Thursday -
  • 0
  • 0
Samium Bashir Meraz
Posted at 06/01/2021 01:05:pm

মুজিববর্ষে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হবে

মুজিববর্ষে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হবে

২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট। এক যুগে সেটা বেড়ে হয়েছে ৬ গুণ। বর্তমানে মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার ৪২১ মেগাওয়াট।

আগে যে পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল এখন তার থেকে বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা এখন ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো যেটা আগে ছিল মাত্র ৬ হাজার মেগাওয়াট। উৎপাদন সক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এখন দেশে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট। 

এত পরিবর্তন হওয়ার মূল কারণ, গত ১ যুগে ১১৪টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে যেখানে ২০০৯ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল ২৭টি। এখন সব মিলিয়ে মোট কেন্দ্র রয়েছে  ১৪১টি।

দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষকে এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় এনেছে সরকার। মুজিববর্ষেই সারা দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত হবে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন জানান, মনপুরা চর, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলের মতো কিছু এলাকা এখনও বিদ্যুৎ সেবার বাইরে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করা হবে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেয় বিদ্যুৎ খাতকে। এ খাতে একের পর এক প্রকল্প নেয়া হতে থাকে। সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এখানে সফলভাবে যুক্ত করা হয়। 

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটে ১২ বছর আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। ওই অবস্থায় মিশ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা নেয় সরকার। বাড়ানো হয় গ্যাসের উৎপাদন। তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি কয়লা, এলএনজি, সৌর, বাতাস ও বায়োগ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয় সরকার। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। 

নীতিমালা সহজ করায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাত এগিয়েছে।  ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে ২৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আমরা অর্জন করে ফেলেছি। 

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক আরও বলেন, আমরা আমাদের রূপকল্পে বলেছিলাম যে, ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করব। অনেক সময় যেটা হয়, পরিকল্পনা করা হলেও বাস্তবায়ন কিন্তু সবসময় পেছনেই থাকে। বিদ্যুৎ খাত এখানে একমাত্র ব্যতিক্রম। আমরা এক বছর আগেই এই মাইলফলক অতিক্রম করেছি। আমরা আমাদের গ্রিডের আওতায় শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করেছি। 

এই ১২ বছরে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে তিন গুণের বেশি। ২০০৯ সালে ছিল এক কোটি আট লাখ যেখানে গ্রাহকসংখ্যা একন ৩ কোটি ৯১ লাখ ওই সময় মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টা। 

দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ঘাটতি মেটাতে আমদানির সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার, যা এর আগের কোনো সরকারই করেনি। বর্তমানে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। ১২ বছর আগে গ্রিড সাবস্টেশন ক্ষমতা ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ। সেটি বেড়ে এখন হয়েছে ৪৮ হাজার ১৫ এমভিএ। 

সঞ্চালন লাইন আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৪৯৪ সার্কিট কিলোমিটার। বিতরণ লাইন ছিল দুই লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার। দ্বিগুণের বেশি বেড়ে সেটি হয়েছে পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার কিলোমিটার।   প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোও এসেছে বিদ্যুতের আওতায়। ছবি: নিউজবাংলা বিতরণে সিস্টেম লস ছিল ১৪.৩৩ শতাংশ। বর্তমানে কমে হয়েছে ৮.৭৩ শতাংশ। 

দিনের হিসাবে এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট, যা গেল বছরের ২৯ মে উৎপাদন করা হয়। 

মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ইফ ইউ জাস্ট লুক ব্যাক টুয়েলভ ইয়ার্স বিফোর (১২ বছর আগে যদি দেখেন), আপনি দেখবেন মানুষের তখন একটা প্রশ্ন ছিল, ভাই বিদ্যুৎ তো গেছে, কখন আসবে? আমি তাহলে ওইভাবে আমার প্রোগ্রামটা করতে পারি। তার মধ্যে অনেক অসহায়ের সুর ছিল। বিদ্যুৎ তো পাব না, আমাকে একটু দয়া করেন, ওই সময়টায় যেন বিদ্যুৎ না যায়।’  আর এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষ এখন অনেকটা ক্ষোভের সুরে বলে কেন গেল এটা দেখেন। মানুষের পারসেপশন আমরা চেঞ্জ করতে পেরেছি। 

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে মোবাইলের কল ড্রপ হয়। আবার ডায়াল করতেই সেখান থেকে কথা শুরু করেন তিনি। 

তিনি বলেন, এখন দেখেন, মোবাইলের যত ড্রপ হয়, ইন্টারপশান হয় বিদ্যুতে এর থেকে অনেক কম। তুলনাই করা যায় না। আমি তো দেখি প্রায়ই কথা বলতে গেলে মোবাইলে কল ড্রপ হয়ে যাচ্ছে। ইন্টারাপশান (বাধাগ্রস্ত হওয়া), আমি বলব না যে শূন্য হয়ে গেছে। কিন্তু এখন অনেক সিগনিফিক্যান্ট।

বিদ্যুৎ বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশাও বাড়ে। মানুষ এখন ন্যূনতম বিদ্যুৎ বিভ্রাট চায় না। সেটা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই তারা কাজ করছেন। আগামী দিনে আমাদের কমিটমেন্ট হলো, রূপকল্পে আমরা বলেছি, সকলকে আমরা মানসম্মত এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেব। আমরা সকলকে বিদ্যুৎ দিয়েছি। এখন আমরা মানসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করছি। 

সরকারের অঙ্গীকার ছিল, ২০২০ সালের পর গ্রাহকদের সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ দেয়া। সেই প্রত্যাশা পূরণ কতটা এগিয়েছে জানতে চাওয়া হয় মহাপরিচালকের কাছে। 

তিনি বলেন, বিদ্যুতের ১২ বছর আগে যে ট্যারিফ ছিল, এখন তার থেকে ট্যারিফ বেশি। দ্বিগুণ হতে পারে। এখন সেটা কী সাশ্রয়ী? প্রশ্ন আসতেই পারে।  ১২ বছর আগে যে ইনফ্লেশন (মুদ্রাস্ফীতি), প্রতি বছরে যদি ৫ শতাংশ ইনফ্লেশন যোগ করি, তাহলে দেখবেন, এখন যে ট্যারিফ (মূল্য), উইদাউট অ্যানি ম্যাটেরিয়াল ইনক্রিজড (অন্য বিষয়গুলো স্থির রেখে) ইনফ্লেশনটা অ্যাডজাস্ট করেন, তাহলে দেখা যাবে একই জায়গায় আছে।

মানুষের মাথাপিছু আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে জানিয়ে মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ১২ বছর আগে আমাদের পার ক্যাপিটা ইনকাম (মাথাপিছু আয়) ছিল ৫৫০ ডলার। এখন সেটা হয়েছে দুই হাজার ১০০ ডলার। সো মানুষের অ্যাফোর্ড্যাবিলিটি (ক্রয়ক্ষমতা) বেড়েছে।  সেই হিসাবে আমি মনে করি যে, এখনও যথেষ্ট সাশ্রয়ী। যাদের জন্য সাশ্রয়ী না, তাদের জন্য আমরা সাশ্রয়ী করে দিচ্ছি। 

মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ব্যবহারের ভিত্তিতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের দিক থেকে অভিযোগ নেই।  যারা গ্রামের দরিদ্র মানুষ ৩০ থেকে ৫০ ইউনিট খরচ করে, তাদের জন্য মোট উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে তার ভাগে ট্যারিফ দেয়া হচ্ছে। আর যিনি ধরেন নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, যার খরচ ১০০ থেকে ১৫০ ইউনিট, তাকে একটু কম মূল্যে দেয়া হচ্ছে।   গ্রামের দরিদ্র মানুষরা কম দামেই পাচ্ছেন বিদ্যুৎ। 

তিনি বলেন, যাদের বিলাসী জীবন, এসি লাগবে, হিটার লাগবে, কুলার লাগবে তাদের কনজাম্পশনও (ব্যবহার) বেশি; ট্যারিফও বেশি। আমি বলব যে, মানুষের জন্য আমরা বিদ্যুৎকে সাশ্রয়ী করার চেষ্টা করেছি। সে কারণে এখনও কিন্তু বিদ্যুতের দাম নিয়ে মানুষের মধ্যে ইয়েটা (অভিযোগ) নাই।

এগিয়ে চলছে রূপপুরের কাজ  বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের অঙ্গীকার করা হয়। সে লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ১৩ মে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশান ফেডারেশনের স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের (রোসাটোম) মধ্যে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।  ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কংক্রিট ঢালাই উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ ক্লাবে পা দেয় বাংলাদেশ।   

আশা করা যায়, ২০২৪ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।  দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ