Thursday -
  • 0
  • 0
Benin Snigdha
Posted at 24/11/2020 08:46:am

বই আর পরীক্ষা বিহীন স্কুল !

বই আর পরীক্ষা বিহীন স্কুল !

দিনের শুরুটা হয়, বাইরে খেলাধূলা, বন-জঙ্গল কিংবা দর্শনীয় কোন স্থান দেখার মধ‍্য দিয়ে। তারপর শুরু হয় হাতে-কলমে পাঠদান। বয়:সন্ধিকালে সকালবেলার ঘুম খুব প্রয়োজনীয় বলে স্কুলের পাঠদান শুরু হয় সকাল ৯ টা থেকে। চলে দুপুর ২ টা পর্যন্ত। এ ৫ ঘন্টার মধ‍্যে আবার কয়েকটি বিরতিও থাকে। আবার কারও যদি কোন ক্লাশ ফাঁকা থাকে তাহলে সে ইচ্ছে করলে ওই সময়টা স্কুলে নাও থাকতে পারে। কি অদ্ভূত না ! অদ্ভূত হলেও এটাই সত‍্যি। আর এ সত্যিটুকুর দেখা মেলে, বিশ্বসেরা শিক্ষা ব‍্যবস্থার কর্ণধার, ফিনল‍্যান্ডে।

পিসা/PISA (Programme for International Student Assessment) র‍্যাঙ্কিংয়ে ফিনল্যান্ড কোন রকম অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছাড়াই শীর্ষ স্থান অধিকার করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে ফিনিশ শিক্ষাবিদ প‍্যাসি স‍্যালবার্গ এর একটি উক্তির কথা মনে করা যাক - "প্রকৃত জয়ীরা কখনই প্রতিযোগিতা করেনা"। 

তাহলে ফিনিশরা কি করে? ফিনিশদের, র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ স্থানে আসার রহস্য কি? তৃতীয় বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ এমনকি অনেক উন্নত রাষ্ট্রগুলো যখন প্রায় প্রতি বছর তাদের শিক্ষা ব‍্যবস্থায় নতুন নতুন পরিবর্তন সংযোজন করছে, তখন ফিনিশদের, এতো দীর্ঘ সময় ব‍্যাপী পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করার কারণ কি? এক্ষেত্রে প‍্যাসি স‍্যালবার্গ এর আরেকটি উক্তির কথা উল্লেখ্য - 'To rush educational reforms is to ruin it'. তার মানে বলা যায়, ফিনিশরা ধীর এবং অবিচলিত গতিতেই এগিয়েছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার শিক্ষা ব‍্যবস্থার দেশ বলা হয় ফিনল্যান্ডকে। আমাদের দেশেরও এখান থেকে কিছু বিষয় অনুকরণীয় রয়েছে। কি এমন শিক্ষা নীতি, যা অন‍্য দেশ থেকে ফিনল্যান্ডকে উঁচু স্তরে নিয়ে গিয়েছে? চলুন, দেখে নেয়া যাক। পাশাপাশি বাংলাদেশের স্কুল এবং  শিক্ষা ব‍্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত এবং কোন জায়গাগুলোতে সংশোধন করা প্রয়োজন তারও একটি তুলনামূলক রূপরেখা পাওয়া যেতে পারে -

▪ন‍্যানি স্টেট

৫৫ লক্ষ জনগোষ্ঠীর ছোট একটি দেশ ফিনল্যান্ড, যাকে অনেকে বিদ্রূপ করে ন‍্যানি স্টেট বলে থাকেন। এই ন‍্যানি স্টেট হলো, এমন একটি সমাজ কাঠামো বা ব‍্যবস্থা, যেখানে জন্মের আগে থেকে মৃত্যু পযর্ন্ত রাষ্ট্রই তাদের নাগরিকদের দেখভাল করে থাকে। সন্তান জন্মের আগেই ফিনিশ সরকার সব হবু  মা, বাবাদের একটি বেবিবক্স পাঠিয়ে থাকে। এতে ১ বছর বয়স পযর্ন্ত শিশুর যা যা প্রয়োজন, তার প্রায় সবকিছুই থাকে। তাছাড়া সন্তান জন্মের পর ভীষণ উন্নত মানের ক্রেশ এর সুবিধাও প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া যায়। সেজন্য স্কুল শুরু করার আগেই ফিনিশ শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব প্রাণবন্ত অবস্থায় থাকে। 

▪সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ 

ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব‍্যবস্হার মূল কথা হলো "Equal Opportunity for all Citizens"। সেখানে সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগের ব‍্যবস্হা রয়েছে। ধনী, গরীব, শরণার্থী সবার জন্য একই ধরনের স্কুল, একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমাদের মতো প্রাথমিক শিক্ষার শুরুতেই বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম (English Medium), দাখিল মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসার বহুমাত্রিক বিভাজন নেই। 

▪বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ

ফিনল্যান্ডে শিক্ষাব্যবস্থায় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। মধ্যাহ্নভোজ, টিফিন, বই-খাতা-স্টেশনারি, শিক্ষাসফর এমনকি স্কুলে যাতায়াত সবকিছু বিনামূল্যে শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকেন। শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত খরচ সরকার বা রাষ্ট্র বহন করে থাকে এবং বার্ষিক বাজেটের ১২.২% এর বেশি শিক্ষাখাতের জন্য বরাদ্দ থাকে। অথচ বাংলাদেশ সরকার জাতীয় বাজেটের ১৫℅ - ২০℅ শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়ার জন‍্য বৈশ্বিক অঙ্গীকার করলেও ২০২০ - ২০২১ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়েছে ১১.৬৯℅। 

▪৭ বছর বয়সের আগে স্কুল নয়

বাংলাদেশের শিশুরা যেখানে জন্মের ৪ বছর না পেরোতেই বই ভর্তি ব‍্যাগের পাহাড় কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করে, সেখানে ফিনল্যান্ডের শিশুরা ৭ বছর বয়সে তাদের শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৭ বছর বয়সের আগে কোন শিশুকেই স্কুলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয় না। 

▪খেলাধূলার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান (Gaming Education System)

ফিনল্যান্ডের শিশুরা প্রথমে খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পেয়ে থাকে। যখন তারা ক্লাশ নাইনে উঠে যায়, তখন তারা তাদের পছন্দসই বিষয় নিতে পারে। পর্যায়ক্রমে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ধাপের জন‍্য ধীরে ধীরে নিজেদেরকে প্রস্তুত করে।

▪কোন পরীক্ষা নেই

ফিনল্যান্ডের শিক্ষকেরা বলে থাকেন যে, মানুষের হয় তার জীবনের জন্য অথবা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। আমরা প্রথমটি বেছে নিয়েছি। তাই আমাদের ফিনল্যান্ডের স্কুলগুলোতে কোন পরীক্ষা নেই, শুধু একটি আবশ্যকীয় পরীক্ষা আছে, যখন শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর সম্পন্ন করেন। শিক্ষক তার ক্লাশে ছোটখাটো টেস্ট নিতে পারে, বিশেষ প্রয়োজনে। এমনকি তাদের সামগ্রিক ফলাফলে কোন মেধাক্রম নেই। অথচ বাংলাদেশের শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব‍্যবস্থা থেকেই বছরে ৩ টি পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ক্লাশ টেস্ট, মান্থলি টেস্ট এমনকি কোন কোন স্কুলে প্রতি ১৫ দিন পরপর সারপ্রাইজ টেস্টও নেওয়া হয়।

▪নির্দিষ্ট সাবজেক্ট বা বিষয় নেই

এটি একটি খুব নতুন উদ্যোগ। ২০১৫ সালে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয় যে শিশুদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার জন্য সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতাসহ বিভিন্ন 21st Century Skill গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। আর সেজন্য তারা এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসাবে ফিনল্যান্ড এখন তাদের স্কুলগুলোতে অংক, বিজ্ঞান, ভাষা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়গুলো উঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

স্কুলগুলোতে বরং একটি টপিক, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার দক্ষতা তৈরি করা হয় শিক্ষার্থীদের মাঝে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি সাম্প্রতিক সংযুক্তি হল- ‘ফেনোমেনন বেজড লার্নিং’ (Fenomenon Based Learning) যেখানে অনেকগুলো অধ্যায়ের পরিবর্তে একটি টপিক ৬ সপ্তাহ ধরে ছাত্র-ছাত্রীরা ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে পড়বে। যেমন- অভিবাসী বা মাইগ্রেন্ট, এই টপিকটি শিক্ষার্থীরা ভূগোল (কোথায় থেকে তারা এসেছে), ইতিহাস (এর আগে কী ঘটেছিল), সংস্কৃতি ( তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, জীবনযাপন) ইত্যাদি ভিন্ন আঙ্গিক থেকে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে। এজন্য  ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই তাদের জন্য প্রশ্ন তৈরি করে এবং সেই প্রশ্নের উত্তর ও নিজেরাই খুঁজে বের করে।

▪প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র পরিকল্পনা ও পদ্ধতি

অবাক হলেও এটাই সত্যি। ভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যের শিক্ষার্থীরা একই ক্লাসে পড়ালেখা করে। কোন শিক্ষার্থী যদি নির্দিষ্ট কাজ করতে না পারে তবে শিক্ষক তার জন্য স্বতন্ত্র পরিকল্পনা করে থাকেন এবং তার জন্য আলাদা টাস্ক ডিজাইন করা হয়। শিশুরা তাদের পছন্দমতো ও সামর্থ্যর উপর ভিত্তি করে ক্লাস টাস্ক নির্বাচন করার সুযোগ পায়। যদি লেসন ইন্টারেস্টিং মনে না হয় তাহলে শিক্ষার্থী পছন্দমতো বই পড়তে বা দোলনায় দুলতে পারে নির্দ্বিধায়। বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে তাও প্রথম সারির হাতে গোনা কয়েকটি স্কুলে এমনটি দেখা যায়। 

▪কোন নির্দিষ্ট স্কুল ইউনিফর্ম নেই

ফিনল্যান্ডে কোন নির্দিষ্ট  স্কুল ইউনিফর্ম নেই। শিশুরা তাদের পছন্দমতো ও আরামদায়ক পোশাক পড়ে আসতে পারে স্কুলে। প্রায়শই তারা বন্ধু বান্ধবরা একসাথে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরে ক্লাস করে। এবং ফিনিশ স্কুলগুলোতে আছে "No Shoes" রুল। যেহেতু ফিনিশ শিক্ষার্থীরা বাড়িতে জুতো পরে না, তাই স্কুলের পরিবেশটাও যাতে তাদের কাছে ঘরের মতোই মনে হয়, সেজন্য ফিনিশ প্রি স্কুলগুলোতে ক্লাশে জুতো পরে থাকার বিধান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাশে জুতো রেখে ঢুকবে। তারা মোজা পরে বা খালি পায়ে থাকবে। আমাদের স্কুলগুলোতে চেয়ার ও বেঞ্চে বসা বাধ্যতামূলক কিন্তু ফিনল্যান্ডে স্কুলগুলোতে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। ক্লাসের মাঝে তারা চাইলে সোফায় বসতে কিংবা মেঝের কার্পেটে শুয়ে শুয়ে ক্লাস করতে পারে।

▪মজার বাড়ির কাজ

ফিনল্যান্ডে শিক্ষকেরা মনে করেন যে শিশুদের বাসায় বিশ্রাম নেওয়া ও পরিবারের সাথে বেশি সময় কাটানো উচিত তাই তাদের হোমওয়ার্ক বা বাড়ির কাজ খুব একটা দেওয়া হয়না আর দিলেও তা খুব মজার হয় এবং খুব স্বল্প সময়ে করা যায়। যেমন- ইতিহাস ক্লাসের বাড়ির কাজ হল শিক্ষার্থীরা তাদের দাদী বা নানির সাথে গল্প করে তার সময় এবং বর্তমান সময়ের জীবনযাপনরীতির পার্থক্য খুঁজে বের করবে।

▪ক্লাসে সবচেয়ে বেশি বিরতি 

সারা বিশ্বে সমস্ত স্কুলগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা স্কুলে সবচেয়ে বেশি বিরতি পেয়ে থাকে। ক্লাস যতই মজার হোক না কেন, প্রতি ৪৫ মিনিট পড়ালেখা বা ক্লাসের পর শিক্ষার্থীরা ১৫ মিনিট করে বিরতি পায়। অথচ বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে টানা ৪ টি ক্লাশের পর ১৫ - ২০ মিনিটের বিরতি দেয়া হয়। যা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক নয়। 

▪দক্ষ ও নিবেদিত শিক্ষক

ফিনল্যান্ডে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া খুবই প্রতিযোগিতামূলক এবং কঠিন যার মাধ্যমে সেরা আবেদনকারীদের বেছে নেওয়া হয়। প্রায় ১০ জনে একজন শিক্ষক হতে পারে আবেদনকারীদের মধ্যে, এবং বেতন শুরু হয় ৩৫০০ পাউন্ড থেকে। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা পেশাটি খুবই সম্মানজনক এবং সবথেকে আকর্ষনীয়। দক্ষ ও আগ্রহী শিক্ষকেরা তাদের সর্বোচ্চ মেধা ও পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারেন তাদের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ক্ষেত্রে, আর শিক্ষক যখন সেরা তখন তার প্রতিফলন তো ঘটবেই শিক্ষাব্যবস্থায়।

▪জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোই ছাত্র-ছাত্রীদের শেখানো হয়

সাঁতার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা শেখে কোন কোন সংকেত বোঝায় যে একজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে, গার্হস্থ্য বা গৃহস্থালি ক্লাসে শেখে রান্না, সেলাই, বোনা ইত্যাদি। পরিবেশ এর যত্ন বা পরিবেশ সচেতনতার উপর খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফিনল্যান্ডে স্কুল শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই একটি ওয়েবসাইট বা পোর্টফলিও তৈরি করতে পারে। মূল বিষয় হল কোন কিছু শেখার সামর্থ্য এবং  সময়ের সাথে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যে দক্ষতাগুলো শেখা দরকার তাই ফিনল্যান্ডের স্কুলগুলোতে শেখানো হয়। কারণ যখন ইন্টারনেট আছে তখন কোন বিষয় বা সাবজেক্ট নলেজ এতো গভীরে স্কুলে শেখানোর প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী এক সময় ফিনল্যান্ড সফর করেন, সে দেশের শিক্ষা ব‍্যবস্থা স্বচক্ষে অবলোকন করার জন্য। কিন্তু আদতে এখনও পযর্ন্ত আমরা সেই শিক্ষা পদ্ধতির ছিটেফোঁটাও আমাদের শিক্ষা ব‍্যবস্থায় প্রয়োগ বা প্রণয়ন, কোনটিই করতে পারিনি। যার দরুন বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ‍্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এটাও ঠিক যে, সব রাষ্ট্র ব‍্যবস্থায় এক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা কখনো সম্ভবপর নয়। এমনকি যুক্তিসঙ্গতও নয়। তবে মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রেখে শিক্ষার মান উন্নীত করা উচিৎ। কেননা শিক্ষা, কোন সুযোগ নয়। এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

শিক্ষকরা হলেন 'মানুষ গড়ার কারিগর'। অথচ আমাদের শিক্ষকেরা তুমুল মাত্রায় স্বজন পুষ্ট। এছাড়া বেতন বৈষম্য, যথাযোগ্য শিক্ষা প্রণোদনার অভাব, বিলম্বিত প্রমোশন এবং শিক্ষকদের দলীয়করণ নীতির ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ব‍্যবস্থা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আরেকটি বিষয় এখানে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। সেটি হলো কর্মমুখী শিক্ষা ব‍্যবস্থা - বাংলাদেশের শিক্ষা ব‍্যবস্থা পুরোপুরিভাবে সনদমুখী। অর্থাৎ এখানে শিক্ষা গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ডিগ্রী অর্জন। তাই শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময় শেষে সনদ নিয়ে বেরিয়ে গেলেও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়ে যায় প্রকটভাবে, যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় তাদের কর্মজীবনে।

এছাড়া ভাষার অদক্ষতা এখানে প্রকটতর। এর একমাত্র কারণ হলো ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমের শিক্ষা পদ্ধতি। ইংরেজি, আন্তর্জাতিক মানের ভাষা হলেও বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক সংখ‍্যা একেবারেই অপ্রতুল। আর ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতেও যেসব শিক্ষক নিয়োজিত আছেন, তাদের অধিকাংশই বাংলা মাধ্যম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আসছেন। সবচেয়ে বিপাকে পড়ছে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা। উচ্চ শিক্ষা স্তর অথবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ রেফারেন্স বই ইংরেজি ভাষায় রচিত। এতে বাংলা মাধ্যম থেকে পড়ে আসা শিক্ষার্থীরা যখন হুট করে ইংরেজি ভাষায় লেখা বই পড়তে বাধ‍্য হচ্ছে তখন তাদের রেজাল্ট যুক্তিসঙ্গত কারণেই খারাপ হচ্ছে। যারা বই পড়ে বুঝতে পারছেনা অগত‍্যা তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে সিনিয়র ভাই - বোনদের নোটের উপর। ফলশ্রুতিতে সীমিত জ্ঞান নিয়ে তাদেরকে  বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার হতে হচ্ছে। তবে আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা ব‍্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ‍্যে যথাসাধ‍্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। বতর্মান সরকার বিষয় ভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষা ব‍্যবস্থার উপর জোর দিচ্ছে যা সত‍্যিই প্রশংসনীয়।

সর্বশেষ ২০১২ সালে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকের শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়েছিল, যা এখনো চলছে। সাধারণত ৫ বছর পরপর শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বতর্মান বাংলাদেশ সরকার, পরীক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে যাচ্ছে যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত চ‍্যালেঞ্জিংও বটে।  তবে রাতরাতি সবকিছু পাল্টে ফেলা সম্ভব নয়। সামগ্রিক শিক্ষা ব‍্যবস্থায় কার্যকরী এবং যুগোপযোগী পরিবর্তন আনতে হলে বেশ একটু লম্বা সময় এবং অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ