Thursday -
  • 0
  • 0
Masum Billah
Posted at 24/11/2020 04:54:pm

করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিশেষ নজর দিতে হবে

করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিশেষ নজর দিতে হবে

অনিশ্চিত ভবিষ্যত, দিনের পর দিন গৃহে আবদ্ধ থাকা, যার যে কাজ সেগুলো করতে না পারা, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে  সরাসরি যোগাযোগ করতে না পারা,অর্থনৈতিক টানাপড়েন, উন্মুক্ত মাঠে প্রান্তরে ঘুরতে ও খেলতে না পরা, যে কোন সময় মৃত্যু উপস্থিত হওযার আশংকা ও চারদিক থেকে মুত্যুর খবর পাওয়া -- মানসিক রোগ ঘটানোর এ ধরনের সব  উপাদানই  এই করোনাকালে উপস্থিত। চারদিক থেকে অবিরত আসতে থাকা দু:সংবাদগুলো মানুষকে অস্থির করে তুলছে। এর ফলে যাদের এনজাইট এবং অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা ওসিডির মতো মানসিক সমস্যা রয়েছে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যাচেছ। তাই এই সময়ে শারীরিক স্বাস্থ্যের সাথে সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও সবার নজর দিতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাই বলছে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ প্রচেষ্টা, এর দ্রুত বিস্তার, লকডাইন, হোম কোয়ারেন্টাইন, মানুষের মৃত্য সংবাদ টিভির পর্দায় দেখে এবং পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পড়ে কোটি কোটি মানুষের মনে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, ভয় যা তাদেরকে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করার পায়তারা করছে। মানসিক স্বাস্থ্যে বিষয়ক দাতব্য প্রতিষ্ঠান ’ মাইন্ড-এর মুখপাত্র রোজী ওয়েদারলি বলেছেন, ” অজানা যে কোন কিছুর ব্যাপারে দুর্ভাবনা এবং কিছু একটা ঘটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকা- এ দুটো এই সমস্যার মূলে।

করোনভাইরাসের ক্ষেত্রে এটিই একটি বিরাট আকার নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত  হয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ বলছে করোনাভাইরাসের কারণে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ এখন গৃহবন্দী, তাদের মধ্যে গুরুতর মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।স্বাস্থ্যঝুঁকির এ দিকটি করোনাসৃষ্ট অর্থনতির বিপদকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।  বেলজিয়ামের মনোবিদ এলকে ভ্যান হুফ গৃহবন্দী মানুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওযাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশ্বে লকডাইনে থাকা মানুষের সংখ্যা ২৬০ কোটি। ঘরবন্দী মানুষের সংখ্যার দিকে থেকে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। 

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এ ২৬ ফেব্রæয়ারি প্রকাশিত একটি নিবন্ধের বরাত দিয়ে ভ্যান হুফ  লিখেছেন, গৃহবন্দী মানুষেরা নানা রকম মানসিক চাপ ও অসুস্থতার শিকার হয়ে থাকে। এর মধ্যে আছে মন খারাপ, অনিদ্রা, উদ্বেগ-উত্তেজনা, উৎকন্ঠা, বিভ্রান্তি, বিষন্নতা, রাগ, খিটখিটে মেজাজ, অবসাদ আর বিপর্যয় বা ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপের নানা লক্ষন।

ল্যানসেট-এর নিবন্ধটি বিভিন্ন কোয়ারেনটাইকালীন ২৪টি গবেষণাপত্রের পর্যালোচনা। এগুলোর মধ্যে হাসপাতালের চিকিৎক ও স্বস্থ্যকর্মীদের ওপর একটি গবেষনার কথা আছে। তাতে দেখা যায় সঙ্গনিরোধের  তিন বছর পরও প্রায় দশ শতাংশ কর্মীর উচচ বিষন্নতার লক্ষণ ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা তৈরি করেছে। উহানের হাসাপাতলে আসা রোগীদের একটি গোষ্ঠীর মধ্যে পরিচালিত গবেষনার একটি অপ্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে ৩৪শতাংশের বেশি রোগীর মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা এবং ২৮শতাংশের মধ্যে বিষন্নতা দেখা গিয়েছে। উহানের কেন্দ্রীয় বিবাহ-নিবন্ধন বিভাগের হিসেবে প্রদেশটিতে বিবাহবিচেছদের হার ২৫ শতাংশ বেড়েছে যা তাদের বর্ধিত উদ্বেগ ও উৎকন্ঠারই প্রমান বহন করে। 

ভ্যান হুফ বলছেন কোভিড-১৯ রোগের শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি সামাল দিতে রাষ্টগুলো যত ব্যবস্থা নিচেছ মানসিক বা মনস্তাত্তি¡ক সহায়তার বিষয়টি ততটা মনোযোগ পাচেছনা। লকডাইন উঠে যাওয়ার তিন থেকে ছয়মাসের মধ্যে বিশ^ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে যখন সুস্থ-সমর্থ সব মানুষের সহায়তার প্রয়োজন হবে, এই অবহেলার মূল্য তখন দিতে হবে।  মানুষ যখন আতঙ্ক ও সন্দেহকে মনের মধ্যে প্রশয় দেয় মন তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। নিজস্ব শক্তি ও আত্মবিশ্বাস তখন ধীরে ধীরে তার তেজ হারিয়ে ফেলে। করোনায় আক্রান্তের ভয় ও সন্দেহ নি:সন্দেহে মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে দিচেছ যা পুরো দেহ মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অনেকেই নাকি আতঙ্কে নাকি ঘুমের ওষুধ খাচেছন। কেউ কেউ কঠিন ডোজ খেয়েও ঘুমাতে পারছেন না, এ ধরনের খবর দিচেছন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ’জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ১৯৭৯সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয়। তিনি খুব সহাসী ছিলেন কিন্তু ফাঁসির কথা শুনে তিনিও ভেতরে ভেতরে নাকি মারা যাচিছলেন। যেদিন তার ফাঁসি হওয়ার কথা সেদিন নাকি তিনি  কঠিন ঘুমের বড়ি খেয়ে ফাঁসির দুশ্চি:ন্তা এড়াতে চেয়েছিলেন। তাকে যখন সেল থেকে ফাঁসির মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওযা হচিছল তিনি তখনও ঘুমে, তাকে স্ট্রেচারে করে মঞ্চের নিকট নেয়া হয়। নিরাপত্তারক্ষী ও জল্লাদরা তাকে   বলছিলেন’ আপনি উঠে বসুন, আপনি না বলতেন আমি মৃত্যুকে ভয় পাইনা।’ তখন তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ‘যা করার তাড়াতড়ি করে ফেলুন, আমরা কষ্ট হচেছ।’কারো কারো ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।   

আমাদের কঠিন সময়ের বহি:প্রকাশ হচেছ করোনার এই মহামারীর মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা  নানা ধরনের দুর্ঘটনার খবর। স্পষ্টতই বুঝা যাচেছ,  মানুষ খুব অস্থির হয়ে যাচেছ। সহনশীল আচরণ তার মধ্যে কমে যাচেছ। ক্রমে বাড়ছে হিংস্রতা। আমরা এখন একটা যুদ্ধক্ষেত্রে আছি , এ এক অজানা যুদ্ধ , তাই বিষণ হয়ে উঠছি। পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা আমাদের মানিসক অস্থিরতায় ফেলে দিচেছ। কিন্তু আমাদের ভাল থাকতে হবে, চারপাশের পরিবেশকে ভাল রাখতে হবে। যারা পরিবারের সাথে আছেন তাদের সমস্যা একটু কম কিন্তু যারা একাকী জীবন যাপন করছেন তাদের সমস্যটা এই সময়ে আরও বেশি। তাই প্রতিদিনের লাইফস্টাইল পাল্টাতে হবে। মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার জন্য সকালে পনের থেকে বিশ মিনিট বিছানায় কিংবা মেঝেতে বসে ধ্যান করতে হবে। গল্পের বই পড়তে হবে, কিংবা মোবাইলে ই-ুবক বা সিনেমা বা আনন্দদায়ক ও শিক্ষামূলক কিছু পড়তে হবে, মোট কথা নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে, মনের মধ্যে বিষন্নতাকে ঠাঁই দেয়া যাবে না।সাথে সাথে শারীরিক ব্যায়ামগুলোও করতে হবে। পছন্দের গানগুলো শুনতে হবে, গল্পের বই ও কবিতা পড়তে হবে।

বাড়ির সাথে গাছপালা বা বাগানে সম্ভব হলে সময় কাটাতে হবে। ফেলে আসা জীবনের কিছু ভাল স্মৃতি স্মরণ করতে হবে। নাটক ও  সিনেমা দেখতে হবে, পছন্দের খাবার খেতে হবে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। তাই যতোটা সম্ভব সেগুলো থেকে দুরে থাকতে হবে। 

রাতে ঘুমানের সময় মোবাইল ফোন অফ করে রেখে দিতে হবে। রাতে ঘুম আসতে দেরি হলে বই পড়া শুরু করতে হবে যাতে অটোমেটিক ঘুম এসে যায়। মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন ডি. সাও  নিজে যখন কোন কারণে খুব বেশি দুশ্চিন্তার মাঝে থাকেন তখন তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেন, ’ আমি কি ভালভাবে ঘুমাচিছ? আমি কি পুষ্টিকর খাবার খাচিছ?” তা থেকে বুঝা যায় যে, ঘুম ও পুষ্টিকর খাবারের সাথে মানসিক অস্থিরতা দুরীভূত হওযার একটি চমৎকার যোগসূত্র রয়েছে।     

একমাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারগুলোও। ঘরবন্দি দেশের প্রায় চার কোটি শিশু-কিশোর। এ সময় তাদের একাডেমিক পড়াশোনায় মন বসছে না কারন বিদ্যালয়ে পড়া দিতে হচেছনা, বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত নেই যা তাদের অভ্যাসের অংশ ছিল। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খেলাধুলা, ঘোরাঘুরির আনন্দ থেকেও তারা বঞ্চিত।

তাদের জীবনের হঠাৎ এই ছন্দপতন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে শরীর ও মনের ওপর। এ অবস্থায় তাদের প্রয়োজন আনন্দময় পরিবেশ।মানস বিকাশের গুরুত্বপূর্ন সময় শৈশব-কৈশোর। এ সময়টিই সব কিছু নতুন আলোক নিয়ে উপস্থিত হয়। তাই, এ পর্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। বর্তমান সময়টিতে বেশিরভাগ শিশু-কিশোর খুব যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, হাপিয়ে উঠছে ঘরবন্দি থাকতে থাকতে। 

এ ব্যাপারে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ’ করোনার প্রভাবে সামাজিক বিপত্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে গোটা সমাজেই। সমাজের সব শ্রেণিতেই পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। শিশু-কিশোররাও তার ব্যতিক্রম নয়। ঘরে থাকতে থাকতে তাদের অনেকেই বিরক্তি ও বিমর্ষ হয়ে উঠছে। এ জন্য তাদের আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ”মনোবিদ মোহিত কামাল বলেছেন, ‘শিশ-কিশোরদের সঙ্গে যত বেশি কোয়ালিটি টাইম কাটানো যাবে, তাদের উদ্বেগ তত বেশি কমবে। পাশাপাশি তাদের জন্য ইনডোর গেমের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের হাতে তুলে দিতে হবে শিশু-কিশোর সাহিত্যের বই।” 

আসুন আমরা সবাই কঠিন এই সময়ে শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিই এবং এ ব্যাপারে  আমাদের নিজ নিজ পরিবারের শিশু-কিশোরদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করি।     

মাছুম বিল্লাহ  ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত ভাইস-প্রেসিডেন্ট:  ইংলিশ  টিচার্স এসোসিয়েশেন অফ বাংলাদেশ ( ইট্যাব) এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ,রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যিালয় শিক্ষক।     


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ