About Us
শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
Md. Nayeem Uddin Khan
প্রকাশ ১৬/১১/২০২০ ০৯:১২এ এম

বাঙালির 'জিলাপি' হলো পশ্চিমা দেশের আড়াই প্যাঁচের 'জাহাঙ্গিরা'

বাঙালির 'জিলাপি' হলো পশ্চিমা দেশের আড়াই প্যাঁচের 'জাহাঙ্গিরা' Ad Banner

জিলাপি বা জিলিপি এক মজার মিষ্টি খাবার। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে যথা ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশে এই মিষ্টান্নটি জনপ্রিয়। বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে জিলাপি পাওয়া যায় না।

একবার এক মিষ্টি রসবিশিষ্ট, গোলাকৃতি, চক্রাকার প্যাঁচবিশিষ্ট খাবার হাজির করা হয়, ভোজনরসিক মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সামনে। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর সেই মিষ্টি খেয়ে এতটাই বিমোহিত হয়ে যান যে, নিজের নাম জুড়ে দেন সেটির সঙ্গে।

মিষ্টিটির নাম হয় 'জাহাঙ্গিরা'। আর সেটির সংযুক্তি ঘটে মুঘল বাদশাহদের খাদ্যতালিকায়। রাজকীয় এই মিষ্টিটিকে অবশ্য আমরা অন্য একটি নামে চিনি। তা হলো জিলাপি বা জিলিপি।

জিলাপির উদ্ভব যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ই ঘটেছে, তা কিন্তু বলা যায় না। কেননা 'অক্সফোর্ড কম্প্যানিয়ন টু ফুড' বইয়ে দাবি করা হয়েছে, জিলাপির সর্বাধিক পুরনো লিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় মুহম্মদ বিন হাসান আল-বোগদাদীর লিখিত ১৩শ শতাব্দীর রান্নার বইতে।

যদিও মিসরের ইহুদিরা এর আগেই খাবারটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিল। ইরানে এই মিষ্টান্ন জেলেবিয়া নামে পরিচিত। যা সাধারণত রমজান মাসে গরীব-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

এদিকে লেবাননে 'জেলাবিয়া' নামের একটি প্যাস্ট্রি পাওয়া যায়। যদিও সেটি বৃত্তাকার নয়, বরং আঙুলসদৃশ। তুরস্ক, গ্রিস, সাইপ্রাসেও জিলাপির আলাদা আলাদা সংস্করণ পাওয়া যায়। এজন্য আমরা ধরে নিতে পারি যে এটির উৎপত্তি মূলত পশ্চিম এশিয়ায়। 

সেই থেকেই মুসলিম বণিকদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে এটি। ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসে তুর্কি, ফারসি, আরব ও মধ্য এশিয়ার প্রভাবের কথা কারো অজানা নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গ অর্থাৎ দুই বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টি খাবারগুলোর মধ্যে জিলাপি একটি।

ঐতিহাসিক অ্যাংলো-ভারতীয় শব্দকোষ 'হবসন-জবসন'-ও এ ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করে। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতীয় শব্দ 'জালেবি' এসেছে আরবি শব্দ 'জুলেবিয়া' এবং ফারসি শব্দ 'জুলবিয়া' থেকে। পরবর্তীতে 'জালেবি' শব্দ থেকেই 'জিলাপি' শব্দটি এসেছে।

তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রশ্নটি হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ঠিক কবে নাগাদ জিলাপি এসে পৌঁছায় বা এতোটা জনপ্রিয়তা লাভ করে? এই রহস্য উন্মোচনের কিছু সূত্রের দেখা মিলতে পারে ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে। 

১৯৪৩ সালে বিশেষজ্ঞ পরশুরাম কৃষ্ণ গোড়ের প্রকাশিত 'দ্য নিউ ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি' জার্নাল থেকে। সেখানে তিনি দাবি করেন, ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে সংস্কৃত ভাষায় রচিত গ্রন্থ গুন্যগুনবধিনীতে জিলাপি প্রস্তুত করার জন্য যে উপাদানের তালিকা পাওয়া তার সঙ্গে আধুনিক জিলাপি রন্ধন প্রক্রিয়ার যথেষ্ট মিল রয়েছে।

পরশুরাম কৃষ্ণ গোড় তার জার্নালে আরও অনেক চমকপ্রদ তথ্য জানিয়েছেন। তথ্যগুলো হলো, ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে জৈন সাধু জিনসূর রচিত 'প্রিয়ংকর-রূপকথা' গ্রন্থে ধনী বণিকদের নিয়ে আয়োজিত একটি নৈশভোজের বর্ণনায় জিলাপির উল্লেখ ছিল। তখনকার দিনের ভারতে জিলাপি পরিচিত ছিল 'কুণ্ডলিকা' বা 'জলবল্লিকা' নামে। 

তারপর রানি দীপাবাঈয়ের সভাকবি রঘুনাথ দক্ষিণ ভারতের খাবার নিয়ে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে 'ভোজন কৌতূহল' নামক রন্ধন বিষয়ক যে ধ্রুপদী গ্রন্থ রচনা করেন, সেখানেও তিনি জিলাপি তৈরির পদ্ধতি উল্লেখ করেন। তবে আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, ভারতীয় উপমহাদেশে জিলাপির বয়স কম করে হলেও ৫০০ বছর তো হবেই।

ধারণা করা হয়, মধ্যযুগে ফারসি ভাষী তুর্কিরা ভারত আক্রমণ করার পরই কোনো একটা সময়ে জিলাপির প্রচলন হয় এই অঞ্চলে। বর্তমানে এখানেও ঠিক পশ্চিম এশিয়ার মতোই জিলাপির হরেক নাম রয়েছে। যেমন: জালেবি, জিলবি, জিলিপি, জিলেপি, জেলাপি, জেলাপির পাক, ইমরতি, জাহাঙ্গিরা ইত্যাদি।

পশ্চিম এশিয়ায় আদি জিলাপির সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের জিলাপির কিছু বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যও রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার জালাবিয়াতে ময়দা, দুধ, দই দিয়ে একটু অন্যভাবে ফেটানো হতো। তার সঙ্গে দেয়া হতো মধু ও গোলাপ জলের সিরাপ।

তবে ভারতীয় উপমহাদেশে এসেই প্রথম জিলাপি হয়ে উঠেছে মুচমুচে, রঙিন এবং আঠালো। জিলাপির কিছু নিজস্বতা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশেও। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পুরান ঢাকার চকবাজারে উৎপন্ন জিলাপির এক ঐতিহ্যবাহী সংস্করণ। যা 'শাহী জিলাপি' নামে খুবই পরিচিত। যেগুলোর একটি জিলাপি এক থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। 

এই বিশেষ জিলাপি ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ সারা বাংলাদেশেই দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। 'শাহী' শব্দটি দ্বারা রাজকীয় দ্রব্যাদি বোঝায়।  এই জিলাপির সৃষ্টি হয় ঢাকার নবাবদের শাহী রান্নাঘর থেকে। 

তারা এই জিলাপি তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে খেতেন। তারপর থেকেই এই জিলাপির ধারণা এসেছে। কয়েক দশক আগে পুরান ঢাকায় এটির বাণিজ্যিক প্রচলন শুরু হয়।   

এই জিলাপি এখন বিয়ে কিংবা অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠানে রসনাবিলাসের অন্যতম প্রধান উপকরণ। আর রমজান মাসের ইফতার হিসেবেও ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এটি। জিলাপি বর্তমানে বাংলার গণমানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। 

কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনকে জিলাপির প্যাঁচের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। তেমনই হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানে জিলাপির তুলনা দেয়া হয়েছে নারীর মোহনীয় খোঁপার সঙ্গেও। জিলাপি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, মান-অভিমানও নেহাত কম হয় না এদেশে।

মোটা জিলাপি নাকি চিকন জিলাপি এ নিয়ে যেমন বিরোধ সৃষ্টি হয়। তেমনই রমজান মাস এলেই দেশবাসী দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় ইফতারের মুড়ি মাখায় জিলাপির উপস্থিতি প্রসঙ্গে। তবে জিলাপি নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি যতই হোক, যতই চারিদিকে নিত্যনতুন মিষ্টান্ন বা ডেজার্টের আগমন ঘটুক, তবুও জিলাপির কদর হয়তো কোনোদিনই কমবে না।

এই জিলাপি আমাদের স্মৃতিকেও উস্কে দেয়। ছোটবেলায় জিলাপি খেতে গিয়ে রসে মাখামাখি হওয়া সেই দিনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। কিংবা জুম্মার নামাজ শেষে মিলাদ পড়তে বসে থাকা জিলাপির লোভে মনে পড়ে যায় সেই মিষ্টি দিনগুলোর কথা।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ