About Us
Rejaul karim
প্রকাশ ১৬/১১/২০২০ ০২:৪৯পি এম

অধমের দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ বিশ্ব (দ্বিতীয় অংশ)

অধমের দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ বিশ্ব (দ্বিতীয় অংশ) Ad Banner

বাংলাদেশে যেমন রাজনৈতিক দল আছে মূলত দু’টি। একটি আওয়ামী লীগ, অন্যটি এন্টি আওয়ামী লীগ।তদ্রূপ বর্তমানে বিশ্বে ধর্ম আছে দু’টি।একটি ইসলাম, অন্যটি এন্টি ইসলাম।এন্টি ইসলামের মধ্যে আছে খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, ইহুদি। এক সময় খ্রিস্টানরা ছিল মুসলমানদের প্রতিপক্ষ। খ্রিস্টানরা মুসলিমদের নিকট পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অধিকাংশ হারানোর পরেও একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে তারা ঘুরে দাঁড়ায়। তারা যিশুখ্রিস্টের জন্মস্থান বেথেলহেম, জেরুজালেম পুনরদ্ধার করার লক্ষ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ শুরু করে যা প্রায় দুশো (১০৯৫-১২৯১) বছর ধরে চলে। ১০৯৯ সালে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের নিকট থেকে জেরুজালেম উদ্ধার করেন। ৮৮ বছর পর ১১৮৭ সালে সালাউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব খ্রিস্টানদের পরাজিত করে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। ১১৯২ সালে রামলার চুক্তি অনুসারে খ্রিস্টানরা জেরুজালেমে মুসলিম অধিকার স্বীকার করে নেয় আর জেরুজালেম খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে মুসলিমরা এ কথা স্বীকার করে নেয়। ক্রুমেডারদের নিকট থেকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করায় সালাউদ্দিন মুসলমানদের নিকট মহান বীরে পরিণত হন। তিনি ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করে আইয়ুবীয় সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি জাতিতে ছিলেন কুর্দি।সে সালাউদ্দিনের কুর্দি জাতি আজ নিপীড়িত, নি‌র্যাতিত, রাষ্ট্রহীন জাতি। সালাউদ্দিনের নিকট খ্রিস্টানরা পরাজিত হয়ে জেরুজালেম ছাড়লেও তারা বসে থাকেনি। তারা বাকি বিশ্বে খ্রিস্টান ধর্ম প্রসারিত করতে থাকে।তাতে তারা বেশ সফলও হয়। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে একচেটিয়া আফ্রিকার অর্ধেকাংশে খ্রিস্টান ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়।বিশ্বে ধনে মানে জ্ঞানে শক্তিতে সংখ্যায় খ্রিস্টান ধর্ম, খ্রিস্টান জাতি শীর্ষে অবস্থান নেয়। এ খ্রিস্টান ধর্মও এক সময় কম হিংস্র ছিল না।তারাও মধ্যযুগে ধর্মের সমালোচনা করার অজুহাতে ধর্মীয় আদালত বসিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। খ্রিস্টানদের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধও কম হয়নি।ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্টদের মধ্যে ত্রিশ বছরব্যাপী (১৬১৮-১৬৪৮)যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে। জার্মানির বহু গ্রাম-শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। সে খ্রিস্টান ধর্ম আজ মুসলমানদের কাছে নিঃশর্তে আত্মসমর্পন করেছে। এন্টি ইসলাম ধর্মগুলোর মধ্যে খ্রিস্টান ধর্ম আগে বিলীন হয়ে যাবে এবং তা শুরু হয়ে গিয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মের এখন পতনের সময়। তারা হয়তো টের পাচ্ছে না। পতনের সময় অবশ্য টের পাওয়া যায় না। কথায় বলে, “জয়কালে ক্ষয় নাই, মরণকালে ওষুধ নাই।” বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পনের ইতিহাস খ্রিস্টানদের মধ্যে নেউ, হিন্দুদের মধ্যে আছে। এখন সময় উল্টে গেছে।এখন খ্রিস্টানরা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করলেও হিন্দুরা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করতে রাজি নয়।যদিও শেষ পর্যন্ত হিন্দুরা টিকে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।কেননা ধর্মক্ষেত্রে একেকজন মুসলিম একেকজন সৈনিক।আর একজন মুসলমান একশোজন হিন্দুর চেয়ে বেশি সাহসী, জিহাদী ও শক্তিশালী। 

মুসলমানরা এখন ভারত বা ইউরোপকে আর গণনায় ধরে না। তারা আমেরিকাকে গণনায় ধরে আর চীনকে সমীহ করে। চীনের প্রতি মুসলমানদের আচরণ বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। মুসরমানরা ইউরোপ-আমেরিকাকে তুলোধোনা করতে পিছপা হয় না, অথচ চীনের প্রতি নীরব। চীন, মায়ানমারই বর্তমানে মুসলমানদের সামনে শক্ত প্রাচীর। এ ছাড়া মুসলমানদের সামনে কোন প্রাচীর আছে বলে মনে হয় না। সারা বিশ্ব মুসলিম হয়ে যাচ্ছে, মুসলমানদের কাছে এটা একটা আনন্দের বিষয়। কিন্তু সাথে সাথে আশঙ্কাও কাজ করে। তাহলো- ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীতে বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকায় উদারতাবাদের যে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে তার যবনিকাত ঘটবে। বিশ্ব হবে একমুখী। ভিন্ন মত পথের কোন সুযোগ নেই। রামকৃষ্ণের মতবাদ ‘যত মত তত পথ’ মুসলমানদের কাছে অচল।তাদের কাছে ইসলাম ধর্মই একমাত্র পথ। বাকি সব ভ্রান্ত। তাতে পৃথিবীর বৈচিত্র বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। সংস্কৃতি বলতে কিছু থাকবে না। খেলাধুলা, মেলা, আড়ং, আনন্দ-বিনোদন, গান-বাজনা, মুক্তচিন্তা, মুক্ত আলোচনা, সিনেমা, নাটক বিলুপ্ত হয়ে যাবে। নান্দনিক ভাস্কর্য্, মূর্তি ধ্বংস হবে।ননমুসলিমরা বিলুপ্ত হবে মানে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। গির্জা ও মন্দিরগুলো মসজিদে রূপান্তরিত হবে। পৃথিবী হবে মসজিদের পৃথিবী। গণতন্ত্রের বারোটা বাজবে। ঢালাও গণতন্ত্র ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলামি গণতন্ত্র হলো যোগ্য ব্যক্তিরাই যোগ্যতর ব্যক্তিকে মনোনীত বা নির্বাচিত করবে। যদিও গণতন্ত্রের কারণে ইউরোপ আমেরিকায় ইসলাম সম্প্রারিত হচ্ছে। তবে পুরুষরা বেশি সুবিধা পাবে। নারীরা ঘরে ফিরে যাবে। পদ-পদবী, চাকরি-বাকরি, কর্মক্ষেত্রগুলো পুরুষের একচেটিয়া দখলে থাকবে। পুরুষ একাধিক বিয়ে করার অধিকারটা ফিরে পাবে। বাল্যবিবাহ চালু হবে। লিভটুগেদার, সমকামিতা, গর্ভপাত হ্রাস পাবে। জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে।অবশ্য যুদ্ধ ও মারামারিতে সে সংখ্যা কিছু কমবে।   

ইসলামি শরিয়া আইন জীবন ফিরে পাবে। শরিয়া অনেকেই পছন্দ করেন না। আমি কিন্তু শরিয়া আইনে তেমন খারাপ কিছু দেখি না। শরিয়া আইন মানে প্রতিশোধাত্মক আইন। যেমন- হাতের বদলে হাত, দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ, পায়ের বদলে পা, চুরি করলে হাত কাটা, ডাকাতি করলে এক হাত ও এক পা কাটা, ধর্ষণ করলে পাথর ছুড়ে হত্যা ইত্যাদি। তবে ধর্ষণের বিচার করতে হলে প্রত্যক্ষদর্শী চারজন সাক্ষী থাকতে হবে। মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে তারও একই শাস্তি হবে। এ বিধান ব্যবিলনীয় সম্রাট হাম্বুরাবির (খ্রিপূর্ব ১৮১০-খ্রিপূর্ব ১৭৫০) আইনে ছিল, তৌরাত-বাইবেলে আছে, কুরআনেও আছে। এ বিধানমতে, শুধু শাস্তি হবে তা নয়। মওকুফের পথও আছে। তাহলো ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবার আর্থিক বা অন্যকিছুর বিনিময়ে সন্তুষ্ট হয়ে ক্ষমা করতে পারেন। শরিয়া আইনের বিধানমতে ক্ষমার অধিকার আছে শুধু ভিকটিম বা তার পরিবারের। রাজা বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমার করার অধিকার নেই।   

এ সব কিতাবি বিধিবিধান অনুকরণ ও অনুসরণ নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে বিভেদের কমতি নেই। ইসলামের এক নেতা আরেক নেতাকে, এক হুজুর আরেক হুজুরের কথা মানে না, শুনে না। নেতায় নেতায়, হুজুরে হুজুরে, ইমামে ইমামে প্রচণ্ড বিরোধ বিদ্যমান। তারা ঐক্যবদ্ধ আছে শুধু নাস্তিক, বিধর্মীদের বেলায়। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেনে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আফ্রিকার সুদান, নাইজেরিয়া, নাইজার, চাঁদ সিয়েরালিওন, লাইবেরিয়া প্রভৃতি দেশে যে অস্থিতিশীলতা, জঙ্গিপনা, হানাহানি, মারামারি তাতো মুসলমান বনাম মুসলমান। সেখানে ননমুসলিম, বিধর্মী, নাস্তিক নেই। তাহলে সেখানে কেন সহিংসতা বিদ্যমান? আইএস, আলকায়েদা, লস্কর- ই- তৈয়বা, হিজবুন মুজাহিদীন, বোকো হারাম, ইসলামিক সালভেশন, হিজবুল্লাহ প্রভৃতি সংগঠন রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র। এগুলো কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? এরা কে কারে মানে? মুসলমানরাই এদের আক্রমণের শিকার হয়েছে বেশি। পাশ্চাত্যের শাসকগোষ্ঠী, বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবীরা কমিউনিজম ঠেকানোর নামে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারাই সমাজতন্ত্র প্রতিহত করতে মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষা প্রবর্তন, মসজিদ মাদ্রাসা স্থাপনের পরামর্শ দেয় এবং অর্থ, অস্র, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী সৃষ্টি করে। পশ্চিমারা সমাজতন্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করতে পেরেছেন ঠিকই। তবে মুসলমান প্রতিহত করা সহজ নয়। মুসলমানদের হাতেই পাশ্চাত্য ধরাশায়ী হবে এবং তারা বিলুপ্ত হবে। আমার আশঙ্কা সারা পৃথিবী মুসলিম হওয়ার পরে বা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে আসার পর পৃথিবী অশান্ত হয়ে উঠবে। প্রথমে ননমুসলিরা শেষ হবে। তবে মুসলমান হয়ে গেলে সমস্যা হবে না। তারপরে মুসলিমদের মধ্যে যারা সংখ্যালঘু তারা শেষ হবে। প্রথমে শেষ হবে আহমদিয়া সম্প্রদায় (কাদিয়ানিরা)। তারপরে শুরু হবে শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে। সুন্নিদের দৃষ্টিতে কাদিয়ানি ও শিয়ারা মুসলিম নয়, তারা ভ্রান্ত, নাস্তিক। মধ্যপ্রাচ্যের দুই একটা দেশ ব্যতীত শিয়ারা টিকতে পারবে বলে মনে হয় না। ইরান-ইরাক থেকে শিয়াদের বিতাড়িত করা সহজ হবে না। কেননা ইরান ততদিনে পারমানবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হবে।

ইরান হচ্ছে খাঁটি শিয়া ঘাঁটি। আবার ইউরোপ আমেরিকার পারমানবিক আস্ত্রের অধীশ্বর হবে সুন্নি মুসলিমরা। পারমানবিক অস্ত্র জঙ্গিদের বা উগ্রপন্থিদের হাতে চলে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের হাতে তা গেলে তার ব্যবহার হবারই কথা। শিয়ারা পরাজিত হবার পর শুরু হবে সুন্নিদের অভ্যন্তরীণ কলহ। সে কলহ হতে পারে সুন্নিদের মাযহাব নিয়ে। চারটি মাযহাব আছে। যেমন- হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি। এক মাযহাবের অনুসারীরা অন্য মাযহাবের অনুসারীদের সহ্য করবে না। এ রূপ মারামারি সহিংস ঘটনা দীর্ঘকাল ধরে চলবে।   তারপরে যদি কোন দিন বোধোদয় হয়, সেদিন মানুষ ধর্মের কলহ থেকে বেরিয়ে আসবে প্রতিষ্ঠা করবে মানবতাবাদ তথা মানবধর্ম। তখন পৃথিবীতে ধর্মের বিভেদ থাকবে না। মানুষের পরিচয় হবে মানুষ হিসেবে, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-ইহুদি হিসেবে নয়। সেদিন হয়তো লালনের স্বপ্ন পূরণ হবে।লালন বলেন,  এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে  যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে। 

রেজাউল করিম, সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ,  সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।



শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Tanmoyhasan - (Gazipur)
প্রকাশ ০৭/০৬/২০২১ ০৮:২৭পি এম