About Us
শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
Md. Asir Uddin
প্রকাশ ৩১/০৮/২০২০ ০২:১৭পি এম

কর্মজীবি শতভাগ নারীই যৌন হয়রানির শিকার

কর্মজীবি শতভাগ নারীই যৌন হয়রানির শিকার Ad Banner

করোনা মহামারীকালীন সময়ে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবি নারীদের যৌন হয়রানি শীর্ষক গবেষণার ফলাফল সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবি নারীদের শতভাগই কোন না কোন সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশে নারীদের প্রতি যৌন হয়রানি, বিশেষ করে করোনা মহামারী-কালীন সময়ে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবি নারীদের যৌন হয়রানির নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। এই সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করে করোনা মহামারী-কালীন সময়ে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবি নারীদের যৌন হয়রানির অবস্থা বোঝার জন্য জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, প্লান ইন্টারন্যাশনাল ও গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের সহায়তায় একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। উক্ত জরিপের ফলাফল তুলে ধরার লক্ষ্যে আজ শনিবার ২৯ আগস্ট, ২০২০, সকাল ১১টায় একটি অনলাইন অভিজ্ঞতা বিবিময় সভার আয়োজন করা হয়।  


অভিজ্ঞতা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব এডভোকেট মো: ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি, মাননীয় ডেপুটি ¯পীকার, বাংলাদেশ জাতীয়  সংসদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব এডভোকেট মো: সামসুল হক টুকু এমপি, সভাপতি পার্লামেন্টিরিয়ান ককাস অন চাইল্ড রাইটস  এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় স¤পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, গ্লোবাল ভাইসপ্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর,দি হাঙ্গার প্রজেক্ট। গবেষণা তথ্য উপস্থাপন করেন  জনাব নাছিমা আক্তার জলি, সম্পাদক, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম।  অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জনাব সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল  এমপি, আদিবা আনজুম মিতা এমপি, জনাব শিপা হাফিজা, ইক্যুয়ালিটি ও রাইটস একটিভিস্ট এবং সোস্যাল এনালিস্ট,  জনাব আফরোজ মহল, ঢাকা এবং পর্টফলিও ম্যানেজার, প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, জনাব শাহিন আক্তার ডলি, সহসভাপতি জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম ও নির্বাহী পরিচালক নারী মৈত্রী এবং জনাব ওয়াহিদা বানু, নির্বাহী পরিচালক, অপরাজেয় বাংলাদেশ।  


নাছিমা আক্তার জলি বলেন, গবেষণার জন্য নমুনা হিসেবে ২০ টি  প্রশ্ন সমম্বলিত একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ২৪ জনের একটি তথ্য সংগ্রহকারী দলের মাধ্যমে এই জরিপ কার্যক্রমটি পরিচালনা করা হয়। প্রাথমিক ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ৩৯০ জন নারীর একটি তালিকা তৈরী করা হয় (রেন্ডম স্যাম্পলিং)। পরবর্তীতে, এই জরিপটিতে যৌন হয়রানি শিকার হয়েছেন এমন ১৩৫ জন কর্মজীবি নারী অংশগ্রহণ করেন। গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় জুলাই, ২০২০ তারিখে।  তথ্য নেয়া হয়, ৮ই মার্চ থেকে ৩০ শে জুন পর্যন্ত।  এই তিন মাসে যে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে তা সংগ্রহ করা হয়। অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৬২ জনের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকার এবং ৭৩ জনের সাথে টেলিফোনের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এছাড়া ৭টি ফোকাস গ্র“প ডিস্কাশন (এফ, জি, ডি) করা হয় যেখানে অংশগ্রহণকারী  ছিলেন মোট ৩৮ জন নারী এবং  সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উর্দ্ধতন পর্যায়ে কর্মরত ১১ জন নারীর সাথে কেআইআই (কী ইনফরমেন্ট ইন্টারভিউ) করা হয়।


তিনি গবেষণার কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে বলেন, অংশগ্রহণকারী ১৩৫ জন নারীর শতভাগই নিজ কর্মস্থলে কোনো না কোনো ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। তাদের মধ্যে ৪১.৪৮ শতাংশ ২-৩ বার, ২৫.৯৩ শতাংশ নারী ৪ থেকে ৫ বার এবং ২২.৯৬ শতাংশ নারী ১ বার করে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ৮.৮৯ শতাংশ নারী এই সময় কালে ৬ থেকে ১০ বার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১৩৫ জনের মধ্যে ৬১ জন শারীরিক ¯পর্শের মাধ্যমে (৪৫.১৯ শতাংশ), ৮০ জন মৌখিকভাবে (৫৯.২৫ শতাংশ) সরাসরি যৌন আবেদনের শিকার হয়েছেন। ৬৪ জন অর্থাৎ ৪৭.৪১ শতাংশ নারী, ৬০ জন (৪৪.৪৪ শতাংশ) সুপারভাইজার দ্বারা,  ৮৮ জন (৬৫.১৯ শতাংশ) ম্যানেজার/বস কর্তৃক, ৮ জন (৫.৯৩ শতাংশ) নারী তাদের নিয়োগকর্তার দ্বারা হয়রানি হয়েছেন। অংশগ্রহণকারীদের ৫২ জন (৬২.৯৬ শতাংশ) মনে করেন নারীদের অধঃস্তন অবস্থানের মানসিকতা অন্য কথায় বলা যায় পূরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে।  ১১৮ জন  (৮৭.৪০শতাংশ) মনে করেন নারীরা প্রতিবাদ করেনা, ১০৭ জন মনে করেন (৭৯.২৫   শতাংশ) আইনী সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে এই বিষয়ে কার্যকরী নীতিমালা এবং অভিযোগ দায়েরের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির অভাব,  ৫৭ জন (৪২.২২ শতাংশ) মনে করেন করোনা কালীন সময়ে নারীদের আর্থিক বা সামাজিক অবস্থাকে দুর্বল ধরে নিয়ে পূরুষরা এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। 


গবেষণায় আরো দেখা যায়, নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে যৌন হয়রানির বিষয়ে অভিযোগে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে ১১০ (৮১.৪৮ শতাংশ) জন  বলেন  তারা অভিযোগ করেননি বা নিয়োগকারীকে জানানো হয়নি। ১৯ জন (মাত্র ১৪.০৭ শতাংশ) নারী বিষয়টি নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে জানিয়েছেন। গকেষণঅয় উত্তরদাতাদের মধ্যে ৪৬ জন (৩৪.০৭ শতাংশ) নারী বলেছেন তাদের সংস্থায়/ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা রয়েছে বলে জানেন। তবে তাদের মধ্যে, মাত্র ১৫.৫৬ শতাংশ নারী নীতিমালা গুলো দেখেছেন বাকীরা পলিসি দেখেননি বা পড়েননি বলে জানিয়েছেন। উত্তরদাতাদের একটি বড় অংশ অর্থ্যা  ৮৯ জন জানেনই না কর্মক্ষেত্রে যৌণ হয়রানী বিষয়ক নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বা এ স¤পর্কে হাইকোর্ট এর একটি গাইডলাইন আছে। গবেষনায় অংশগ্রহণকারী মধ্য থেকে ১১৮ জন (৭৯.৪০ শতাংশ) মনে করেন যে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন। শতকরা ৮৫.১৯ নারী বলেছেন আইন হলেই হবেনা, এটি যথাযথভাবে প্রযোগের মাধ্যমে শা¯ির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে


শিফা হাফিজা বলেন, নারী নির্যাতনের প্রধান কারন   নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্য না করা। নারীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছিল সেটাকে আইন হিসাবে মানা উচিত ছিল, সেটাও আমরা করিনি। আমি মনে করি যারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন দায়দায়িত্ব পালন করছেন তাদের নির্দেশনাটি স¤পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য একটা কমিশন হওয়া উচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য জনাব সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, নারীদের প্রতি যোউন হয়রানি বন্ধ করতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া নির্যাতিতা নারীদের জন্য কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থাও করতে হবে।


জনাব এডভোকেট মো: সামসুল হক টুকু এমপি বলেন, এই করোনাকালীন সময়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জরিপ পরিচালনা করার জন্য কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামকে আমি ধন্যবাদ জানাই। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটা আইন প্রণয়ন করার জন্যও আপনারা সহায়তা করে যাচ্ছেন। বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে একটা বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেখানে জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারীদের ওপর এরকম অত্যাচার চলতে থাকলে আমাদের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। 


জনাব এডভোকেট মো: ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি বলেন, নারীর প্রতি যৌন হয়রানি সারা বিশ্বে একটি ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। আপ্নারা এখানে যে সুপারিশগুলো এখানে উপস্থাপন করেছেন এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। আমরা একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করছি এই বছরের মধ্যে আইনটি সংসদে উপস্থাপন করতে পারবো। তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলে হবে না, জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও তৃণমূল পর্যায়ে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে।  ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যৌন হয়রানি হলো একটি খারাপ আচরণ। পৃথিবীর সকল সমাজে সকল স্তরের মানুষের মধ্যে এটি বিদ্যমান। তবে পুরুষতান্ত্রিক অমাজে এর ব্যাপকতা বেশি। নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মনোভাব-ই এর মূল কারণ। তাই মানুষের মন মানসিকতার পরিবর্তন করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 




শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ