Sk Shakil Ahmed
প্রকাশ ০২/০১/২০২১ ০২:০৬এ এম

ভয়ঙ্কর সুন্দর সুন্দরবন

ভয়ঙ্কর সুন্দর সুন্দরবন Ad Banner

বাংলাদেশের খুলনা বিভাগ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এই দুটো জেলা নিয়ে বিস্তৃত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। সুন্দরবনের মোট আয়তনের প্রায় ৬০ ভাগ বা ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মতো এলাকা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শতকরা ৪০ ভাগ বা ৪ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মতো ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন।

জমি মাপজোকের প্রচলিত এককের হিসেবে এই সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ২৫ লাখ একর। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমির আয়তন হলো মাত্র ৩ হাজার একরেরও রকম।

ভৌগোলিকভাবে এই সুন্দরবনের সীমানা দুটো নদী দিয়ে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। পূর্ব দিকে ভারতের হুগলি নদী এবং পশ্চিম দিকে বাংলাদেশের বলেশ্বর নদ। এই দুটো জলধারার মধ্যবর্তী ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের আনুষ্ঠানিক নাম সুন্দরবন। এ বনাঞ্চলটি নামকরণ নিয়ে একাধিক মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সমর্থনপুষ্ট মতবাদ অনুযায়ী সুন্দরী নামক এই বনের এক ধরনের গাছের নাম অনুসারে এই বনের নাম রাখা হয়েছে সুন্দরবন। 

তবে এর বিপরীতে কেউ কেউ বলেন সমুদ্রবন অথবা চন্দ্রবন নামটি অপভ্রংশের কারণে সুন্দরবন এ পরিণত হয়েছে। উত্তরের হিমালয় পর্বত থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা এই তিনটি জলধারার মোহনা এই সুন্দরবন এলাকায় অবস্থিত।

এই সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে থেকে মানুষের বসতি থাকলেও তা ইতিহাসে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১ হাজার ৮০০ বছর আগে এখানে চাঁদ সওদাগর নামক এক ব্যক্তি এখানে একটি জনপদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সুন্দরবনের বাগমারা এলাকায় এই চাঁদ সওদাগরের হাতে গোড়াপত্তন হওয়া একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন। এরপর এক হাজার বছরের বেশি সময় ইতিহাসের পাতায় এই বনাঞ্চলের কথা উল্লেখ করা হয়নি। অবশেষে ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুঘল শাসনামলে আবার এই সুন্দরবনের কথা বলা হয়েছে।

বিশেষ করে মুঘল রাজবংশের তৃতীয় সম্রাট আকবরের শাসন আমলে তার সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে স্থানীয় অনেকেই গহীন সুন্দরবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পলাতক এই মানুষগুলো তৈরি করা বাসস্থানগুলো সপ্তদশ শতকের পর্তুগীজ জলদস্যুদের দখলে চলে যায়। এই আস্তানা থেকে তারা নিয়মিত মুঘল ভারতের বিভিন্ন জনপদে হামলা চালাতো। এখনো অনেক মানুষ সুন্দরবন ও এর তত্ত্বসংলগ্ন  এলাকায় বসবাস করে। এদের একটা বড় অংশের জীবিকা সংগ্রহের একমাত্র উপায় মাছ শিকার৷ এর পাশাপাশি কিছু সম্প্রদায়ের মানুষ বছরের প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে সুন্দরবন থেকে মৌমাছির মধু আহরণে ব্যস্ত থাকেন। 

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবে সর্বপ্রথম যে প্রাণীটির কথা বলতে হবে সেটা হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আক্ষরিক অর্থে রাজসিক এই প্রাণীটি তার গায়ে হলুদের ওপরে কালো ডোরাকাটা চিহ্নটি জন্য বিখ্যাত। এই প্রজাতির পূর্ণবয়স্ক পুরুষ সদস্যদের নাক থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত গড় দৈঘ্য প্রায় ১০ ফুট। তবে এর মধ্যে লেজের দৈঘ্যই প্রায় ৩ ফুটের মতো। এদের গড় ওজর ২০০ থেকে ২৫০ কেজির মতো হয়ে থাকে। তবে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় বাঘটির ওজন ছিলো পুরো ৩৭৫ কেজি। প্রকৃতিতে এই প্রাণীগুলোর নিভৃতচারী হয়ে থাকে। এরা বন্যশূকর, হরিণ এবং মহিষের মত প্রাণী শিকার করে জীবন ধারণ করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় ২৫০০ এর মতো রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। এর মাত্র শতকরা ১০ ভাগই সুন্দরবনে বাস করে।

রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পাশাপাশি সুন্দরবনের বাসিন্দা বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রেসার্স বাদর, চিত্রা হরিণ, ধুসর মাথা মেছো ঈগল, নীল মাছরাঙা, নোনা পানির কুমির এবং করাত মাছ উল্লেখ যোগ্য। এছাড়া ইরাবতী ডলফিন নামক এক প্রজাতির জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিতো নদী নালায় বসবাস করে৷ তবে নদী দূষণের কারণে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। বাঘের মতো এই বনে বসবাসকারী অনন্য সুন্দর চিত্রা হরিণের অস্তিত্বও হুমকির মুখে রয়েছে। এক সময় পুরো সুন্দরবনে কয়েক লাখ হরিণ বিচরণ করে বেড়ালেও বর্তমান মাত্র ত্রিশ হাজারে নেমে এসেছে। আর এই বনাঞ্চল থেকে এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীর তালিকায় রয়েছে জাভান রাইনোসারস নামক এক প্রজাতির গণ্ডার৷

উদ্বেগের বিষয় হলো ক্রমেই সুন্দরবনের আয়েতন সংকুচিত হচ্ছে৷ ২০০ বছর আগেও ব্রিটিশদের প্রচালিতো সার্ভে অনুযায়ী এই বনাঞ্চলের আয়তন ছিলো প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার বা ৪২ লাখ একরেরও বেশি। এই সংকোচন এর পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মানব আগ্রাশনের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগেরও হাত রয়েছে। বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। আর কয়েক বছর পরপরই একেকটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এই এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে যায়।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৭ সালের সিডরের আঘাতে সুন্দরবনের শতকরা ৪০ ভাগ উজার হয়ে যায়। সেই ক্ষতির মাত্র পুরোপুরি সেরা ওঠার আগে ২০০৯ সালে ফের আঘাত হানে আইলা নামক একটি ঘূর্ণিঝড়। ওই ঝড়েও সুন্দরবনে বিদ্যমান জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়৷ প্রাকৃতিক কারণের মতো সুন্দরবন ধ্বংসের মানবসৃষ্ট কারণও অনেক। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি।  ২০০৭ সালের ইউনেস্কো পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্যারিস জলবায়ু চুক্তির শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ হলে এই শতকের শেষ নাগাদ বঙ্গোপসাগরের গড় উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট বেড়ে যাবার সম্ভবনা রয়েছে। তেমনটা হলে সুন্দরবনের শতকরা ৭৫ ভাগই হারিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

এছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিতো একধিক জলধারাগুলো নৌপথ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।  যার ধারাবাহিকতায় পণ্যবাহী জাহাজগুলোও দূর্ঘটনার মুখে পড়ে। ২০১৪ সালে এই বনের শেলা নদীতে সাউথ এণ্ড স্টার সেভেন নামক একটি পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে গিয়েছিলো৷ দূর্ঘটনার সময় জাহাজটিতে সাড়ে তিন লাখ লিটারের বেশি ফার্নেস ওয়েল ছিলো। দূর্ঘটনার পর সেই জ্বালানি তেল প্রায় সাড়ে ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়৷ তবে আশার কথা হলো রয়েল বেঙ্গল টইগারের কারণে সুন্দরবন সংরক্ষণের প্রতি স্থানীয় মানুষের আগ্রহ রয়েছে।

বাংলাদেশ এবং ভারত এই রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে তাদের জাতীয় প্রাণীর মর্যাদা দিয়েছে। তাই আশা করা যায় জাতীয় প্রাণী ও তার বাসস্থান বাঁচাতে দুটো দেশই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে৷ আর তাদের সম্মিলিতো চেষ্টার ফলে অনন্য এই বনাঞ্চলটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে এমনটাই আশা বিশ্ববাসীর। 



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ