• 0
  • 0
Younus Ali
Posted at 05/01/2021 12:05:pm

আমাদের জন্য কেমন হবে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন

আমাদের জন্য কেমন হবে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন

ড. মো. শফিকুর রহমান   

ফাইজার ও মডার্নার পর অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার এজেডি-১২২২ বা কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনটি বর্তমানে তিন নম্বর প্রতিযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

তিন ধাপের পরীক্ষার পর ভ্যাকসিনটি কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ৭০-৯০ শতাংশ কার্যকর হিসেবে এর ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্যের পর আর্জেন্টিনা ও ভারত। 

অপরদিকে ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা রয়েছে ৯৪-৯৫ শতাংশ। সম্প্রতি ভারত কোভ্যাকসিন নামে আরেকটি করোনা ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করার আগেই ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, যার কার্যকারিতা ৭০.৫ শতাংশ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। 

অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটির তিন কোটি ডোজ কিনতে ইতোমধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। এ ভ্যাকসিন কয়েক মাসের জন্য রপ্তানিতে ভারত নিষেধাজ্ঞা দিলেও সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বেশিরভাগ লোককে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার জন্য যুক্তরাজ্যও অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ১০০ মিলিয়ন ডোজের বুকিং দিয়ে রেখেছে। 

এখন প্রশ্ন হলো, ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাকসিনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে উৎপাদিত অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি এত দ্রুত অর্থাৎ ৮-১০ বছরের পরিবর্তে মাত্র ১০ মাসে কীভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, অন্যান্য ভ্যাকসিন থেকে এর ভিন্নতা কী এবং বাংলাদেশসহ নিু বা মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য এটি ব্যবহারে কী কী সুবিধা রয়েছে? 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ফাইজার বা মডার্নার এমআরএনএ ভ্যাকসিন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতির মাধ্যমে করোনার স্পাইক প্রোটিন তৈরিতে এমআরএনএ ব্যবহারের পরিবর্তে ভ্যাকসিন তৈরির সাধারণ বা সনাতন পদ্ধতি অনুসরণ করে শিম্পাঞ্জি অ্যাডেনোভাইরাসকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যবহার করেছেন। 

অক্সফোর্ডের ডিএনএ ভ্যাকসিনটিতে করোনার স্পাইক প্রোটিন অ্যান্টিজেন তৈরির জন্য ডিএনএ কোডগুলো সঞ্চয় করতে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন জিনকে শিম্পাঞ্জি অ্যাডেনোভাইরাসের জিনগতভাবে পরিবর্তিত দুর্বল প্রকৃতির একটি ভাইরাসের মধ্যে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং এ ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ সৃষ্টি বা সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে না। 

অন্যদিকে ফাইজার ও মডার্নার এমআরএনএ ভ্যাকসিনে করোনার স্পাইক প্রোটিনের জন্য শুধু রাসায়নিক উপায়ে তৈরি জিনগত কোড (এমাইনো এসিড) ব্যবহার করা হয়েছে, অন্য কোনো ভাইরাস ব্যবহার করা হয়নি। কাজেই অন্য একটি ভাইরাসের মধ্যে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির মূল উপাদান করোনার স্পাইক প্রোটিন অ্যান্টিজেন তৈরি করা হয় বলে এর উৎপাদন খরচও অন্যান্য ভ্যাকসিনের তুলনায় খুবই কম। তাই অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের প্রতি ডোজের মূল্য মাত্র ৩৫০ টাকা, যেখানে ফাইজার ও মডার্নার প্রতি ডোজের মূল্য যথাক্রমে ১ হাজার ৭৫০ ও ৩ হাজার ২৫০ টাকা। 

তা ছাড়া অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি অন্য দুটি এমআরএনএ ভ্যাকসিনের মতো অতি শীতল তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয় না বলে এটির সংরক্ষণ ও পরিবহণও বাংলাদেশের জন্য সহজ। এমনকি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি ২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৬ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়, যেখানে ফাইজার ভ্যাকসিন মাইনাস ৭০ ডিগ্রিতে রাখতে হয় বলে আমাদের মতো দরিদ্র দেশের সর্বত্র এ ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও বহন করা কঠিন। আবার মডার্নার ভ্যাকসিনটি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৬ মাস এবং ২-৮ ডিগ্রিতে ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। 

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি তিন ধাপে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে এর কার্যকারিতা ও সুরক্ষা পরীক্ষা করা হয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রথম পর্যায়ে ভ্যাকসিনটি নিরাপদ কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে পরীক্ষা করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও বেশি লোকের ওপর ভ্যাকসিন প্রয়োগের ফলে উপযুক্ত লক্ষণগুলো বা প্রতিরোধ ক্ষমতা মানবদেহে সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। 

আর তৃতীয় ধাপে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর ভ্যাকসিনটির করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা প্রমাণ করা হয়েছে এবং সম্পূর্ণ ফলাফল আসার অনেক আগে থেকেই ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল বলেই অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটির ইতোমধ্যে (৩০ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত) চার মিলিয়ন ডোজ মজুদ রয়েছে। তারপরও অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা পরীক্ষার ফলাফলের বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। 

একটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় জানা গেছে, অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি মানবদেহে প্রথমে অর্ধেক ডোজ দেওয়ার কমপক্ষে ২৮ দিন পর একটি পূর্ণ ডোজ দেওয়া হলে এর কার্যকারিতা দুটি পূর্ণ ডোজের ৬২ শতাংশ কার্যকারিতা থেকে বেড়ে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দেখায়। 

অক্সফোর্ডের করোনা ভ্যাকসিন ছাড়াও অন্য সব ভ্যাকসিনেরই সুরক্ষা ও কার্যকারিতা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

তারপরও করোনার এ মহামারি থেকে মানুষের আপাতত মুক্তি পাওয়ার জন্য এসব ভ্যাকসিনের কোনো বিকল্প নেই।

তবে এটা স্পষ্ট যে, ফাইজার ও মডার্না ভ্যাকসিনের চেয়ে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটির সাশ্রয়ী মূল্য ও সহজ সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের জন্য বেশি উপযুক্ত। 

ড. মো. শফিকুর রহমান : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ