About Us
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
Md Jahidul Islam Sumon
প্রকাশ ১৮/১১/২০২০ ১২:২৩পি এম

সব জ্বরই করোনা নয়

সব জ্বরই করোনা নয় Ad Banner

ওষুধ খেলে সারতে ৭ দিন, না খেলে এক সপ্তাহ। ভাইরাল সংক্রমণ সম্পর্কে এই চিরায়ত ও প্রচলিত রসিকতা শুধু ক্লিশেই নয়, কোভিড–‌উত্তর পৃথিবীতে আপাতত রীতিমতো বেমানান ও শ্রুতিকটু শোনাচ্ছে। নোভেল করোনাভাইরাস সবার বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে ছেড়েছে। কেন, কীভাবে, কতদিন— জ্বর বা সামান্য শরীর খারাপ হলে অন্য কিছু ভাবার আগে মানুষ প্রথমেই ধরে নিচ্ছেন এই বুঝি কোভিডে টুপ করে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল!‌ অথচ প্রতি বছর বাংলায় শ্রাবণ এবং ভাদ্র মাসে বর্ষাকালীন একাধিক মরশুমি রোগ হয়। জ্বরজারি তখন লেগেই থাকে। বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে— সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। সব জ্বরই বা করোনা হতে যাবে কোন দুঃখে? স্মৃতি হাতড়ে এক লহমায় বর্ষার মরশুমি অসুখগুলো মনে পড়ল ৪০ বছর আগে নেওয়া মেডিসিন ক্লাসের এক পাতা নোট থেকে। বড় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, আরও বড় শিক্ষক প্রয়াত ডাঃ অবনী রায়চৌধুরি কী সুন্দর শ্রেণিবিন্যাসে বুঝিয়েছিলেন। স্যর বর্ষায় যে সব অসুখ হয়, তাকে সেদিন তিনভাগে ভাগ করেন।

১)‌ ভেক্টর–‌বর্ন বা পতঙ্গবাহিত, যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি (‌অন্য দেশে মারী ঘটালেও ১৯৮০–তে চিকুনগুনিয়া এত প্রবলভাবে থাবা বসায়নি ভারতে)‌,

২) ওয়াটার–‌বর্ন বা জলবাহিত, যেমন টাইফয়েড, কলেরা, জন্ডিস‌, আন্ত্রিক ও অন্য গ্যাস্ট্রো–‌ইনটেস্টিনাল সংক্রমণ, হেপাটাইটিস ‘‌এ’‌ (‌বর্ষার জলকাদা মেখে তৈরি হওয়া লেপ্টোস্পাইরোসিস বা ওয়েল’‌স সিনড্রোম ছয়ের দশকে দিল্লি ও উত্তর ভারতে হানা দিলেও তখনও নজর কাড়েনি),‌

৩)‌ এয়ার–‌বর্ন বা বাতাসবাহিত, যেমন সাধারণ সর্দি–কাশি, মরশুমি বা সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা। ভাবতে অবাক লাগে, ৪০ বছর পরেও বছরের এ সময়টায় এ সব রোগগুলিরই প্রাবল্য। ইংরেজি ২০২০ বা বাংলা‌ ১৪২৭ অবশ্য মানবসভ্যতায় নোভেল করোনাভাইরাসের বিধ্বঃসী ব্যাটিংয়ের জেরে ‘‌কন্টাজিওন ‌ইয়ার’‌ হিসেবেই চিরতরে ঠাঁই পাবে। সামান্য জ্বর মানেই করোনা, এ ভাবনা মানুষের মনে ছেয়ে থাকার অসংখ্য কারণ রয়েছে। যাঁদের উপসর্গ দেখা গেছে, প্রারম্ভিক পর্বে সেটা এত ভিন্নধর্মী যে, চিকিৎসক হিসেবে আমরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধন্দে পড়ছি।

জ্বর, মাথাধরা, মাথা ভার ভার, ঘাড়ের পেছনে ব্যথা, গলায় ব্যথা, ঢোক গিলতে অসুবিধে, শুকনো কাশি, নাক দিয়ে জল, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়, পেটে ব্যথা, ডায়েরিয়া, হজমের গন্ডগোল, গায়ে র‌্যাশ, সারা শরীরে ব্যথা, শিরদাঁড়ায় আড়ষ্ট ভাব, লেথার্জি বা অকারণ ক্লান্তি, জিভের স্বাদ একেবারে ভ্যানিশ, নাকে কোনও গন্ধ টের না পাওয়া— বিশ্বাস করুন একটা অসুখ এত বহুরূপী হতে পারে জানা ছিল না। যে উপসর্গগুলোর উল্লেখ হল, তার বাইরে আরও কয়েক ধরনের অসুবিধের কথা অনেক রোগী বলেছেন। অধিকাংশের কোনও উপসর্গই নেই। বেশ কয়েকজন বন্ধু শল্যবিদ জানালেন, রোজ অস্ত্রোপচার প্ল্যান করেও বানচাল হচ্ছে। দিব্যি হাঁটাচলা করা রোগী ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছেন, টেস্ট করালেই করোনা পজিটিভ পাচ্ছি! সার্বিক বিভ্রান্তি তাই সঙ্গত।‌ ভাইরোলজিস্ট ‌ডাঃ অমিতাভ নন্দী বললেন, এখন কোভিড ছাড়াও ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, নর্মাল ভাইরাল ফিভার, টাইফয়েড রোগীও পাচ্ছি। সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবকিশোর গুপ্তের মতে উপসর্গ দেখে ক্লিনিক্যালি রোগ নির্ণয় করতে গেলে অনেক সময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, তাই টেস্ট করাটা খুব জরুরি। কোভিড–১৯, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এইচওয়ানএনওয়ান বা অন্য কোনও সংক্রমণে কিছু উপসর্গ প্রায় একই।

কনসালট্যান্ট ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিস্ট ও সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ভাস্করনারায়ণ চৌধুরি জানালেন, এখন ৬০% জ্বরের কারণ কিন্তু করোনা ভাইরাস। করোনার পর বেশি আসছে ডেঙ্গি, স্ক্রাব টাইফাস এবং রাইনো ভাইরাস সংক্রমণ। টাইফয়েডও দু–একজনের হচ্ছে। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন অধ্যাপক ডাঃ জ্যোতির্ময় পাল মনে করেন, পুরসভা অত্যন্ত সক্রিয় হওয়ায় এবং সকলের স্বাস্থ্যসচেতনা বাড়ায় এ বছর ডেঙ্গির প্রকোপ খুবই কম। কিছু কিছু উপসর্গের ওপর প্রাথমিকভাবে ভিত্তি করে ক্লিনিক্যালি রোগ নির্ণয় সম্ভব। যেমন ম্যালেরিয়ায় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, একদিন অন্তর জ্বর;‌ ডেঙ্গিতে মাথা, গা, হাত, পা,‌ গাঁটে প্রচণ্ড ও অসহ্য ব্যথা;‌ করোনায় জ্বরের সঙ্গে শুকনো কাশি বা স্বাদ, গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়া। তাহলে জ্বর হলে সাধারণ মানুষের কী করণীয়?‌ ৯৮.‌৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অবধি নর্মাল তাপমান বলেই মানা হয়। সংজ্ঞা অনুযায়ী তার থেকে বাড়লেই জ্বর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে কোনও ধরনের শরীর খারাপ বা সংক্রমণ (‌ভাইরাস, ব্যাক্টিরিয়া, ফাঙ্গাস কিংবা অন্যান্য মাইক্রো–‌অর্গানিজমের কারণে)‌ হলে দেহের তাপমান অন্তত ১০০.‌৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরোয়। মেডিসিন অতি–‌বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুকুমার‌ মুখার্জি চাইছেন, এই কঠিন সময়ে জ্বর বা অন্যান্য শরীর খারাপে মানুষ খবরদার যেন নিজে ডাক্তারি না করেন। দ্বিতীয় করণীয়, দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। বাড়িতে অকারণ দেরি হওয়ায়, কী করব এই সিদ্ধান্তহীনতায় অনেকের মৃত্যু হয়েছে। তৃতীয়ত, মানুষকে নিজের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে। যাঁরা অল্প বৃষ্টি ভিজলেই ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হাঁচেন, কারণে–‌অকারণে ভোগেন— তাঁদের ইমিউনিটি প্রশ্নের মুখে। এটাই সবচেয়ে ‘‌ভালনারেবল’‌ গ্রুপ। সাবধান। ডাঃ জ্যোতির্ময় পাল বললেন, জ্বর এলে সঙ্গে সঙ্গে প্যারাসিটামল এবং পর্যাপ্ত জল খান, অন্য কোনও ওষুধ নয়। ব্যাক্টেরিয়াল সংক্রমণের প্রমাণ না থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক নয়। এ সময় ঠান্ডা না লাগানো, বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জল যাতে না জমে তা খেয়াল রাখা, হাঁচি–কাশির রোগী বাড়িতে থাকলে আলাদা রাখা এবং করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটা জরুরি। ডাঃ ভাস্করনারায়ণ চৌধুরি মনে করালেন, এ বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ওই ধরনের রেসপিরেটরি ভাইরাস খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক পরছেন। করোনা ইনফ্লুয়েঞ্জার থেকেও বেশি সংক্রামক, তাই মাস্ক খুললেই সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। সাধারণ জ্বরে প্যারাসিটামল, সঙ্গে গার্গল বেশ উপকারী।

সর্দি থাকলে অ্যান্টি–অ্যালার্জিক ট্যাবলেট। এ ছাড়াও মরশুমি অসুখগুলো রুখতে কয়েকটি নাগরিক কর্তব্য আপনার অবশ্যপালনীয়। বাড়ির ভেতরে ও আশপাশে এখন জল জমতে দেবেন না। বদ্ধ নালা, পরিত্যক্ত জলের ট্যাঙ্ক দেখলে পুরসভা/‌মিউনিসিপ্যালিটিতে জানান। শোওয়ার সময় মশারি মাস্ট। ফোটানো জল পান, সবসময় হাত ধুয়ে খেতে বসা, বাজারের শাকসবজি ভালভাবে ধোওয়া। দোকানের তেল–‌মশলাদার খাবার বয়কট।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ