Tuesday -
  • 0
  • 0
জাহাঙ্গীর আলম কবীর
Posted at 06/01/2021 06:36:pm

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী ও স্মৃতিময় দুই দিন

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী ও স্মৃতিময় দুই দিন

২০২১ সালের জানুয়ারির প্রথম দিন শুক্রবার। সাতসকালে সাতক্ষীরার মাধবকাটি থেকে এমআর পরিবহনে বেরিয়ে পড়লাম রাজশাহীর সারদা বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির উদ্দেশ্যে। পরিবহন থেকে নামলাম রাজশাহীর বানেশ্বর ট্রাফিক মোড়ে। আমি আর আমার ছোট বোন শ্রুতিরোজ বাস  থেকে নামতেই পেয়ে গেলাম পুলিশ একাডেমির প্রশিক্ষক বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী মোঃ তাজুল ইসলামকে। বহু গুণের অধিকারী তিনি। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

পুলিশ একাডেমীর দেয়া গাড়িতে উঠে আলাপচারিতায় মেতে উঠলাম। আমরা আনুমানিক ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে সারদার পুলিশ একাডেমীতে পৌছালাম। তখন বিকেল সাড়ে চারটে। গাড়ি থেকে নেমেই উঠে পড়লাম ডক্টরস কোয়ার্টারের তিন তালার একটি খালি ফ্ল্যাটে। এখানেই কেটেছে দুটো রাত।

এখানেই স্বাগত জানালেন পুলিশ একাডেমীর সহকারী পুলিশ সুপার প্রদীপ কুমার দাস। ফ্রেস হবার পর তাজুল ইমলাম, শ্রুতিরোজ ও আমাকে নিয়ে গেলেন ক্যাফেটেরিয়ায় দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। তখনও জানিনা শ্রুতিরোজ-এর সাথে কেন এসেছি। শুধু জানি ও একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় সংগীত পরিবেশন করবে। শ্রুতিরোজ কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এম মিউজিকের শেষ বর্ষের সংগীতের ছাত্রী।

অসময়ে যা ছিল তাই খেয়ে নিলাম। খাবার সময় তাজুল ইসলামকে প্রদীপ কুমার দাস বললেন সন্ধ্যায় ‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’-এ রিয়ার্সেল হবে। শ্রুতিরোজকে সেখানে অংশ নিতে হবে। ফিরে এলাম ডক্টরস কোয়ার্টারে।

দীর্ঘপথ পাড়ি দেবার ক্লান্তি দূর করে নির্ধারিত সময়ের আগেই তাজুল ইসলামের সাথে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’-এর উদ্দেশ্যে। ক্যাফেটেরিয়ায় চা পান শেষে তিনি সহ আমরা গেলাম ডাচ পুকুরের পাশে ‘চেমনি ‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’-এ।

পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ‘বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী ভবন’। ভবনের গায়ে নাম  খোদাই করা রয়েছে যৌথভাবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। এখানে সবাই ছবি তুললেন।


‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’-এ সন্ধ্যায় শুরু হলো রিহার্সেল। এতে অংশ নিলেন তাজুল ইসলাম, শ্রুতিরোজ ও পুলিশ পরিবারের সদস্য যশোরের মেয়ে সংগীত শিল্পী নুসরাত জেরিন বাবলি। এখানেই একে একে পরিচিত হলাম বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর পুলিশ সুপার (কারিকুলাম) আনসার উদ্দিন খান পাঠান, পুলিশ সুপার (প্রবেশনারস ট্রেইনিং) আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কোর্স কো-অর্ডিনেটর প্রবেশনারস ট্রেইনিং) রেজাউল হক খান এবং উপ-পুলিশ পরিদর্শক বেনু আকতার-এর সাথে।

তাজুল ইসলাম, শ্রুতিরোজ ও নুসরাত জেরিন বাবলিকে গান নির্বাচন করে দিলেন আনসার উদ্দিন খান পাঠান। এরপর শুরু হয় পুলিশ একাডেমির নিজস্ব অংশগ্রহণকারীদের নিয়মিত রিয়ার্সেল। সঙ্গীত, নৃত্য, অভিনয়, আবৃত্তি ও ফ্যাশন শো’র মহড়া। নৃত্যের কোরিওগ্রাফি করেছেন নৃত্যশিল্পী কবিরুল ইসলাম রতন ও তার সহযোগী নৃত্যশিল্পী মাহবুব হাসান শাওন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনায় ছিলেন এএসপি (প্রবি) শেখ সুরাইয়া উর্মি এবং এএসপি (প্রবি) শাহ মোস্তফা তারিকুজ্জামান। তখনই জানলাম ২ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে ৩৭তম বিসিএস পুলিশ প্রশিক্ষণ সমাপনী উপলক্ষে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। এটি উপভোগ করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট জনেরা। তারপর ফিরে আসলাম রাত্রিযাপনের নির্ধারিত কক্ষে।
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর ভৌত কাঠামো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ২০০০ আসন বিশিষ্ট কুঠিবাড়ি আকৃতির কাঠামোয় এটি প্রতিষ্ঠিত। এখানে রয়েছে অধ্যক্ষের বাংলো এবং এসপি, অতিরিক্ত এসপি, এএসপি, নতুন প্রশিক্ষণার্থী, মহিলা অফিসার, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট, প্রধান কনস্টেবল, কনস্টেবল এবং ভৃত্যদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা।

এক সময়ে এই বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর স্থানটি ছিল ওলন্দাজদের বাণিজ্য বসতি এবং পরে রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবসায়িক দপ্তর (১৮৩৫)। এখানকার ‘ডাচ পুকুর’টি ওলন্দাজদের বাণিজ্য বসতির স্বাক্ষী। এখানে পুলিশ অফিসার্স প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার মেজর এইচ চামেনির ওপর একাডেমী স্থাপনের দায়িত্ব অর্পণ করে। ১৯১২ সালের জুলাই মাসে একাডেমী প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে পদ্মা নদীর পাড়ে সারদায় ছিল ইংরেজদের নীলকুঠি। এর বড়কুঠি ব্যবহার হচ্ছে অফিসার্স মেস হিসেবে আর ছোটকুঠি হলো প্রিন্সিপালের বাসভবন। এছাড়াও এখানে রয়েছে ইতিহাসের স্বাক্ষী আরও কয়েকটি প্রাচীন ইমারত। আর ‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’টি মেজর এইচ চামেনির স্মুতি বহন করছে।

পরদিন সকালে শ্রুতিরোজ ও আমি নাস্তার সময় বেরিয়েছি তাজুল ইসলাম-এর সঙ্গে। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতেই দেখা হয়ে গেল ঢাকা থেকে আসা সংগীত শিল্পী জিনিয়া জাফরিন লুইপা, সাব্বির জামান ও তাদের অন্যান্য বাদ্যশিল্পীদের সাথে। তাজুল ইসলাম পরিচয় করিয়ে দিলেন তাদের সঙ্গে। তার সাথে তাদের পূর্ব সম্পর্ক আছে। তাই পরিচয় করিয়ে দিতে তাজুল ইসলামের অসুবিধা হয়নি। তারা সবাই রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসলেন। সবাই মিলে গেলাম ক্যাফেটেরিয়াতে। যাবার সময় শুরু হলো সেলফি তোলা। আবার এখানেই হাজির হলেন প্রদীপ কুমার দাস। সকলের খোঁজ-খবর নিলেন।

দুপুরের লাঞ্চ সেরে ‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’-এ আবার রিয়ার্সেল। এবার অংশ নিলেন শ্রুতিরোজ, তাজুল ইসলাম, নুসরাত জেরিন বাবলি, সাব্বির জামান ও জিনিয়া আফরিন লুইপা। রিয়ার্সেল শুরু হতে দেরি দেখে বেড়াতে বের হলাম। শ্রুতিরোজ আর আমি হাঁটতে হাঁটতে সোজা পদ্মা নদীর পাড়ে গেলাম। মনটা খারাপ হয়ে। গেল কারণ ১৯৮১ সালে আমার দেখা পদ্মা নদীর সেই রূপ যৌবন আর নেই। শীর্ণ হয়ে গেছে। নদীর তীরে চাষাবাদ করা  হয়েছে। আবার ফিরলাম ‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’-এ। পথে দেখা হয়ে গেল পুলিশের অর্শ্ব-বাহিনীর। একজন সাবধান করলেন রাস্তার বাম পাশ দিয়ে না যেতে। কারণ ঘোড়া চাটি মারতে পারে।

সন্ধ্যা সাতটায় ‘চেমনি মেমোরিয়াল হল’-এ শুরু হলো মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। শুরুর আগেই এসে হাজির হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, স্বরাষ্ট্র সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার) এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীর প্রিন্সিপাল খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম (বার), পিপিএম। হলভর্তি পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রথমেই শুরু হলো পুলিশ একাডেমির সদস্যদের পারফর্ম। এরপর এই সংগীত পরিবেশন করেন শ্রুতিরোজ (কলকাতা), তাজুল ইসলাম, নুসরাত জেরিন বাবলি, জিনিয়া আফরিন লুইপা এবং সাব্বির জামান। অনুষ্ঠান শেষ হলো রাত পৌনে দশটার দিকে। ফিরে এলাম ডক্টরস কোয়ার্টারে। মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানের রেশ নিয়ে ফিরলাম ডক্টরস কোয়ার্টারে।

পরদিন সকালে নাস্তা খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিদায় নিতে গেলাম আনসার উদ্দিন খান পাঠান-এর বাসায়। দরবার পুকুর পাড়ের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিদায় নিলাম প্রদীপ কুমার দাস ও বেনু আকতার-এর কাছ থেকে। যাত্রা শুরু করলাম সাতক্ষীরার পথে। ফিরে আসার সময় সারদার বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী থেকে নিয়ে এলাম কিছু স্মৃতি।

যাদের আথিয়েতায় গত দুইদিন অভিভূত হলাম সেই আনসার উদ্দিন খান পাঠান, প্রদীপ কুমার দাস এবং তাজুল ইসলামকে কোনওদিন ভুলবার নয়।
   


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ