• 0
  • 0
Rejaul karim
Posted at 24/11/2020 01:13:pm

কোরানেই রয়েছে ভাস্কর্য নির্মাণের অনুমোদন

কোরানেই রয়েছে ভাস্কর্য নির্মাণের অনুমোদন

ভাস্কর্য হলো একটি ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম বা অবয়ব(উচ্চতা×দৈর্ঘ্য×প্রম্থ)। মূর্তি বা বিগ্রহ হলো দেবতার প্রতিমা। আক্ষরিক অর্থে এটিও একটি অবয়ব। ভাস্কর্য সব সময় মূর্ত না হয়ে বিমূর্তও হতে পারে। মূর্তি বিমূর্ত হতে পারে না।প্রতিমাকে স্রষ্টা বা উপাস্য মনে করে উপাসনা করা হলো মূর্তিপূজা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপর আল্লাহত্ব আরোপ করা বা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা হলো শিরক। শিরক করাকে কোরনে নিষেধ করা হয়েছে।

“অতএব তুমি অন্য কোন উপাস্যকে আল্লাহর শরিক কর না; করলে তুমি শাস্তি পাবে। ”-২৬ সুরা শোয়ারা: ২১৩। “ইব্রাহিম(আল্লাহর কাছে)দোয়া করল, হে আমার মালিক, এ শহর (মক্কা)কে নিরাপত্তার শহরে পরিণত কর এবং আমাকে এবং সন্তান সন্ততিদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রেখ।”-১৪ সুরা ইব্রাহিম: ৩৫।“(স্মরণ কর), যখন ইব্রাহিম তার পিতা আযরকে বলল, তুমি কি এ প্রতিমাগুলোকে উপাস্য মনে কর? আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি ও তোমার সম্প্রদায় স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ। ”-৬ সুরা আনআম: ৭৪। “হে মানুষ, তোমরা যারা ইমান এনেছ (জেনে রেখ), মদ, জুয়া, পূজার বেদি ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর হচ্ছে শয়তানের কাজ। অতএব তোমরা তা বর্জন কর। ”–৫ সুরা মায়েদা: ৯০। “এ প্রতিমাগুলো কী, যাদের পূজা করার জন্যে তোমরা বসে আছ?”-সুরা আম্বিয়া: ৫২। এ রকম অনেক আয়াত আছে যেখানে শিরক, দেব-দেবি, প্রতিমা, বিগ্রহ ও মূর্তিপূজাকে নিষেধ করা হয়েছে, সাবধান করা হয়েছে, এর পরিণতি কী হবে তাও বলা হয়েছে।বিধিনিষেধ আছে মূর্তিপূজা সম্পর্কে, মূর্তি সম্পর্কে নয়।মূর্তিও নিষিদ্ধ হতে পারে, যদি তাকে মাবুদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা হয়, আল্লাহর বিকল্প হিসেবে বা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে বা দেবদেবি হিসেবে পূজা বা উপাসনা করা হয়।

এ উদ্দেশ্য ব্যতীত মূর্তি নিষিদ্ধ হতে পারে না এবং কোরানেও তা করা হয়নি।আগে ভেবে দেখা দরকার, তাকে কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে? পূজার উদ্দেশ্যে যদি তাকে তৈরি না করা হয় এবং তাকে যদি পূজা না করা হয়, তাহলে সমস্যা কোথায়? কেউ বলতে পারেন, তাহলে তা তৈরি করা দরকার কী? দরকার শিল্পের জন্যে, সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যে।যেমন-বস্ত্র দোকানে বা বস্ত্র শোরুমে ডল সাজিয়ে রাখা হয়েছে, তাতে কি ধর্মের ক্ষতি হয়েছে? ঐ ডলকে কি কেউ পূজা করে বা পূজার জন্যে ব্যবহৃত হয়? মোটেই না। দেখতে হবে, মূর্তি তৈরির উদ্দেশ্য কী, কীকাজে তা ব্যবহার করা হয় বা হবে? 

ভাস্কর্য নির্মাণে কোন বাঁধা থাকার কথা নয়। পবিত্র কোরানে ভাস্কর্য নির্মাণের কথা আছে। সোলায়মান নবির ইচ্ছানুযায়ী জিনরা ভাস্কর্য বানিয়ে দিত। ভাস্কর্য নিষিদ্ধ বা হারাম হলে সোলায়মান নবি তা তৈরি করবেন কেন? “ওরা(জিন) সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী প্রাসাদ, ভাস্কর্য, পানির হাউজের মতো পাত্র ও চুল্লির জন্য বিরাট ডেক তৈরি করত। (আমি বলেছিলাম), হে দাউদ-পরিবার! তোমরা কৃতজ্ঞতার সাথে কাজ করতে থাক। আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই আছে যারা কৃতজ্ঞ।”-৩৪ সুরা সাবা: ১৩। 

শুধু মূ্র্তিপূজা কেন? অল্লাহ ব্যতীত সকল পূজাকেই আল্লাহ নিষেধ করেছেন। যেমন- চন্দ্র, সূর্য, আগুন, পানি, বাতাস, মাটি, পাহাড়-পর্বত, নদী, পশু-পাখি, বৃক্ষ ইত্যাদি।মানুষ এগুলোকে পূজা করত।মানুষ এগুলোকে পূজা করত বলে কি তাদের ধ্বংস করতে হবে? এসবকে ধ্বংস করার দরকার নেই। এসবকে দেবতা বা আল্লাহর শরিকজ্ঞানে পূজা না করলেই হলো। আল্লাহ এসবকে পূজা করতে নিষেধ করেছেন, ধ্বংস করতে নয়। “আল্লাহর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাত্রি ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা কর না, চন্দ্রকেও নয়। তোমরা সিজদা কর আল্লাহকে যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা তাঁর অনুগত থাক।”-৪১ সুরা হা-মিম সিজদা: ৩৭। 

মানুষ এক সময় চন্দ্র, সূর্যকে পূজা করত।প্রাচীন যুগে সূর্য ছিল প্রধান দেবতা। তাই বলে আল্লাহ কি সূর্যকে বা চন্দ্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে? দেয়নি। তিনি এসবকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করতে নিষেধ করেছেন। পারস্যের জড়োস্ট্রানরা ছিল অগ্নি উপাসক।তাই বলে কি আগুন জ্বালানো কি বন্ধ ছিল? মানুষ বট গাছকে পূজা করত। তাই বলে কি বটগাছ কেটে ফেলতে হবে বা বটগাছের চারা রোপন করা যাবে না? মানুষ এক সময় নদী বা পাহাড়কেও পূজা করত। তাই বলে নদী বা পাহাড়ের বিনাশ করতে হবে?আগুন, পানি, বাতাস, মাটি, চন্দ্র, সূর্য, নদী, পাহাড়, বৃক্ষ কোন সমস্যা নয়। এগুলো নিষিদ্ধও নয়, নিষিদ্ধ এগুলোকে পূজা করা।

তদ্রূপ, মূর্তি বা ভাস্কর্য কোন সমস্যা নয় বা নিষিদ্ধও নয়, নিষিদ্ধ হবে তখনই যখন মাবুদরূপে ওগুলোকে উপাসনা করা হবে। 

রাসুল (সঃ) কাবাঘরের মূর্তি ভেঙ্গেছেন ওগুলো আল্লাহর অংশীদাদারী হিসেবে পূজা করা হতো বলে। সুতরাং ওগুলোকে মাবুদজ্ঞানে পূজা না করলেই হলো। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে একের পর এক দেশ ইসলামের পতাকাতলে আবদ্ধ হতে থাকে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পূর্বে মুসলিম সাম্রাজ্যও কম বড় ও কম শক্তিশালী ছিল না। মুসলমানরাও পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ  দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে শাসন করেছে। তাই বলে মুসলিমরা কি সেসব দেশের ভাস্কর্য ধ্বংস করেছে? আফগানিস্তান মুসলিম অধিকারে আসে অষ্টম শতকে। আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় পৃথিবীর বড় দুটি বৌদ্ধমূর্তি বহাল ছিল। এর একটির উচ্চতা ছিল ৫৫মিটার, অন্যটির ৩৫ মিটার। আগের মুসলিমরা কেউ ভাঙ্গেনি।২০০১ সালে আমেরিকার প্রিয়ভাজন, তাদের প্রেতাত্মা তালেবানরা ডিনামাইট দিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়।

মিসরের ফেরাউনদের মমি, স্ফিংস মূর্তি (মাথা মানবের, নিচের অংশ সিংহাকৃতি)তো মুমলিমরা ধ্বংস করেনি। তাহরে বাংলাদেশে ভাস্কর্য ভাঙ্গার হুমকি কেন?  ভাস্কর্য ইতিহাস বা ইতিহাসের অংশবিশেষ। এটি অতীতকে মনে করিয়ে দেয়, হালে চেতনা জাগায়, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দেয়, স্বপ্ন দেখায়।ভাস্কর্য, মূর্তি, মমি ইতিহাসের উৎস। এগুলো একটি জাতির ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রুচির পরিচায়ক। ইতিহাস, ঐতিহ্য ব্যতীত কোন জাতির ভিত মজবুত হয় না। ভাস্কর্য অনেক মুসলিম দেশেই আছে। ইরান, ইরাক, লিবিয়া, মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে ভাস্কর্য এর প্রচলন রয়েছে। পাকিস্তানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাস্কর্য আছে। বাংলাদেশেও জিন্নাহর ভাস্কর্য থাকত, যদি অখণ্ড পাকিস্তান বহাল থাকত। তাতে ধার্মিক ভাইদের আপত্তি থাকত না। তাকে পাকিস্তানের জাতির পিতা মানতে আপত্তি হয়নি। আপত্তি জাগে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা বললে।

কেননা তাদের আত্মা হলো পাকিস্তান, দেহ হলো বাংলাদেশ। মনটা ওখানেই পড়ে থাকে, শুধু দেহ থাকে এখানে। তাই তারা যিনি পাকিস্তান ভেঙ্গেছেন তাঁকে মনে মনে অভিশাপ দেয়। 

অলিখিতভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মৌলবাদীরা।তারা যা বলে সরকার তা মেনে নেয়। আগে সাধারণ শিক্ষা মাদ্রাসা শিক্ষাকে, কওমি শিক্ষাকে সংস্কারের পরামর্শ দিত।

আর এখন কওমি শিক্ষা পরামর্শ দেয় সাধারণ শিক্ষাকে।তারা পরামর্শ দেয় কোন কবিতা, কার কবিতা, কার লেখা, কী ধরনের লেখা সাধারণ শিক্ষায় থাকবে। এবার তারা দাবি করছে দেশে কোন ভাস্কর্য থাকবে না। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তারা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দেয়। তারা লেনিনের ভাস্কর্য ভাঙ্গার উদাহরণ দেয়।লেনিনের ভাস্কর্য ভেঙ্গেছে ধর্মীয় কারণে নয়, রাজনৈতিক কারণে।ইরাকে সাদ্দামের ভাস্কর্য ভেঙ্গেছে রাজনৈতিক কারণে। মৌলবাদীরা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙ্গলে তা রাজনৈতিক কারণেই ভাঙ্গবে। রাশিয়ায় লেনিনের ভাস্কর্য পুনরায় ফিরে এসেছে, মার্কিন দালাল গর্বাচেভের ভাস্কর্য নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা থাকার কথা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি যাদের শ্রদ্ধা নেই, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা থাকবে কী করে? তাই তারা তাঁর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে। দেশে ঘুষ, দুর্নীতি, হত্যা, ধর্ষণ, দখল, সন্ত্রাস, জঙ্গিপনা, সামাজিক অনাচার, অবিচার বিরাজমান।

সেগুলোর বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাদের কোন বক্তব্য নেই, প্রতিবাদ নেই।২৯/১০/২০২০ইং তারিখে লালমনিহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী মসজিদে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আবু ইউছুফ মোঃ সাহিদুন্নবী জুয়েল নামে একজন লোককে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়। আইয়ামে জাহেলিয়া যুগেও এ রকম নজির আছে কিনা আমার জানা নেই। তদন্তে জানা গেল সেখানে ধর্ম অবমাননার কোন ঘটনা ঘটেনি। ধর্ম অবমাননা হলেও তো বিচারের একটা সিস্টেম আছে।নিজ হাতে বিচার তুলে নেওয়া তো সন্ত্রাস। একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের লাস পুড়ায় কিভাবে? আফগানিস্তানে খায়েতেরা নামক এক মহিলা পুলিশের চাকরি নেওয়ায় তালেবানরা তার দু’টো চোথ উপরে ফেলে (সূত্র:১০/১১/২০২০ প্রথম আলো)।

কোন ধর্মীয় সংগঠনকে এর নিন্দা করতে দেখলাম না। কোন ভালো কাজে মোল্লা মৌলভীদের শোডাউন করতে দেখা যায় না।আল্লাহর আইন অনুসারে বিচার কর, আপত্তি নেই। এটা কোন ধরনের বিচার? বরং যারা আল্লাহর বিধান অনুসারে বিচার করে না তারা কাফের, এ কথা আল্লাহ নিজেই বলেছেন পাক কোরানে। “সুতরাং তোমরা মানুষদের ভয় না করে একান্তভাবে আমাকেই ভয় কর, আর আমার আয়াসমূহ বিনামূল্যে বিক্রি করে দিয়ো না; যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না, তারাই (হচ্ছে) কাফের। ”-৫ সুরা মায়েদা: ৪৪। 

বিশ্ব পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কথা শরিয়তেই আছে। এক শরিয়তের আলেমরা ছবি বা ফটোর বিরোধিতা করেছিলেন। এখন মেনে নিয়েছেন। এক সময় আলেমরা মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিল। রেডিও, টেলিভিশন, নাটক, সিনেমার প্রচলন হলে এগুলোকে ইসলাম বিরোধ বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন।

সঙ্গীত, পালা গান, যাত্রা, সার্কাস, নারী শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন ইত্যাদিকে এখনো নাযায়েজ বলে ফতোয়া দেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের রক্ষণশীলতা যেখানে হ্রাস পাচ্ছে, সেখানে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুসলমানদের রক্ষণশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলি,  বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনও বসে  বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকা হাদিস চষে। 

রেজাউল করিম, সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। Email: rejaulkarim1975@gmail.com                        


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ