• 0
  • 0
SB Meraz
Posted at 03/01/2021 10:22:am

চালকল মালিকদের সাথে পেরে উঠছে না সরকার নিজেও

চালকল মালিকদের সাথে পেরে উঠছে না সরকার নিজেও

দেশে চালের বাজারে এখন চালকল মালিকদের রাজত্ব। এদের কারণে সরকার কোনভাবেই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সরকার এর নির্দেশ, অনুরোধ এর তোয়াক্কা না করেই বাড়িয়ে চলেছেন চালের দাম। বাজার ঘুরে জানা গেছে, চালের দাম সহনীয় মাত্রায় আনতে দেরি হলেও আমদানি করা চালের শুল্ক কমিয়েছে সরকার। কিন্তু গত এক সপ্তাহে এর কোন প্রভাব তো পড়েইনি উল্টো দাম বেড়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ১টি প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক সপ্তাহে (২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর) চিকন চালের দাম ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের পাইজাম ও লতাশাইলের দাম ১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৫৩ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এই দাম বাড়ার আগের দিন ২৭ ডিসেম্বর আমদানি শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছিল।

রাজধানীর কোনাপাড়া বাজার, কাওরানবাজার, বাদামতলী বাজার, সূত্রাপুর সহ ঢাকার উল্লেখযোগ্য বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে এ সব তথ্য পাওয়া গেছে। এখানকার চাল ব্যবসায়ীরা বলেন, মিলারদের কারণেই চালের দাম বেড়েছে। এ নিয়ে সন্দেহ নেই। সরকারের মন্ত্রী হতে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এর মধ্যেই জিটুজি পদ্ধতিতে আমদানি করা ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল ১৯ ডিসেম্বর ভারত থেকে বন্দরে পৌঁছে গেছে। আগামী এক মাসের মধ্যে আরও এক লাখ টন চাল একইভাবে ভারত থেকে আসবে বলে কথা রয়েছে। পরিকল্পনা রয়েছে ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশ থেকে চাল আমদানি করে মজুদ বাড়ানো হবে। সেইসব চাল সরকারে ভিন্ন ভিন্ন পকর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাজারে সরবরাহ করা হবে। এভাবে চালের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পরতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের হিসাবে আমনের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। তারপরও কেন বাড়লচালের দাম? সে প্রশ্নের জবাবে সরকারে দেওয়া ভুল তথ্য দিয়েছেন বলে দাবী করছেন মিলাররা।

মিলাররা জানান, ২০২০ সালে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় দাবি করলেও এ তথ্য ঠিক নয়। তারা বলেন, ২০২০ সালে বন্যায় পানিতে ভেসে আসা পলির কারণে ধানের গাছ উর্বর হলেও উৎপাদন কম হয়েছে। প্রতি একরে ৪০ মণ ধান হওয়ার কথা থাকলেও এবছর ২৫ থেকে ২৬ মণের বেশি উৎপাদন হয়নি। এ কারণেই চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ হচ্ছে না। সম্প্রতি ধানের দাম অতীতের অনেক বছরের তুলনায় বেশি। দেশের বিভিন্ন বাজারে প্রতিমণ ধান বিক্রি হয়েছে ১২২০ টাকা দরে। যা আগে কখনও হয়নি।

এ বিষয়ে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, মিলারদের কারসাজিতেই বাড়ছে চালের দাম। চালকল মালিকরা নানান কারসাজি করে বাজারে চালের দাম বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, চাল উৎপাদনে যে ঘাটতি হয়েছে তা মেটানোর জন্য সরকার ৫ থেকে ৬ লাখ টন চাল আমদানি করবে। সরকারি গুদামেও চাল কমে গেছে। গত বছর এই সময়ে সরকারি গুদামগুলোয় ১৩ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য থাকলেও এবার তা কমে ৭ লাখ টনে নেমেছে।

কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের মিলার, আড়তদার, জোতদারদের যারা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তারা দাম বাড়ায়। এবারও তারা সেই কাজ করছে। এই মৌসুমের সময় এখনও তারা ধান কিনছে। ধানের দাম ও চালের দাম দুটিই তারা বাড়িয়ে দিয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী জানান, চলতি বছর দুই দফা বন্যার কারণে আউশ ও আমন ফলনের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে উৎপাদনের যে পরিসংখ্যান সরকারের হাতে আছে, তাতে চালের এত ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। এখনও বাজারে যথেষ্ট চাল আছে। তবু ৩২ থেকে ৩৩ টাকার মোটা চাল ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে চালকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, ধানের দাম বেশি, তাই চালের দাম বেড়েছে। ধানের দাম বাড়লে কেউ কৃষককে দায়ী করে না, কিন্তু ওই কারণে চলের দাম বাড়লে সবাই মিলারদের দোষ দেয়।

তিনি আরও যোগ করেন, মন্ত্রীরা বলছেন গুদামে চাল নাই। উৎপাদনও কম হয়েছে। চাল আমদানি করা হচ্ছে সেই কারণে। আমরা বার বার এ তথ্য জানাতে চাইলেও কেউ শোনেনি। উল্টো আমাদের দায়ী করা হয়েছে গুজব ছড়ানোর জন্য। এ বছর আমন ফলন ভালো হয়নি জেনেও সেটা জানায়নি সরকারের কেউ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সরকারের শীর্ষমহলকে এ বিষয়ে অন্ধকারে রেখেছে। আগেভাগে জানালে আগেভাগে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। তখন এমন পরিস্থিতি হতো না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং টিসিবির তথ্যানুযায়ী, বিগত এক দশকে (২০১০-১১ অর্থবছর) মাঝারি মানের চালের গড় দাম ছিল কেজি প্রতি ৪১ টাকা, যা এখন্ন হয়েছে কেজিপ্রতি ৬০ টাকা। গত অর্থবছরেও (২০১৯-২০) প্রতি কেজি চালের গড় দাম ছিল ৫৬ টাকা।

দেখা গেছে, গত এক দশকের মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আগ পর্যন্ত চালের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৪৬ টাকা। এরপর হঠাৎ করেই পরের বছর চালের দাম ৫৩ টাকায় ওঠে। পরে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দাম এক টাকা কমলেও এরপর দাম বাড়তেই থাকে।

তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর পরবর্তী বছরগুলোতে চালের দাম ছিল যথাক্রমে ৫৩ টাকা, ৫৫ টাকা, ৫৭ টাকা ও ৫৬ টাকা। এদিকে কৃষি অধিদফতরের তথ্যমতে এক দশক আগেও দেশে চালের উৎপাদন ছিল তিন কোটি ৩৫ লাখ টন। যা এখন (২০১৯-২০ অর্থবছর) তিন কোটি ৮৭ লাখ টনে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর প্রতিবছর চালের উৎপাদন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টন করে বেড়েছে।



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ