About Us
মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১
kamruzzaman
প্রকাশ ২৬/০৮/২০২০ ০৩:৩৩পি এম

গল্পঃ বসন্তদাহ

গল্পঃ বসন্তদাহ Ad Banner

শুক্কুরের মন খারাপ হয়ে গেল ফসলী জমি দেখে। আশ্বিন কার্তিক অথচ একফোঁটাও বৃষ্টি নেই। উর্বরা জমিতে ফসলের খরা। সমস্ত ধান ক্ষেত শুকিয়ে খই হয়ে গেছে। স্বয়ং অন্নদাতার বোধ হয় অনশন। গত বছর অর্থাৎ ১১৭৪ বঙাব্দে ভালো ফসল হয় নি। এক বেলা পেট ভরে আহার করার মতোও হয় নি। যা হয়েছে তা আবার রাজস্ব আদায় কর্মকর্তারা অংকের মতো কষে নিয়ে গেল। অবশিষ্টটুকু রাজা রাজাধিরাজরা তাদের সিপাহি লালন পালনের জন্য নিয়ে গেল প্রায় জোরপূর্বক ভাবে। সাধারণ মানুষের উনুন জ্বলুক বা না জ্বলুক তাদের প্রাসাদ প্রদীপ জ্বলেই হবে। সাধারণ জনতা খায় নাকি উপোস থাকে তাতে কোনো দৃষ্টিপাত নেই। একটি অবরুদ্ধ অবস্থায় প্রতিয়মান বাংলা বিহার উড়িষ্যা।


এদিকে বাংলার সরল আকাশে বৈরী নাশি দশার উপস্থিতি অনেকেই ইতোমধ্যে আচঁ করতে পেরেছে। সেই দুর্দশাটা স্পষ্টভাবে উদিত হল নবাব সিরাজ উদ দৌলার মৃত্যুতে। আর তা সুনিশ্চিতভাবে মূর্ত হল মীর কাসেমের মৃত্যুতে। বাংলার শাসন ভার পুরোপুরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা দখল করার পরেই বৈষম্য - দুর্দশা - চরম আকার ধারণ করে । অত্যাচার সৈরচারিতা নিপীড়ন বাংলার পদে পদে প্রকাশ্য। নবাবের পরাজয়কে শক্তিতে পরিণত করবে মুসলমানরা, এমনটাই ভেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের স্বৈরচারের স্টিমরোল চালাই বিশেষভাবে মুসলমানদের উপর।


পুলিশ, রাজস্ব বিভাগ, সামরিক বিভাগসহ প্রায় সকল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে মুসলমানদের সরিয়ে হিন্দুদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। লুটপাট, খুন, জখম ইত্যাদি অপকর্ম বাংলার এখন সস্তা ব্যাপার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে বাংলার শাসন ভার চলে যাওয়াতে রাজস্ব আদায়ে বর্বরতা তীব্র হল। এমন অভাব অনটন, দুর্দশা, হাভাতেও রাজস্ব বাড়িয়ে দশ টাকা করে দেওয়া হল। ধর্ম - বর্ণ নির্বিশেষে যার ঘাতকী শিকার সাধারণ মানুষ। বেচে থাকার জন্য শুধু অন্নের চিন্তায় শুক্কুরের দশা অতি করুণ। জীবনের সব মৌলিক চাহিদার জন্য ও নয়। শুধু একবেলা একমুঠো ভাতের জন্য।   


১১৭৬ বঙ্গাব্দ। পাড়া পড়শি কারো উনুনে আগুন জ্বলে নি। শুক্কুর আর শুক্কুরের বৌ বিলকিস উঠানে ছেঁড়া কাপড়ে বসে আছে। তিন বৎসর বয়সী তাদের দুটো জমজ মেয়ে জোহরা ও ফাতেমা ছুটে এসে ক্ষুধার দাহে বলতে লাগল " মা! ভাত দে। মা! ভাত দে। " বিলকিস শুক্কুরের দিকে তাকাল। পরে মেয়েদের দিকে তাকাল। হাভাতে ক্ষুধার রাজ্যে একজন আরেক জনের সামনে কংকালসারে পরিণত হচ্ছে। পিতা - মাতার সামনে সন্তানেরা না খেয়ে থাকলে, ক্ষুধায় চিৎকার করলে পিতা - মাতার ভেতরটা কেমন আহাজারিতে ক্রন্দন করে তা বোধ হয় শুক্কুর ও বিলকিস ভালো করেই জানে। বিলকিস ভাত কি করে দেবে?  ভাত তো কোথাও নেই। ছুটি নিয়েছে বাংলার জমিন থেকে। ক্ষুধার যন্ত্রনায় শুক্কুর, বিলকিস, জোহরা, ফাতেমা মাটি খাওয়া শুরু করে দিল। শুধু মাটি নয়, চারিদিকে বিড়াল ইঁদুরও খাওয়া শুরু হয়ে গেছে।


শুক্কুরের ঘরে ধবধবে সাদা রঙের একটি বিড়াল ছিল। ঐ বিড়ালটাকেও পূর্ব বাড়ির ইদ্রিসের বৌ ক্ষুধার পাবকদাহে খেয়ে ফেলল। অন্নপূর্ণা বাংলা একেবারে মহাশশ্মান। মাঠে - ঘাঠে পথে মানুষের নিথর দেহ পড়তে লাগল। স্ত্রী - কন্যাসন্তান ও বিক্রি করা শুরু হয়ে গেল। হাভাতের দংশনে পুরো বাংলায় সুকরুণ চিত্র বর্তমান।  যে সন্তানদেরকে শতো কষ্টের মাঝেও বাংলার সাধারণ পিতামাতা গুলো অসাধারণ ভাবে লালনপালন করত, আজ সেই সন্তানরা পিতামাতার চোখের সামনে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চটপট করে মরে যাবে তা কি সহ্যনীয়? দুর্বিষহ অধুনাকে ভেবে পাথর হয়ে বিলকিস শুক্কুরকে বলল " জোহুরা - ফাতেমার বাপ, আমাকে বেচি দেন।


" বিলকিসের কথা শুনামাত্র শুক্কুরের জগতে বিদ্যুৎ চমকিয়ে বজ্রপাত হল।  - স্বার্থপর!  - খোদার কসম স্বার্থপর না। আপন পেট ভরাতে দাসী বান্দি হব না। সন্তানের পেট ভরাতে নিজেকে বিসর্জন দেব।  শুনে শুক্কুর রাগে ক্ষুধায় ক্ষিপ্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বের হওয়ার প্রাক্কালে দ্যাখে জোহরা - ফাতেমা বিদীর্ণ মুখে আন্ধারী চোখে ক্ষুধার শাসনে মাটিতে চিত হয়ে শুয়ে আছে। পেটের সাথে পিঠ লেগে আছে। কান্নারোল নেই, থাকার কথাও নেই। খাওয়া নেই, শক্তি কোথায় থেকে পাবে। কান্না করতে হলেও শক্তি লাগে। অভাব অনটন ক্ষুধা, কচি সন্তানের রুগ্ন অবস্থা শুক্কুরকে ভুলে যেতে সহায়তা করল স্ত্রীর স্পর্শ - প্রেম - ভালোবাসা। অভাব ক্ষুধা এই রকমই। যারা একে অতি নিকট থেকে প্রত্যক্ষ করেছে তারা নিশ্চয় জানে এর ভয়াবহতা কতো গভীর, কতো হৃদয় বিদারক।


সন্তানেরা যাতে টের না পাই সেই জন্য শুক্কুর বিলকিসকে ঘোর তিমিরে নিভৃতে নীরবে চোখের জল পেলতে পেলতে বিলকিসকে নিয়ে গেল রাজস্ব আদায় কর্মকর্তা নরেন্দ্র সেনের কাছে। যেতে যেতে বিলকিস শুধু শুক্কুরের পানে বারংবার দেখল। আর নীরবে বোবাকান্না করল। বিলকিসকে বিক্রি করে দিল। বিলকিস বেশ সুঠামি দেহী সুদর্শনা ছিল। বিলকিসকে পেয়ে নরেন্দ্র সেন অসভ্য লালসে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিল। শুক্কুর মস্তক নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নরেন্দ্র সেন আঙুল দিয়ে ইশারা দিয়ে পাইক পেয়াদাদের হুকুম দিল কিছু খাওয়া দাওয়া দিয়ে শুক্কুরকে বিদায় করে দিতে। পাইক পেয়াদারা হুকুমের বরখেলাপ করল না। শুক্কুর সর্বংসহা রূপে ফিরে এসে সন্তানের মুখে বিনিময়ে পাওয়া আহার তুলে দিল। এক সন্ধ্যা আহার করে আরেক সন্ধ্যা উপোস থেকে কয়েকদিন কাটাল। মেয়েদেরকে বলল তাদের মা নাইওর গেছে নানার বাড়ি। ভাত নিয়ে কয়েকদিন পরে চলে আসবে। 


কতো মিথ্যে, কতো নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। শুক্কুর ও কোথাও একমুঠো ভাতের সন্ধান পেলে,  সেখানে সহস্র ক্ষুধার্তের ভীড় থেকে জোর করে তিনকাহন ভাত হলেও ছিনিয়ে আনে। দুই কাহন দুই মেয়েকে খাওয়ায়, এককাহনের অর্ধাংশ নিজে খায়, অন্য অর্ধাংশ দ্বিভাগ করে দুই কন্যাকে খাওয়ায়। খুব ছোট ফাতেমা ও জোহরা। কেউ কিনবেও না। তাই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে যেভাবে পারছে সেই ভাবে শুক্কুর আহার যোগাচ্ছে। এদিকে দুর্ভিক্ষ মহামারি আকার ধারণ করল। ভাতের অভাবে মানুষ কংকালসার হয়ে মরে যাচ্ছে। পথে পথে শকুনের উপদ্রব বাড়ল। মানুষের পচা দেহ ভক্ষণের জন্য। বিষ ছড়িয়ে পড়ল জননীর বাতাসে। রোগ জীবাণু যমদূত বেশে চারিদিকে উদয় হল।     শেষ বিকেল থেকে ফাতেমা ও জোহরার গায়ে বিষণ জ্বর এল। শুক্কুর সারারাত মেয়েদের সেবা যত্ন করল। মায়ের অনুপস্থিতি বুঝা গেল না।


কিন্তু সন্তান তো মা পাগল। মা মা বলে ফাতেমা ও জোহরা অস্পষ্ট শব্দে কয়েকবার ডাকল। মেয়েদের মুখে মা মা ডাক শুনে শুক্কুর নীরবে নি:শব্দে কেঁদে উঠল। কারণ শুক্কুর জানে মায়ের আসনে কখনো পিতা বসতে পারে না। মায়ের অভাব কখনো পিতা পূরণ করতে পারে না। তারপরেও দীঘল রাত্রি বিনিন্দ্রায় কাটায় মেয়েদের সেবা যত্ন করে। কিন্তু জ্বর একটুও কমল না। ক্ষুধার প্রভাতে শুক্কুর লক্ষ্য করল ফাতেমা ও জোহরার শরীরে গুটি গুটি কি জানো উদয় হল। সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল এল। এর মধ্যেই ফাতেমা ও জোহরার শরীরে গুটিবসন্ত স্পষ্ট হয়ে গেল। রাতের মধ্যে আরো বেড়ে গেল। দুজনের আপাদমস্তকে এমনভাবে গুটিবসন্ত উঠেছে যে তিল পরিমাণ জায়গাও খালি নেই। সমস্ত শরীর গুটিবসন্তের দখলে। আর এই খবর মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ল। সবে শোনামাত্র ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করল। শুক্কুর প্রায় অর্ধপাগল হয়ে গেল।


যাদের জন্য বৌ বিক্রি করল, আহার লুট করল, আজ তারাই মরণব্যাধি গুটিবসন্তে আক্রান্ত। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস। একদিকে ক্ষুধা, অন্যদিকে তীব্র জ্বর, তার উপরে গুটিবসন্তের তীব্র জ্বালায় ফাতেমা ও জোহরা মৃতপ্রায়। প্রাপ্ত বয়স্করা যে মরণব্যাধির ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়, সেখানে তো ফাতেমা - জোহরা শিশু। শিশু হয়ে কি করে ফাতেমা জোহরা সহ্য করবে? তাই তো ফাতেমা ও জোহরা চিরতরে ঘুমিয়ে গেল। শুক্কুর দুই কন্যাকে উঠানে এনে শোয়ায়ে রাখল। শুক্কুর পৃথিবীর সমস্ত ব্যথা বুকে নিয়ে কংকাল দেহে নি:শব্দে মেয়েদের নিথর দেহের পাশে বসে আছে। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। অন্ন বস্ত্র কিছুই নেই। তার উপরে মরণব্যাধি গুটিবসন্তের শাসন। পাড়া পড়শি সকলে পালিয়ে চলে গেল।


কিন্তু শুক্কুর তো পিতা। পিতা কি করে পালিয়ে যাবে মেয়েদের একা করে। ফাতেমা - জোহরা জীবিত নেই, তা শুক্কুর এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না।  গুটিবসন্ত হওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যু ( সেই সময় এর চিকিৎসা ছিল না)। এটি ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্ত রোগীর পাশে থাকলে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাই মহল্লার কিছু যুবক শুক্কুর বাঁচাতে, তাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু শুক্কুর যায় নি। কারণ, শুক্কুর মনে করল ফাতেমা ও জোহরা তাকে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল " বাবা! আমাদেরকে একা পেলে যেওনা। "  শুক্কুর দৌড়ে এসে ফাতেমা ও জোহরার লাশের পাশে বসে পড়ল।  লেখকঃ কবি ও কলামিস্ট 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Md. Al-Amin Rana - (Dhaka)
প্রকাশ ২১/০৬/২০২১ ০১:১৫পি এম
Shamem Ahmed - (Dhaka)
প্রকাশ ১৯/০৬/২০২১ ১২:৩২পি এম
MD Rayhan Kazi - (Dhaka)
প্রকাশ ১৩/০৬/২০২১ ১০:০৮পি এম
MD hedaetul Islam - (Sirajganj)
প্রকাশ ১১/০৬/২০২১ ০২:২৭পি এম