Saturday -
  • 0
  • 0
Sk Shakil Ahmed
Posted at 04/01/2021 02:11:pm

টাইটানিকের অজানা রহস্য

টাইটানিকের অজানা রহস্য

টাইটানিক জাহাজের দুর্ঘটনার ১০০ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও টাইটানিক নিয়ে কম জল্পনা কল্পনা বা রহস্য ঘনীভূত হয়নি বরং প্রতিনিয়তো নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। আজ আমরা টাইটানিকের অজানা রহস্যকে জানার চেষ্টা করবো৷  

বেলফাস্টের একটি শিপইয়ার্ডে ১৯০৯ সালে টাইটানিকের নির্মাণ কাজ শুরু হয়৷ ৮২২ ফুট ৯ ইঞ্চি লম্বা এই জাহাজটি তৈরি করতে সময় লেগেছিলো প্রায় আড়াই বছর৷ তবে এটা মোটেই আশ্চর্যজনক নয় কারণ তখনকার দিনে সাড়ে তিন হাজার জন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এমন একটি বিলাসবহুল দানবীয় জাহাজ বানানো মোটেই সহজ কাজ ছিলো না। 

স্বভাবতই অনেক সময় এবং শ্রম দিতে হয়েছিলো বিশাল এই জাহাজটি সম্পন্ন করতে এবং এটি সমুদ্রে ভাসানো সহজ কাজ ছিলো না। প্রথমতো জাহাজটির চারপাশে তৈরিকৃত উঁচু মাচানগুলো সরানো হয়। তারপর অসমাপ্ত জাহাজটিকে পাঠানো হয় হাইড্রোলিক লিভারে৷ সবশেষে জাহাজটিকে নিচে থেকে দাঁড় করানোর জন্য ব্যবহৃতো সব কাঠামো সরানো হয় এবং কাঠের রেলপথের মতো একটি রাস্তা তৈরি করা হয় জাহাজটিকে সমুদ্রে ভাসানোর জন্য। 

এই রাস্তাটিকে পিচ্ছিল করার জন্য প্রচুর তেল ব্যবহার করা হয়েছিলো। এক হিসাবে জানা যায় রাস্তাটিতে প্রায় ২৩ টন ডিজেল, মাছের তেল এবং তরল সাবান ব্যবহার করতে হয়েছিলো যার ওপর দিয়ে গড়িয়ে নিয়ে  টাইটানিককে  সমুদ্রে নেওয়া হয়েছিলো। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার ছিলো জাহাজটির আটটি ডেক৷ পুরো জাহাজে প্রায় ৩০ লাখ লোহা এবং স্টিলের গজাল ব্যবহার করা হয়েছিলো। এসব গজালের ওজনই ছিলো একসাথে প্রায় ১২০০ টনের মতো। এককথায় বলতে গেলে তখনকার সময় এটি ছিলো সত্যিকারের একটি দানবীয় জাহাজ।

টাইটানিক শুধু আকৃতিতে বিশাল হবে এমন ভেবে এটি বানানো হয়নি। তারসাথে এটিকে নিরাপদ করার সবচেষ্টাও করা হয়েছিলো৷ জাহাজটিতে দুই স্তর বিশিষ্ট তলা তৈরি করা হয়েছিলো এবং এর হাল ১৬ টি পানি নিরোধক কমপার্টমেন্ট দিয়ে আলাদা করা হয়েছিলো। সেই সাথে জাহাজের কমপার্টমেন্টগুলো তৈরি করা হয়েছিলো এয়ার টাইট দরজার মাধ্যমে আর এর সবই করা হয়েছিলো টাইটানিক ডুবে যাবে না এমন ভাবে তৈরি করতে। যদিও সেটা দুঃখজনক ভাবে সম্ভব হয়নি। 

গবেষকদের মতে দূরবীন না থাকা ছিলো  টাইটানিকের দুর্ঘটনায় পড়ার অন্যতম কারণের মধ্যে একটি। ১৯১২ সালের ১৪ই এপ্রিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত জাহাজ টাইটানিক দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয় এবং মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পুরো জাহাজটি সমুদ্রে তলিয়ে যায়। এই বিশাল বিলাসবহুল জাহাজটির প্রথম সমুদ্র ভ্রমণেই একটি আইসবার্গের সাথে সংঘর্ষের কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে ধারণা করা হয়৷ আর এই দুর্ঘটনার ফলে প্রায় ১৫০০ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিলো এবং ওই রাতে ঠক কি কি ঘটেছিলো তাও মোটামুটি জানা সম্ভব হয়েছে। 

ওই সময় সমুদ্রে চলাচল করা অন্যআন্য জাহাজ রেডিও এর মাধ্যমে জানাচ্ছিলো টাইটানিকের যাত্রা পথে সমুদ্রের ওই অংশে অনেক আইসবার্গ ছিলো। কিন্তু টাইটানিকের পক্ষ থেকে তা উপেক্ষা করা হচ্ছিলো। কারণ সেই বার্তা গুলো আদৌ টাইটানিকের নাবিকদের কাছে পৌঁছায় ছিলোনা। কি কারণে তা ঘটেছিলো তার একটি সহজ এবং দুঃখজনক ব্যাখ্যাও আছে। 

টাইটানিকের রেডিও অপারেটর দের নিয়োগ দিয়ে ছিলো মার্কিনি কোম্পানি এবং তার জাহাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছোলো না। তাদের মূল কাজই ছিলো জাহাজে থাকা ধনী ব্যক্তদের টেলিগ্রাম পাঠানো এবং সর্বশেষ সংবাদ সংগ্রহ করা যা জাহাজের নিজস্ব সংবাদপত্রে ছাপানো হবে৷ তাই আবহাওয়া বা আইসবার্গ সম্পৃক্ত খবর গুলো নিয়ে তারা বেশি গুরুত্ব দেয়নি৷ অবশ্য যাত্রীদের টেলিগ্রাম পাঠানো নিয়ে তারা এতব্যস্ত ছিলো যে এদিকে কারও নজরও ছিলো না। 

টাইটানিকে প্রচুর ধনী যাত্রী ছিলেন। তদেরই একজন মাগারেট ব্রাউন, পরে তার নামকরণ করা হয় আনসিন্কএবল মলি৷ তিনি ছিলেন অসম্ভব ধনী। তিনি কাজ করতেন চ্যারেটি এবং নারী অধিকার নিয়ে। টাইটানিক যখন আইসবার্গের সাথে ধাক্কা খায় তখন অন্য সবার এই সাহসী মহিলা চিৎকার না করে তিনি একেবারে শান্ত ছিলেন। তিনি অন্য মানুষদেরও লাইফবোটে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। যখন তাকেও লাইফবোটে তোলা হয় তখন তিনি অনুরোধ করছিলেন জাহাজে ফিরে যেতে যাতে তিনি আরো মানুষকে জাহাজ থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারেন৷ 

লাইফবোটের কর্মীরা তার কথা না শোনায় তিনি কর্মীদের হুমকি দেন তাকে যেতে না দেওয়া হলে তিনি কর্মীদের লাইফবোট থেকে ফেলে দেবেন৷ পরে উদ্ধারকৃত যাত্রীদের সাহায্যও করেন তিনি। যখন টাইটানিক ডুবে যাচ্ছিলো তখনও কয়েকজন শিল্পী ডেকে বাদ্য যন্ত্র বাজাচ্ছিলো৷ যেমনটি টাইটানিক সিনেমায় দেখানো হয়েছিলো ঠিক তেমনটাও না যদিও। তবে ডুবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একটি সুর বাজানো হয়৷ জাহাজের একজন প্রথম শ্রেণির একজন যাত্রী তার স্মৃতি কথায় এই বিষয়টি লিখে গিয়েছেন৷ সেই সাথে আরো কিছু যাত্রী এই গানটির কথা তাদের স্মৃতিকথায় লিখে গিয়েছিলো৷ 

সমুদ্রের ৩.৭ কিলোমিটার গভীরে চিরনিদ্রায় শায়িত টাইটানিকে খুঁজে বের করার জন্য বেশ কয়েকটি অভিযান চালানো হয়৷ নব্বইয়ের দশকের রাশিয়ার ডিপসি সাবমিরসেবল মীর-১ এবং মীর-২ এর সফল অভিযানে টাইটানিকের বেশ কিছু ভিডিও ধারণ করা হয়েছিলো৷ যা পরবর্তীতে জেমস কেমারুনের বিখ্যাত সিনেমা টাইটানিকেও ব্যবহার করা হয়৷ টাইটানিকের দুর্ঘটনা এমনিতেই খুবই আলোচিত ছিলো৷ কিন্তু ক্যমারুনের এই সিনেমাটির মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মানুষ টাইটানিক সম্পর্কে জানতে পারে৷ বিশাল বাজেটের এই টাইটানিক সিনেমাটি অবশ্য চূড়ান্ত সফলতা পায়। 

হোয়াইট স্টার লাইট কোম্পানির দানবীয় জাহাজের তালিকায় টাইটানিকই একমাত্র দানবীয় জাহাজ ছিলো না৷ দা অলম্পিক এবং দা ব্রিটানিক নামে আরো দুটো দানবীয় জাহাজ ছিলো তাদের৷ টাইটানিকের আদলে তৈরি দা অলম্পিক অনেক বছর সার্ভিসে ছিলো এবং ১৯৩৫ সালে জাহাজটিকে ডিকমিশণ্ড করা হয়৷ আর দা ব্রিটানিক জাহাজটিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভাসমান হাসপাতালের রুপ দেওয়া হয়৷ দা ব্রিটানিক জাহাজটি ১৯১৬ সালে মাইনের আঘাতে ডুবে যায়। 

বর্তমানে ডুবান্ত টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ ইউনেস্কোর কালচারাল হেরিটেজ সাইট হিসাবে পরিগনিত। দুর্ঘটনার প্রায় ১০০ বছর পরে দেওয়া হয় এই সম্মাননা। যে কারণে বর্তমানে টাইটানিকের যেকোনো আংশ সরানো বা নিয়ে আসা অবৈধ।

যদিও বলা হয় আইসবার্গের সাথে ধাক্কা লেগে টাইটানিক ডুবে গেছে কিন্তু এটা অনেকেই বিশ্বাস করে না৷ কারও কারোর মতে জার্মান টর্পেডোর মাধ্যমে টাইটানিকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। আবার ইনসুরেন্সের টাকা পেতে ইচ্ছে করে টাইটানিকে ডুবানো হয়েছিলো বলে বিশ্বাস করেন অনেকই৷

একটি জনপ্রিয় মিথ হচ্ছে ৬ বছর পরপর রেডিও অপারেটররা নাকি টাইটানিক থেকে এসওএস (SOS) গোস্ট সিগন্যাল রিসিভ করে থাকেন৷ এর কথা প্রথম জানা যায় ১৯৭২ সালে।

ইউএসএস থিয়োডর রুজভেল্টের রেডিও অপারেটররা জানায় তাদের রেডিওতে একটি অদ্ভুত  SOS সিগন্যাল ধরা পড়ে। তাদের দাবি টাইটানিক থেকে এই অদ্ভুত  SOS সিগন্যাল আসে। অবশ্য তাদের এমন দাবির পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই৷ 

১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টাইটানিক সমুদ্রের নোনা পানিতে বিলিন হয়ে যাচ্ছে।

২০০৯ সালে এই টাইটানিক জাহাজ থেকে বেঁচে ফেরা সর্বশেষ ব্যক্তির মৃত্যু হয়৷ মিলভিনা ডিন নামের ওই মহিলার বয়স হয়েছিলো প্রায় ৯৭ বছর৷ টাইটানিকে ভ্রমণ কালে ওই মহিলার বয়স ছিলো মাত্র আড়াই মাস। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই টাইটানিকে ভ্রমণের কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই৷ 

টাইটানিক জাহাজের দুর্ঘটনার ১০০ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও সমস্ত পৃথিবীর মানুষের মধ্যে থেকে টাইটানিক সম্পর্কে জানার আগ্রহ এখনো নূন্যতম কমেনি। 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ