Monir
প্রকাশ ০৯/০৩/২০২২ ০১:২২পি এম

লাশ কাটা ও ভিসেরা নমুনা সংগ্রহে বেসরকারি লোক

লাশ কাটা ও ভিসেরা নমুনা সংগ্রহে বেসরকারি লোক
ad image
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের অধীনে থাকা লাশঘরে মৃত নারীর সঙ্গে ‘বিকৃত যৌনাচার’ হওয়ার পরও টনক নড়েনি চমেক কর্তৃপক্ষের। ২৮ ফেব্রুয়ারি লাশঘরের পাহারাদার সেলিমকে গ্রেফতারের পর লাশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এরপরই সেই লাশঘরটি বন্ধ করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে জরুরি বিভাগের ভেতর একটি কাচঘেরা কক্ষে অপঘাতে মৃতদের রাখা হচ্ছে।

পরে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় চমেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অধীনে থাকা মর্গে। সেখানেই দীর্ঘ সময় লাশ রাখা হয়। আর এই মর্গে লাশকাটা, ভিসেরা নমুনা সংগ্রহ এবং মৃত নারীর দেহ থেকে ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করছেন বেসরকারি লোক। নিরাপত্তার অভাবসহ নানা সংকট রয়েছে মর্গ ব্যবস্থাপনায়। তবে চমেক কর্তৃপক্ষ বলছে, একজন বেসরকারি লোক সরকারি কর্মচারীর সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করছে। নিরাপত্তার দিক থেকেও কোনো সমস্যা দেখছে না কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. সাহেনা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, সরকারিভাবে ডোমের কোনো পদ নেই। চমেক মর্গে লাশ কাটা-সেলাইয়ের জন্য দুইজন সরকারি কর্মচারী রয়েছে। তারা গত এক বছর ধরে সেখানে কাজ করছেন। তাদের হেল্পিং হ্যান্ড (সাহায্যকারী) হিসাবে প্রাইভেটভাবে একজন রয়েছে। তাছাড়া মর্গের নিরাপত্তার দিক থেকেও সমস্যা নেই। তবে চমেকের মর্গে গিয়ে অধ্যক্ষের বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, লাশের জন্য মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। এদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনটি লাশ কাটা ও সেলাইয়ের কাজ করেছেন দায়িত্বরত ডোম কদম আলী। কথা বলে জানা গেছে, তিনি কোনো সরকারি কর্মচারী নন। ২০০৭ সাল থেকে মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে মর্গে লাশ কাটা, সেলাই করা, মর্গ পরিষ্কার ও লেখালেখির কাজ করে আসছেন তিনি। সরকারিভাবে দুজন কর্মচারী রয়েছেন। এরা হলেন সমীরণ নাথ ও মিলন কান্তি নাথ। এর মধ্যে ৭ মাস আগে সমীরণ ও দেড় মাস আগে যোগ দিয়েছেন মিলন। লাশ কাটা-সেলাইয়ে অভিজ্ঞতা না থাকায় কদম আলীর ওপরই নির্ভর করতে হয় সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া মর্গের নিরাপত্তায় নেই কোনো দারোয়ান। বর্তমানে মর্গের দায়িত্বে থাকা সমীরণ গেট খোলা-বন্ধের কাজটি করছেন।

জানা গেছে, কোনো নারী মারা যাওয়ার আগে ধর্ষণ হয়েছিল কি না তা জানাতে লাশ থেকে ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া বিষক্রিয়ায় মারা গেছে কিনা তা জানতে লাশের ভিসেরা নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। সরকারি কোনো কর্মচারী না হয়েও গুরুত্বপূর্ণ এসব কাজও করতে হয় নিয়োগবিহীন কদম আলীকে। এর আগে হারেছ নামে অপর একজন ব্যক্তিও কাজ করতেন এই মর্গে। ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুমন মুৎসুদ্দি হারেছকে মৌখিকভাবে কাজে রেখেছিলেন। লাশ আটকে রেখে টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠায় গত ২ মার্চ থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

চমেক মর্গের ডোম হিসাবে দায়িত্ব পালন করা কদম আলী বলেন, চমেকের মর্গে সরকার নির্ধারিত কোনো ডোম নেই। আমি নিজেও সরকারি কর্মচারী না। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডোম নেপালের কাছ থেকে আমি এই কাজ শিখেছি। ২০০৬ সাল থেকে আমার ওস্তাদের (ডোম নেপাল) সঙ্গে জেনারেল হাসপাতালে লাশ কাটার কাজ শুরু করি। ২০০৭ সালে তিনি (নেপাল) মারা যাওয়ার পর চমেক ফরেনসিক বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান আমাকে এখানে (চমেক মর্গে) নিয়ে আসেন। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজার টাকা বেতনে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, লাশের নিরাপত্তায় প্রতিনিয়ত একজন দায়োয়ান থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিসি ক্যামেরাও প্রয়োজন। মর্গের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদার করতে কর্তৃপক্ষকে বলে আসছি। কিন্তু তারা এসব কথা কানে তুলছেন না। এছাড়া মহিলা লাশ কাটার সময় একজন মহিলা সহযোগী থাকা প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারিক কার্যক্রমের জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিজ্ঞতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দুটোই থাকা প্রয়োজন। জবাবদিহি নেই এমন ব্যক্তি এসব কাজে জড়িত থাকলে যে কোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ