Saturday -
  • 0
মাহবুব রানা
Posted at 25/11/2020 05:32:pm

ভালোবাসার প্রতিদান তানিয়া সুলতানা হ্যাপি

ভালোবাসার প্রতিদান তানিয়া সুলতানা হ্যাপি

রোজ সকালে আম্মা কে দেখতাম আমাদের জন্য সকাল আর দুপুরের খাবার একসাথে রান্না করে অফিস যেতেন। আম্মা সরকারি চাকুরী করতেন, তাই দুপুরে রান্নার কোন সুযোগ ছিল না। আবার বিকালে অফিস থেকে ফিরতো হন্তদন্ত হয়ে। কেননা তিনি আমাদের কতক্ষণ দেখেন না, স্কুল থেকে ফিরে আমরা খাবার ঠিকমতো খেয়েছি কি না! আরো কতো চিন্তা!

এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আম্মা আবার রাতের খাবার রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আম্মা সরকারি ছুটির দিনে ও কোন সামাজিক আনুষ্ঠানিকতায় কিংবা আত্নীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতে চাইতেন না যদি আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না থাকতো।

ইদানীং আমিও আম্মার মতো হতে চলেছি। না, আম্মার মতো আমার সংসার নেই, ছেলেমেয়ে নেই। তবুও আমার ছোট্ট একটা বাসা আছে। বাসার বারান্দায় সকাল বিকেল ছুটে আসে বেশ কিছু পাখি। আমার মনে হয় ওরা শুধু পাখি নয়, ঈশ্বরের দূত! ওরা আমার সন্তান, আমার সংসার। আজকাল ওদের রেখে বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না, ওদের কিচিরমিচির আওয়াজ আমাকে বিমোহিত করে, মাতিয়ে রাখে। ওরা আমাকে এতটাই বোঝে যে আমি যদি কোনরকম মানসিকভাবে খারাপ থাকি তবে ওরা এতো আস্তে আস্তে আওয়াজ করে যাতে আমি বিরক্ত না হই , আবার ওরা সুযোগ বুঝে এমন কিছু একটা করবে, যা দেখে বা শুনে আমার মনটা ভালো হয়ে যাবেই। ভীষন্নতা কাটিয়ে এক গাল হেসে উঠি। ওরা আমার বিরাট এক টনিক বটে!

কিছুদিন আগে আমার এক সাংবাদিক বান্ধবীর সাথে দেখা। তার একটি কন্যা সন্তান আছে। কোথাও গেলে, সে আগে শুনে তার কন্যাকে নিয়ে যেতে পারবে কি না? সুযোগ না থাকলে সে সাধারণত সেসব প্রোগ্রামগুলো এভয়েড করে। ঐ যে, কন্যাকে চোখের আড়াল করতে চায় না! আমার বান্ধবী আরো জানালো ওর কন্যা ওর কাছে এক বিশেষ টনিক। প্রতিটি মুহুর্ত কন্যার কাছ থেকে আধো আধো কথায় টনিক খুঁজে পায় সে। বেঁচে থাকার টনিক, প্রফুল্ল থাকার টনিক, এগিয়ে চলার টনিক।

যেমনটা আমি পাই চড়ুই-শালিকদের থেকে। ওরা আমাকে বাঁচিয়েছে ভীষণ করে। প্যানডেমিক সিচুয়েশনের শুরু থেকেই আমি একটা ফ্ল্যাটে জীবনটা বেঁধে ফেলেছি। কাজকর্ম স্থবির থাকায় তেমন বাইরে যাওয়া হয় না । তবুও আমি আর আমার পাখিরা খেয়ে পড়ে ভালোই আছি।

আমি আগে তিনবেলা ভাত খেতাম। পরিমাণে ছ'মুটো। যেহেতু পরিশ্রম কম করতে হয়, তাই খাবার টা পরিমাণে কমিয়ে দিয়েছি। আমি এখন দিনে তিনমুটো চালের ভাত খাই। আর আমার পাখিদেরও তিনমুটো চাল ছিটিয়ে দেই তাদের খাবারের জন্য। অর্থাৎ আমি আর আমার পাখিরা খাই পরিমাণে সমানে সমান ।

জ্ঞানী গুনীজনেরা বলেন- তুমি যেমন কাজ করবে প্রতিদানে তুমি তাই পাবে, আজ হোক কিংবা কাল। আমি সাধারণত রাত ১১ টায় ঘুমাই। উঠি ভোরে। কতদিন যে শুধু পাখিদের ডাকেই ফজরের নামাজ পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। মুয়াজ্জিনের ফজরের আযান কানে না পৌঁছলে পাখিরা এসে বারান্দায় এমন আওয়াজ করে, যেন ওরা আমাকে বিছানা ছেড়ে উঠতে বাধ্য করবেই।

আজকাল বেশ শীত পড়ছে। আর আমিও ঘুম থেকে উঠি ভোর চারটে - সাড়ে চারটে বাজে, তখন। রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে চেষ্টা করি। ফজরের নামাজ পড়ে আলো ফোঁটার আগেই পাখিদের খাবার দিয়ে, পানি দিয়ে, দানবাক্সে সাধ্যমতো দান করে আবার খানিকটা ঘুমাতে যাই। আর পাখিদের বলি আস্তে শব্দ করিও, তোমাদের খাবার দেয়া আছে। আমি ঘুমাবো। ডিস্টার্ব করবা না। ঠিক সেদিন ওরাও লক্ষ্ণিছানার মতো শব্দ করে না। কিন্তু নামাজ না পড়তে উঠলে খাবার দেয়া থাকলেও আওয়াজ করবেই। আবার নামাজে যখন বিরতিকাল চলে তখন ওরা ফজরের ভোরে কিচিরমিচির আওয়াজ করে না। কি করে ওরা এতো বুঝে আমাকে, ভাবতেই ভালো লাগে!

সামান্য পাখিরা আমাকে বুঝতে পারলেও, বুঝাতে পারিনি অনেক আপনজনকে। সে দুঃখ ও আমাকে মাঝে মাঝে খুঁড়ে খুঁড়ে খায়।

আজকাল আম্মার মতো কোথাও গেলে অস্থিরতা কাজ করে পাখিদের জন্য। মনে হয় এই বুঝি বারান্দায় এসে ওরা আমাকে খুঁজছে, মিস করছে, যেমনটা আমি ওদের মিস করছি, আম্মা আমাদের মিস করতো । বাইরে গেলে, বাড়ি গেলে, এ্যামিলের বাসায় গেলে, বাসায় ফেরার ভীষণ তাড়া দেয় পাখিরা। মনে হয় ওরাই আমার আপনজন, অতি আপনজন, আপনের চেয়ে বেশি আপন তোরা!

তোদের মাঝে আমি ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়াই। হে ঈশ্বর তুমিও কি আমাকে দেখতে পাও? আমার খোঁজ রাখো? কেমন করে বেঁচে আছি নির্জন একলা একা তোমার বিশাল রাজ্যে পাখিদের নিয়ে!


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

  • 0