Thursday -
  • 0
  • 0
MD Alim Uddin
Posted at 04/01/2021 07:04:pm

হামিদ বিন আহমেদের গল্প: বুমেরাং

হামিদ বিন আহমেদের গল্প: বুমেরাং

ঘন কুয়াশা ছাপিয়ে লম্বা পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে আশফাক আহমেদ। ঘড়ির কাটায় ঠিক রাত এগারোটা, আশেপাশে কারো দেখা নেই। দূর হতে ভেসে আসছে অতৃপ্ত কুকুরগুলোর আর্তনাদ। গতকাল আশফাক আহমেদের কাছে একটা চিঠি এসেছিলো। একটা চিঠি, কিছু শব্দ আর এলোমেলো ক'খানা বাক্য। আশফাক সাহেব ছুটে চলছে অবিরাম।

আশফাক সাহেব বিদ্যালয়ের প্রিয়মুখ। সবাই অত্যন্ত ভদ্র, সদা হাস্যোজ্জ্বল, অত্যন্ত পরোপকারী একজন শিক্ষক হিসেবেই চেনেন। বিদ্যালয়ের কারো সাথেই তার কোনো বিবাদ নেই। রোজ সময়মতো তিনি বিদ্যালয়ে আসেন, ক্লাশ শেষে রাস্তার পাশের টঙের দোকানে ঢু মেরে বাসায় ফেরা আশফাক সাহেবের প্রতিদিনের রুটিন।

কিন্তু গতকাল হঠাৎ কি যেনো হয়ে যায় তার। একটা চিঠি আসার পর থেকেই কেমন অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে আশফাক সাহেবের পুরো শরীরে। সবাই ভেবেছিলো হয়তো কোনো দুঃসংবাদ কিন্তু আজ আশফাক সাহেব যথারীতি সঠিক সময়ে এসে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন এবং প্রতিদিনের মতো ছাত্রছাত্রীদের অত্যন্ত সুন্দরভাবে পীথাগোরাসের উপপাদ্য বুঝিয়ে দেন।

স্কুল ছুটির পূর্বে প্রধান শিক্ষকের থেকে ৩ দিনের ছুটি নিতে খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি তার৷ কারণ তার মতো মানুষ অকারণে ছুটি নেয়ার পাত্র নয় তা সবার খুব ভালোভাবে জানা।

নতুন কেনা লাল কালারের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘন কুয়াশা ছাপিয়ে লম্বা পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছেন তিনি। গত জন্মদিনে উপহার হিসেবে মেয়ের দেয়া হাতঘড়িটায় চোখ পড়তে আশফাক সাহেব লক্ষ্য করেন ঘড়ির কাটায় রাত এগারোটা। তার কাছে আজ যেনো মনে হচ্ছে সময় স্তব্ধ হয়ে গেছে।

রাত ১১.৩০ এর ট্রেন ধরে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে হবে। ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলো আজ যেনো অদ্ভুত রকমের অস্বস্তি প্রকাশ করছে। আশফাক সাহেব হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন।

ট্রেনের কামরায় তিনি একা বসে আছেন। প্রতিবার বাড়ি ফেরার সময় মানুষের গাদাগাদি, ঘ্যানঘ্যান, হৈ-হুল্লোড় আশফাক সাহেবের মাথা ধরিয়ে দিতো। কিন্তু আজ যখন তিনি চান কেউ তার পাশে থাকুক, তার একাকিত্ব দূর করুক, তাকে কথার খেলায় মত্ত রাখুক তখন প্রকৃতি তাকে যেনো একের পর এক বিষন্নতা, দীর্ঘশ্বাস উপহার দিচ্ছে৷

ট্রেনের কামরায় বসে বুকপকেটে গুজে রাখা চিঠিটা ট্রেনের ফ্যাকাশে আলোয় চোখের সামনে আবার মেলে ধরলেন তিনি। কিছু শব্দ আর এলোমেলো ক'খান বাক্য। বারবার পড়েও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না তিনি।

চিঠিটা লিখেছেন আশফাক সাহেবের স্ত্রী রুবিনা। অল্প শিক্ষিত রুবিনা বেগমের "তাড়াতাড়ি বাইত আহেন। মাইয়া সর্বনাস করছে। শহরে নেওন লাগব" লিখতে অনেক কষ্ট হয়েছে তা চিঠি পড়ে সহজেই অনুমান করা যায়। তিনি দেখলেন, তার স্ত্রী সর্বনাশ বানান ভুল করেছেন।

শিক্ষক হয়ে এই একটা সমস্যা, অন্যের সব ভুল-ত্রুটি চোখে পড়লেও নিজের ভুল টা চোখের অগোচরে থেকে যায়।

আশফাক সাহেবের ক্লান্ত শরীরে বাড়িতে পৌঁছাতে রাত গভীর হয়ে যায়। তার সাথে বড্ড অমিল হয়ে যায় জীবনের হিসেব-নিকেশেও।

বাড়ি ভর্তি মানুষ, চারদিকে হাহাকার, কান্নার আওয়াজে ভারী চারপাশের পরিবেশ।

বাড়ির উঠোনে সাদা কাপড়ে ঢাকা তার দশম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে রুহিনা।

মেয়েটার জন্মের অনেক আগেই তার মা এই নাম ঠিক করে রেখেছিলো। একমাত্র মেয়ের গভীর রাতে সিলিং ফ্যানে সত্ত্বা ঝুলে থাকা নিথর দেহ দেখে রুবিনা বেগম মৃতপ্রায়। ক্ষণে ক্ষণে চিৎকার করে জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি।

চারিদিকে মিষ্টি আলো। ভোর হতে শুরু করেছে। অল্প কিছুক্ষণ আগে নিজের হাতে একমাত্র আদরের মেয়েকে মাটির নিচে রেখে এসে নদীর পাশ ধরে হেঁটে চলছেন আশফাক সাহেব। চারদিকে সবাই কত কথা বলছে কিন্তু আশফাক সাহেব নির্বাক, নির্জীব।

তিনি মনে মনে ভাবছেন কিভাবে এতোটা মিলে গেলো।

আজ থেকে ঠিক ৩ বছর আগে....

এভাবেই আশফাক সাহেবের দশম শ্রেণির ছাত্রী কাশফিয়ার দেহ সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকতে পাওয়া যায়। লোকমুখে শোনা যায় মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা ছিলো। সবাই জানলো মেয়েটি নষ্টা ছিলো। কিন্তু মেয়েটির 'অকাল মৃত্যু' এবং 'নষ্টা' উপাধি পাওয়ার পেছনে তার যে প্রিয় গণিত শিক্ষক আশফাক সাহেব দায়ী এটা জানা হলো না কারো..

আশফাক সাহেব সেদিন হাঁফ ছেড়ে বেঁচে, কাশফিয়ার মা-বাবাকে অনেক স্বান্তনা দিলেও আজ তাকে স্বান্তনা দেয়ার কেউ নেই.. আশফাক সাহেব অনুভব করছেন প্রকৃতি আজ উপহাসের সুরে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে....


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ