নিয়ে যায়। এছাড়াও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও অজ্ঞাত রোগে গত ২০ বছরে অন্তত ৭০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বন কর্মকর্তারা বলেছেন, ময়না তদন্তে দেখা গেছে, লিভার নষ্ট হয়ে এসব বাঘের মৃত্যু ঘটেছে। ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে একটি মৃত বাঘিনীকে উদ্ধার করা হয় শরণখোলা রেঞ্জের সনভিটা থেকে। প্রাণীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ জহিরুল ইসলাম জানান, বাঘিনীটি লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

বাঘের অঙ্গ প্রত্যাঙ্গ পাচারের রুট: একটি বাঘ হত্যার পর তার চামড়া, দাঁত, নখ, চর্বি ও মাথা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রোসেস করা হয়। পরে নদী অথবা সড়ক পথে মংলা বন্দর, ঢাকা, চট্রগ্রাম ও সীমান্ত এলাকায় নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সুন্দরবন থেকে বাসের মাথায় বিভিন্ন মালামালের মধ্যে, বিভিন্ন সংস্থার গাড়িতে, এমনকি মোটর সাইকেলে চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ করা হয়। সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতে পাচার হয়ে যায়। ভারত হয়ে চলে যায় দেশ-দেশান্তরে। মংলা ও চট্রগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে লোভনীয় এই বাঘের চামড়া ও দাঁত বিদেশ আসা কোন কোন জাহাজে করে পাচার করা হয়। বাঘের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্যবসার সাথে জড়িত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রকে খুঁজে বের করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এই চক্রটি বরাবর সুন্দরবন এলাকায় জাল বিস্তার করে রয়েছে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ