• 0
  • 0
Verified আই নিউজ বিডি ডেস্ক
Posted at 03/01/2021 02:33:pm

মেডিক্যালে বেড়েছে শিক্ষার্থী, কমেছে কংকাল সরবরাহ

মেডিক্যালে বেড়েছে শিক্ষার্থী, কমেছে কংকাল সরবরাহ

মেডিক্যালে ক্রমেই বাড়ছে ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা। সেই সাথে বাড়ছে কংকাল সংকট। মেডিকেল শিক্ষায় কঙ্কালের ব্যবহার থাকলেও এটি সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন নীতিমালা এখনো হয়নি।  ফলে সৃষ্টি হচ্ছে  কংকালের চোরাই মার্কেট। 

বাংলাদেশে মানুষের কঙ্কাল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় মেডিকেল শিক্ষার ক্ষেত্রে। এছাড়া নার্সিং কিংবা হোমিওপ্যাথি বিষয়ক পড়াশুনার জন্যও কঙ্কাল ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ মানবদেহ নিয়ে পড়াশুনা করতে হয় এমন যেকোন ধরণের শিক্ষায় কঙ্কালের ব্যবহার রয়েছে।

বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি হিসেবে ১১২টি মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ছাত্র সংখ্যা কমসে কম ৫২ হাজার। এর মধ্যে প্রথম বর্ষ থেকেই কঙ্কাল লাগে। আর প্রথম বর্ষে প্রতি বছর ভর্তি হয় সাড়ে ১০ হাজারের বেশি।  মেডিকেলে ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা বাড়লেও কঙ্কাল প্রাপ্তির সংখ্যা বাড়েনি। এর জন্য শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে অন্য দিকে অবৈধভাবে মরদেহ থেকে কঙ্কাল আলাদা করে তা দিয়ে ব্যবসা হচ্ছে। 

জানা যায়, চোরাই ব্যবসায় যারা জড়িত তারা মরদেহ চুরি করে জ্বাল দিয়ে মাংস গলিয়ে বের করে কঙ্কাল।  কিন্তু বৈধভাবে কঙ্কাল প্রাপ্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে যদি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তার দেহ দান করেন তাহলে পরবর্তী সময়ে তা থেকে কঙ্কাল পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি খুবই নগণ্য বলা যায়। এত শিক্ষার্থীর কঙ্কাল প্রাপ্তির বৈধ উপায় বা ক্ষেত্র সম্পর্কে কেউ জানে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরনো কঙ্কাল দিয়ে কাজ সারলেও অনেক শিক্ষার্থী তাদের মেডিক্যাল কলেজ ও বাইরের একটি মাধ্যম থেকে নতুন কঙ্কাল কিনে থাকেন। 

মেডিকেলে শিক্ষার ক্ষেত্রে মানুষের কংকালই কেন ব্যবহার করতে হবে ? এমন প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞদের থেকে জানা যায়, অনেক শিক্ষক মনে করেন যে, আর্টিফিশিয়াল কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি কঙ্কাল দিয়ে শিক্ষার বিষয়টি পরিপূর্ণ হয় না। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক করেন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসক হিসেবে পেশা শুরু করেন তাদের জন্য মানুষের আসল কঙ্কালই প্রযোজ্য বলে মনে করেন তারা।  তারা এটাও বলেন যে আসল কঙ্কালের মতো আর্টিফিশিয়াল বা কৃত্রিম কঙ্কাল বানানো সম্ভব নয়। অনেক সময় এমন কঙ্কালে অনেক ভুল থাকে। যেটা পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের চরম বিপদে ফেলতে পারে বলে জানান। 

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের শিক্ষক ডা. এ এইচ এম মোস্তফা কামাল জানান, রিয়েল কঙ্কালে হয়তো একটা গর্ত আছে, একটা নার্ভ চলে গেছে, একটা গ্রুপ আছে, কিন্তু আর্টিফিশিয়ালে হয়তো ওইটা আসেই নাই। তবে আর্টিফিশিয়াল বা মডেল কঙ্কাল অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় । কন্তু সেগুলা নার্সিং কিংবা হোমিওপ্যাথির মতো বিষয়গুলোতে অনেক সময় এ ধরণের কঙ্কাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে  তবে রিয়েল কংকাল ব্যবহার করাটাই উত্তম বলে তিনি মনে করেন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম শাখার পরিচালক হাবিবুর রহমান কংকাল প্রাপ্তির বিষয়ে বলেন, আসলে কঙ্কাল প্রাপ্তির কোনো বৈধ নিয়ম এখন পর্যন্ত নেই। তবে আমার জানা মতে অ্যানাটমি বিভাগে যারা ডোম হিসেবে কাজ করে তারা কোন বডি কাটাছেড়া করার পর প্রসেসিং করে থাকে।  সাধারণত হাড় তো নষ্ট হয় না সহজে, যার ফলে তারা এটা সংগ্রহ করে ও পরে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে দেয়।

এটার মেইন উৎস হচ্ছে  ওই বিভাগে যেসব বেওয়ারিশ লাশ থাকে তাদের শরীর নষ্ট হওয়ার পর এটা সংগ্রহ করা হয়। যেহেতু বাইরের বাজার অবৈধ তাই শিক্ষার্থীরা সাধারণত ডোমদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করে থাকে। 

তিনটি উপায়ে কংকাল পাওয়া যায় বলে এমন মন্তব্য করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বলেন,  যদি কেউ দেহ দান করেন। সাধারণত তাদের উদ্দেশ্য থাকে তাদের দেহ থেকে পরবর্তীতে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা যেন কিছু জানতে পারে। তবে এটার সংখ্যা খুবই নগণ্য।

দ্বিতীয়ত, যিনি পাস করে বের হয়ে যান, তিনি তার ব্যবহৃত কঙ্কালটি জুনিয়রদের দিয়ে যান। এটাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

তৃতীয়ত, হচ্ছে যাদের এই দুইটার কোনো মাধ্যম নেই তারা বাইরে থেকে কিনে নিয়ে আসেন।   

এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অ্যানাটমি বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘এক সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকার কারণে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের অ্যানাটমি বিভাগ থেকে ডোমের মাধ্যমে সংগ্রহ করা কঙ্কাল বণ্টন করা হতো।

এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই অনৈতিকভাবে কবর থেকে মৃতদেহ সংগ্রহ করে বাসায় বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করে মাংস পচিয়ে তা থেকে হাড় বা কঙ্কাল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে।

  এ বিষয়ে এক মেডিকেল শিক্ষার্থীর কাছ এক গুরুত্বপূর্ণ এক তথ্য জানা যায় যে, কংকাল বিক্রির জন্য ফেসবুকে এমন একটা পেইজ আছে। যেটা সাধারণত মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র ছাত্ররা মেইনটেইন করে থাকে। সেখানে কঙ্কাল বিক্রির জন্য পোস্ট দেয়া হয়। ওখানে ৩৫-৪০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। 

বাংলাদেশ মেডিক্যালের সহকারী রেজিস্ট্রার সুদেষ্ণা চক্রবর্তী পুর্বা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কংকাল সমস্যা নিয়ে বলেন, আসলে কংকাল যে কোথা থেকে আনা হয় এটা নিয়ে আমার তখন তেমন আগ্রহ কাজ করেনি। তবে এটা ঠিক যে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য এটা সবাইকেই কিনতে হয়। সবাই একটা সেট করে কিনে থাকে। তবে অনেকেই শেয়ার করে কিনে থাকে। তবে সেক্ষেত্রে যারা একই রুমে বা হোস্টেলে থাকা তারা এটা করে থাকে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের ব্যাচে ১১৫ জনের প্রায় সবার কাছেই কঙ্কাল ছিল। ফুল সেট কঙ্কালে ভাটিব্রা তো একটা করেই থাকে, মাথা একটাই থাকবে এটা তো ডিভাইডেড করা সম্ভব হবে না তাই এটা শেয়ার করে পড়া সম্ভব না। সেক্ষেত্রে রুমমেট বা স্টাডি পার্টনার না হলে সেটা সম্ভব হবে না।  সাধারণত একটি কঙ্কাল সঠিক উপায়ে পরিচর্যা করলে তা ৪০-৫০ বছর পর্যন্ত ঠিক থাকে। 

পুর্বা বলেন, পাউডার দিলে হাড়গুলো ঠিক থাকে। কঙ্কালের জন্য তেলাপোকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর যার জন্য এমন স্থানে রাখতে হবে যাতে তেলাপোকা হাড়গুলো নষ্ট করতে না পারে।  ‘কলেজে ব্যবহারের উপর নির্ভর করে যে কতদিন আপনি আপনার ব্যবহৃত কঙ্কাল ঠিক রাখতে পারবেন। আমি যেটি ব্যবহার করেছিলাম সেটা আমার কাছে যখন আসে তার আগে আরও তিন জন ব্যবহার করেছে। যেহেতু একটা নির্দিষ্ট সময় পর এটার কোন কাজ থাকে না তাই অনেকেই একটি কঙ্কাল দিয়ে মেডিক্যাল জীবন পার করে দিতে পারবে ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে আরও জানা যায়, মরোণত্তর দেহদান আগের চেয়ে বাড়লেও সেটি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে শিক্ষার কাজে চাহিদার তুলনায় কম। অথচ আগের তুলনায় দেশে মেডিক্যাল কলেজসহ চিকিৎসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের কঙ্কাল প্রয়োজন হয়। ফলে প্রথম বর্ষে ভর্তির পর কঙ্কালের চাহিদা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। 

অভিযোগ আছে, মেডিক্যাল কলেজগুলোর কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থী, অফিস সহকারী ও সরকারি মেডিক্যালের ডোমরা মানবকঙ্কাল বাণিজ্যে জড়িত। মেডিক্যাল কলেজ, কবরস্থানকেন্দ্রিক চক্র দেশে-বিদেশে কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

মেডিক্যাল শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা মনে করেন, মানবকঙ্কালের চাহিদার কথা বিবেচনা করে এসংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বিকল্প ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাহলে বিভিন্ন ধরনের ডিলার-সিন্ডিকেট থাকবে না। অন্যথায় এই চক্রগুলো দিন দিন বাড়তেই থাকবে।   

উল্লেখ্য,  শুধু বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশের ৯ জেলায় ১৫৯টি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে।  গত ১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে ১২টি মানুষের মাথার খুলি ও শরীরের নানা অংশের দুই বস্তা হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়।  কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ তালুকদার জানান, প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করছেন, এসব খুলি ও হাড়গোড় ভারত ও নেপালে পাচার করা হতো।

সাধারণত মেডিক্যাল কলেজগুলোতে এসব হাড় শিক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়।  ২০১৮ সালে ময়মনসিংহে একটি চক্র ধরা পড়ে একই উপজেলায়।

সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা কবর থেকে অবৈধভাবে মরদেহ উত্তোলন এবং হাসপাতালের বেওয়ারিশ লাশগুলো অবৈধ উপায়ে খালাস করার মাধ্যমে কঙ্কাল সংগ্রহ করে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ