Tuesday -
  • 0
  • 0
Edward Reaz Mahamud
Posted at 04/01/2021 04:06:pm

শুভ জন্মদিন প্রিয় ছাত্রলীগ

শুভ জন্মদিন প্রিয় ছাত্রলীগ

এড‌ওয়ার্ড রিয়াজ মাহামুদ 

বাংলাদেশ জন্মের বীজ রোপন করা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি; সংগঠনটির নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

জন্মদাতা: বাংলা ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশ্বের বৃহৎ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলা এবং বাঙালির ছয় দশকের সংগ্রাম স্বপ্ন এবং সাহসের সারথী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলাদেশের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের গর্বিত অংশীদার এই ছাত্র সংগঠনটি। জাতির ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। বাঙালি জাতি হিসেবে জন্মগ্রহণের আঁতুর ঘর থেকে আজ অবধি স্বাধীনতা, সংগ্রাম আর শিক্ষার নিশ্চয়তার ছাত্রসমাজের তথা দেশবাসীর জন্য অতন্দ্র প্রহরী ছাত্রলীগ। 

ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের সময় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। তিনি ছিলেন কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাজনের পর বাঙালি নতুন ভাবে শোষণের যাঁতাকলে পড়ে। যাকে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘এক শকুনির হাত থেকে অন্য শকুনির হাত বদল মাত্র।’ তাই নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সরকার প্রথমে আঘাত হানে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার উপর। 

বঙ্গবন্ধু তখনই অনুভব করলেন শোষণের কালো দাঁত ভাঙার একমাত্র হাতিয়ার ছাত্র সমাজ। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন প্রতিরোধ তৈরির জন্য ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা সম্পন্ন ছাত্রনেতা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন ‘পাকিস্তান ছাত্রলীগ’। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের যাত্রা শুরু। 

সংগঠনটির প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন নাঈমউদ্দিন আহমেদ। ১৯৪৮-৫০ সালে ছাত্রলীগ সাংগঠনিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন দবিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন খালেক নেওয়াজ খান। ৬৮ বছর পর বৃহৎ ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনটির তিন তারকা খচিত শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির গৌরবের পতাকা বহন করছেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। 

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার এক বছর পর ১৯৪৯ সালে এই ছাত্র সংগঠনটির হাত ধরেই তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগে’র। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ নাম ধারণ করে এ দেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শাসন-শোষণ আর বঞ্চনার প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

জন্মের পর থেকে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন পর্যায়ে জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটির নেতাকর্মীরা জাতীয় রাজনীতিতেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতা কর্মী যুদ্ধের ময়দানে জীবন উৎসর্গ করেছেন। রণাঙ্গনে শহিদ হয়েছেন ছাত্রলীগের ১৭ হাজার সাহসী বীর সৈনিক। বর্তমান জাতীয় রাজনীতির অনেক শীর্ষ নেতার রাজনীতিতে হাতেখড়িও ছাত্রলীগ থেকেই। 

১৯৪৮ সালেই মাতৃভাষার পক্ষে ছাত্রলীগ আপসহীন অবস্থান তৈরি করে। ১১ মার্চ ছাত্রলীগ উর্দুর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ধর্মঘট পালন করে।

ধর্মঘটের পিকেটিং থেকেই গ্রেফতার হন রাজনীতির মাঠের শুকতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র, বাঙালির রাজনীতির রাখাল রাজা ছাত্রনেতা শেখ মুজিব ও তার সহযোগীরা। ছাত্রলীগই প্রথম বাংলা ভাষার জন্য ১০ দফা দাবিনামা পেশ করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। 

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় নিশান উড়ানোর নেপথ্যের কারিগরও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ১৯৫৬ সালের বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়, ৫৭ সালের শিক্ষক ধর্মঘট এবং ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের পালে সমীরণ প্রবাহ সৃষ্টি করে ছাত্রলীগ। 

১৯৬৬ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রচলন হয় বাংলা সপ্টস্নাহের। বাঙালির মুক্তির ছয় দফা হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ আন্দোলনে রাজপথের প্রথম সারিতে অবস্থান ছিল ছাত্রলীগের। একই সময়ে ১১ দফার মাধ্যমে ছাত্রসমাজের রক্তে প্রবাহ সঞ্চার করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ছাত্র গণআন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। 

৭০ সালের নির্বাচনে মুক্তির সনদ ছয় দফাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এক দফার গণভোটে রূপ দেয়। ৭১সালের ত্রিশ লাখ মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলার আকাশে যে রক্তস্নাত লাল সূর্য উদিত হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহৎ ও সংগ্রামী সংগঠন ছাত্রলীগের আত্মত্যাগী নেতাকর্মীদের সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার। 

১৯৭২-১৯৭৫ যুদ্ধপরবর্তী সময়ে দেশ গঠনের সংগ্রামে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিলো অগ্রগণ্য। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা ও তার পরিবারে সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার পর বাঙালি জাতির ভাগ্যকাশ আবার কালো মেঘ গ্রাস করে ফেলে। ইতিহাসের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সামরিক চাষাবাদের তিক্ত ফসল বাঙালিকে অতিষ্ঠ করে তোলে। যা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে রাজপথে রক্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। 

এরশাদের সামরিক শাসনে শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দশ দফা তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শিক্ষার অধিকার প্রসারে শামসুল হক ও অধ্যাপক কবীর চৌধুরির কমিশনে রিপোর্ট তৈরিতে ছাত্রসমাজের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয় বাংলার দামাল ছেলেরা। একটি সফল গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনে সরকার গঠন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ছাত্রলীগ মহিয়ষী নেত্রী, দেশরত্ন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক নির্দেশ প্রতিপালন করেছে। 

১৯৯৮ সালের বন্যা মোকাবেলায় কিছু অদূরদর্শী ব্যক্তির দুর্ভিক্ষের আশংকাকে ভুল প্রমাণ করেছে ছাত্রলীগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তিন শিফটে খাদ্য তৈরি করেছে অক্লান্ত কর্মীরা। তৈরি করেছে দুর্যোগূর্ণ এলাকার মানুষের জন্য খাবার স্যালাইন। দূর্গত এলাকায় রুটি ও স্যালাইন বিতরণ করে মানুষের জীবন রক্ষা করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। যার মাধ্যমে হতাশা ও প্রজ্ঞাহীন ব্যক্তিদের আশংকার জবাব দিয়েছে ছাত্রলীগ। 

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় গণতন্ত্রের মানসকন্যা ও বাংলার মানুষের চির আস্থার ঠিকানা জননেত্রী শেখ হাসিনার জীবন নাশের হামলায় ছাত্রলীগ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে গ্রেফতার হয়ে ১৯ মাস কারাবরণ করেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকসহ অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা। নিষ্ঠুরতার কষাঘাতেও প্রিয় নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন থেকে মোটেও পিছু হটাতে পারেনি শাসক শ্রেণি। 

২০০১ সাল পরবর্তী সময়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী- জঙ্গিগোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্ত করতে ২০০৫ সালের ৭ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করেছে সাতটি ছাত্র সংগঠন। বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ), বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় ছাত্র ঐক্য, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি ও জাতীয় ছাত্র ফোরাম সমন্বয়ে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। যার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। 

বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে আজ অবধি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নেতৃত্বে বলিয়ান হয়ে সকল অশুভ শক্তির মোকাবেলা করে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কথা দিয়েই আমার লেখার সমাপ্তি টানতে চাই। ‘কলমের ক্ষুরধারে নিজেদের শাণিত কর, অস্ত্রের ধারায় নয়।’ দেশরত্ন শেখ হাসিনা-সৃষ্ট ডিজিটাল বাংলাদেশ নামক ক্যানভাসে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর প্রত্যেকটি নেতাকর্মী প্রতিদিন এঁকে যাক প্রাযুক্তিক সাফল্য-চিত্র; সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে শুধু এই প্রত্যাশা রইলো। 

শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। 

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ চিরজীবী হোক জয় হোক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের 

-লেখক: সদস্য, ধর্ম বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ