• 0
  • 0
Masum Billah
Posted at 30/11/2020 09:04:am

শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ দশা! কি হতে যাচেছ সামনে?

শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ দশা! কি হতে যাচেছ সামনে?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজিত অবস্থার অবসান কবে হবে কেউ জানেনা। কতদিন আর চলবে এভাবে? অনেকেরই ধারণা ছিল যে, রমযানের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার মতো অবস্থায় পৌঁছাবে কিন্তু রমযান, কোরবাণী গেল, বছরও প্রায় শেষের দিকে কিন্তু প্রতিষ্ঠান খুলে দেওযার মতো কোন ইঙ্গিত বুঝা যাচেছনা। লার্ণিং লস থেকে শুরু করে মানসিক ও সামাজিক যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোর কোন বিকল্প বা অর্থনৈতিক হিসেব করা বেশ কঠিনই বটে। ইউনেস্কোর রিপোর্ট বলছে বাংলাদেশে প্রায় ৪০ মিলিয়ন শিক্ষার্থী যার মধ্যে ১৭.৩৩মিলিয়ন প্রাথমিক, ১৫.৮৬মিলিয়ন মাধ্যমিক আর ৩.১৫ মিলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়া করে। তার মানে হচেছ দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ  জনসংখ্যাই শিক্ষার্থী। তারা করেনার এই দীর্ঘ বন্ধে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে  আগামী দিনের দুশ্চিন্তায় মানসিক চাপে সুদিনে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। একদিকে জীবনাশঙ্কা অন্যদিকে পারিবারিক অসচ্ছলতা  ও মানসিক অশান্তি তাদের জীবনকে নাজেহাল করে ফেলেছে।     

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা হচেছনা।শিক্ষার্থীদের শিখণফল বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়ণ করা হবে।৩০দিনের মধ্যে শেষ করা যায় এমন সিলেবাস নির্ধারণ করা  হয়েছে যা শীঘ্রই সংশ্লিষ্টপ প্রধান শিক্ষকদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিষয়গুলোর ওপর ফিডব্যাক পেয়ে যাবেন।সনাতন পদ্ধতিতে মুল্যায়নের প্রধান অংশ ছিল বার্ষিক পরীক্ষা , ষান্মাসিক পরীক্ষা। মুল্যায়ন বলতে আমরা এই প্রান্তিক পরীক্ষাই বুঝি।তারপর পাবলিক পরীক্ষা। সেটিও কিন্তু এক ধরনের প্রান্তিক পরীক্ষা, এককালীন পরীক্ষা, সামেটিভ অ্যাসেসমেন্ট।’ অ্যাসাইনমেন্ট’ বা বাড়ীর কাজ বা নিজের ইচেছমতো একটি বিষয়টিকে প্রকাশ করার যে রীতি, সেটি ইনফরমালই থেকে গেছে, কখনও ফরমাল পর্যায়ে আসেনি অন্তত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচচ মাধ্যমিক পর্যায়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটু আধটু চর্চা কোন কোন শিক্ষকের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, কোন কোন বিভাগে হয়ে থাকে। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢালাওভাবে এখনও সে রকম প্রচলন হয়নি অ্যাসইনমেন্ট প্রথার মাধ্যমে শিক্ষার্থী মুল্যায়ণ।তাই এটির গুরুত্ব এখনও সে পর্যায়ে পৌঁছায় নি। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা প্রশিক্ষনে, শিক্ষা প্রশাসনে বলা হয় কিন্তু  যৌক্তিক কিছু কারণে এটি সেভাবে চালু করা যায় নি কোন পর্যায়ে। দু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিচিছন্নভাবে হযতো কোথাও কিছুটা করছে কিন্তু অন্যত্র সেভাবে এটির প্রচলন হয়নি। কিন্তু করোনাকালে এটি যেন আমাদের বাধ্য হয়েই করতে হচেছ। সরকার থেকে বলা হচেছ অটো প্রমোশন দিতে, বিদ্যালযে শিক্ষার্থীদের যেভাবে বা যতটুকু পর্যবেক্ষন করা হয় তার ওপর এখন ক্লাস টেস্ট কিংবা মাসিক পরীক্ষার স্কোরকে এক্ষেত্রে ধরে নিয়ে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই অটোপাসের ফলে যারা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কাজের সাথে সেভাবে জড়িত ছিল না তারা এবং যেসব প্রতিষ্ঠান এই দৌড়ে সবার পেছনের থাকতো তাদের জন্য যেন পোয়াবারো হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন যে, কল কারখানা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় কেন? অন্তত অর্ধেক করে শিক্ষার্থী যদি ক্লাসে আসত তাহলে তো তাদের মধ্যে হতাশা ও মানসিক কষ্ট অনেকটাই কমে যেত।বিকল্প পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া যেত বলে তারা মন্তব্য করেছেন।     

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটির মেয়াদ ১৯ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত বাড়ানো হলো। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে  পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে খোলা যায় কিনা সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছিল কিন্তু খোলা সম্ভব হয়নি।অনার্স ও কারিগরিতে শিক্ষার্থী কম থাকায় তাদের পরীক্ষা সরাসরি নেওয়া যায় কিনা সেটি ভেবে দেখছে মন্ত্রণালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের কেউ দাবি করছেন অটোপাস। কেউ আবার এর বিরোধিতাও করছেন, আবার কেউ বলছেন আগের তিন বছরের পরীক্ষার ফল গড় করে নম্বর দিয়ে তাদের ফল প্রকাশ করতে। পরীক্ষা ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল প্রকাশ না করার কথা মন্ত্রী বলেন।আমরা মাননীয় মন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। করোনা ভাইরাসের সংকটের মুখে দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষামুলক কার্যক্রম ব্যাহত হচেছ। বাতিল হয়েছে এইচ এস সি ২০২০ সালের পরীক্ষা। সবাইকে অটোপাস দেওয়ার ঘোষাণা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা, মাধ্যমিকের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে না, সবাইকে অটোপাস দেওয়া হয়েছে।     

তবে, আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষা হয়তো পেছাতে হবে বলে শিক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন। কারণ এসএসসি পরীক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করার সুযোগ পেয়েছে । তারপরে যে ঘাটতে থেকে যাচেছ তা বিশেষ পরিচর্যার মাধ্যমে পূরণের কথা বলা হয়েছে। তবে, শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাদের স্বাস্থ সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। তারা প্রাক নির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষা দিতে পারোনি এই স্বাস্থ্যে সুরক্ষার কথা চিন্তা করেই। 

অটোপ্রমোশনের মাধ্যমে উচচ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ কাটালেও ভর্তি পরীক্ষায় তো এমনটা করা যাবে না। কি হবে সেখানে? এ নিযে উদ্বিগন্ সংশ্লিষ্ট সবাই। আলোচনা চলছে যে, অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা হতে পারে কিন্তু সেটি কি ধরনের ফল নিয়ে আসবে কারণ নেটওয়ার্কিং ও ডিভাইসের যে অবস্থা তাতে এটি কতটা সফল হবে। ডিজিটাল বিভাজন তো তাতে আরো প্রকটভাবে বেড়ে যাবে।  তবে, এই ধরনের  জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও মানসিক সংকটের মধ্যেও দেশে অমানবিক, কার্যাবলী থেমে নেই। কোটি কোটি টাকা লুটেরা লুট করে বিদেশে পাচার করছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষন চলছে, শক্তিশালীদের শক্তি প্রদর্শন চলছে রাস্তায় হাটে, বাজারে দোকানে, পরিবহনে, দ্রব্যমুলের লাগামহীন ও কারণহীন উর্ধ্বগতি কেউ ফিরিয়ে রাখতে পারছেনা কারন শক্তিশালী ও ক্ষমতাশালীরাই এর সাথে জড়িত। এই সমাজ ব্যবস্থায় কি শিখছে আর কি দেখছে আমরা ভবিষ্যত প্রজন্ম? তারাতো এখন পড়াশুনা, বিদালয়, কোচিং নিয়ে ব্যস্ত নেই। তাদের অস্থির মনে এখন গভীরভাবে পর্যবক্ষেন করছে সমাজের সব অনাচার, অবিচার, অমানবিকতা। এগুলো সবাই শিক্ষার্থীদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করছে। 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হচেছ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সমাজকেই বাাঁচিয়ে রাখতে হবে এগুলোকে। পারস্পরিক বোঝাপাড়ার মধ্যে দিয়ে চলবে এসব প্রতিষ্ঠান। করোনাকাল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক মহাসংকট ডেকে এনেছে। যেখানে বিদ্যালয় শক্তিশালী তারা অভিভাবকদের বাধ্য করছে টিউশন ফি চাপ দিয়ে আদায় করার, আবার যেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল সেখানে অভিভাবকগন আন্দোলন করছেন, বিদ্যালয়কে চাপ দিচেছন যাতে কোন ধরনের ফি চাওয়া না হয়। এই অনড় ও বিপরীতমুখী অবস্থা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংস ডেকে আনবে যা সামস্টিকভাবে আমাদের মানবিক বিপর্যয় ঘটাবে। তাই, সরকারের মধ্যস্থতায় একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, ঘোষনা দিতে হবে যাতে উভয় পক্ষই বেঁচে থাকতে পারে।  শিক্ষক  কমচারীরা যদি সাত আটমাস পর্যন্ত বেতন না পান তাহলে তারা সংসার চালাবেন কিভাবে? একজন অভিভাবককে হয়তো তিন চারশো টাকা দিতে হবে, তাতে তাদের খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তাদের চিন্তা করতে হবে যাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বেঁচে থাকে। দেশের বেসরকারি ব্যবস্থায়ইতো চলছে শিক্ষার বৃহত্তম অংশ। 

এসব কিছুর বিবেচনায় বলা যায় যে,  শিক্ষা ব্যবস্থার চলছে করুণ দশা। সবই অনুমাননির্ভর, কেউ কিছু জানছেনা কি হতে যাচেছ সামনে? শিক্ষার্থীরা  বুঝে উঠতে পারছেনা সামনের দিনগুলো তাদের জন্য কতটা সুখকর। এ বছরটি তো গেল উদ্বেগ উৎকন্ঠা, অপেক্ষা আর মানসিক অশান্তির মধ্যে দিয়ে। ।প্রতিনিয়ত আশঙ্কা, ভয় আর অনিশ্চয়তা আচছন্ন করে রেখেছিল শিক্ষার্থীদের জীবন। মানুষ আশা নিয়ে বেঁচে থাকে। আমরা সবাই শিক্ষা ব্যবস্থার, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুদিনের অপেক্ষায় সামনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ