About Us
মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১
Shaymol Chandra Roy
প্রকাশ ২৫/০৮/২০২০ ১০:২৮এ এম

বিভূতির ছোটগল্প

বিভূতির ছোটগল্প Ad Banner

সাহিত্যে যতগুলি শাখা রয়েছে তার মধ্যে ছোটগল্প অন্যতম এবং সবচেয়ে নবীনতর। বঙ্কিমচন্দ্র কিছু ছোটগল্প লিখলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুরকে প্রথম সফল ছোটগল্পকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি গল্পের মাধ্যমে নিজেকে এবং চারপাশকে প্রকাশের  যে  শৈল্পিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলা সাহিত্যে তেমনটা আর দেখা যায় না। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের ভিত্তি স্থাপন করেছেন আর বিভূতিভূষণ প্রশাখা স্বরূপ উৎকর্ষ সাধন করে সৌন্দর্য প্রদান করেছেন। বিভূতিভূষণের চরিত্র-সৃষ্টি, পরিবেশ সৃষ্টি ও বাচনভঙ্গি প্রকাশের শক্তির কারণে তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জীবদ্দশায় প্রায় দুইশত পঁচিশটি ছোটগল্প লিখেছেন যার মধ্যে রয়েছে অতিপ্রাকৃত, সামাজিক, প্রকৃতি ও মানুষ, ঐতিহাসিক, গার্হস্থ্য, ভ্রমণকাহিনীমূলক গল্প এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের গল্প। 


দরিদ্রতাও যে পাঠককুলের মনোরঞ্জনের খোরাক হতে পারে সেটি করে দেখিয়েছেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। অধিকাংশ গল্পে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে তুলে ধরেছেন সুনিপুণভাবে। প্রতিটি গল্পের শেষে আগ্রহ সৃষ্টি করার ক্ষমতা অসাধারণ। সামন্ততান্ত্রিকতা ও জাত প্রথার প্রভাব গল্পে সুস্পষ্ট। নিজেকে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ গণ্য করে নিচু শ্রেণির মানুষের প্রতি করুণা ভিক্ষা প্রদানের চিত্র চিত্রিত করেছেন অকপটে। তিনি তাদের সাথে মিশেছেন থেকেছেন তবুও কোন এক অদৃশ্য বাঁধা এক করতে পারেনি তার মানসপট। অন্তজজনের চর্চিত সংস্কারের প্রতিফলন দেখা যায় বেশিরভাগ গল্পে। অবাঞ্চিত স্নেহবাৎসল্যের উপদ্রব রয়েছে গল্পগুলিতে। কিন্তু তা সমস্যার সৃষ্টি করেনি বরং পাঠকের কল্পনাজগতে এক কৃত্তিম ভূবন তৈরি করে মানবিক করে তুলে। এখানে বিভূতির গল্পেে সার্থকতা।


শ্রীশচন্দ্র দাসের মতে, "ছোটগল্প আকারে ছোট হইবে বলিয়া ইহাতে জীবনের পূর্ণাবয়ব থাকিতে পারে না; জীবনের খন্ডাংশকে লেখক যখন রসনিবিড়  করিয়া ফুটাইতে পারেন, তখনই ইহার সার্থকতা। কিন্তু বিভূতিভূষণের গল্পের এবং চরিত্রগুলির বিস্তার দীর্ঘকালব্যাপী কোনওটি জীবনব্যাপী। যেমন- একটি কোটাবাড়ীর ইতিহাস। এমন অনেক গল্প রয়েছে। তবে কি বিভূতিভূষণকে গল্পকার হিসেবে ব্যর্থ বলবো? 


না, সেটি বলা ঠিক হবে না, প্রায় দেড়শতাধিক গল্প ছোটগল্পের মানদন্ডে উত্তীর্ণ──অন্যান্যগুলি প্রশ্নবিদ্ধ থাকতেই পারে। এটিও হতে পারে যে, এই সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে তিনি আরেকটি নতুন ঘরানার ছোটগল্পের সূচনা করতে চেয়েছিলেন।


প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর বিভূতিভূষণ দুই বছর সন্ন্যাসীর মত জীবন-যাপন করেন। নিজের ইচ্ছায় গ্রামে থেকেই কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময় (যদিও চাকুরিস্থল ছিল শহরেই)। সেহেতু প্রকৃতিকে দেখেছেন, গ্রাম্য পরিবেশকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে।  রূপহলুদ' গল্পগ্রন্থের 'ছোটনাগপুরের জঙ্গলে' একটি গল্পের মাধ্যমে প্রকৃতি প্রেমের দৃষ্টান্ত পাই। তিনি বলছেন, "শহর বা তীর্থের জাকজমক গোলমাল আমার ভালো লাগে না। আমি চিরদিন নির্জন ভালোবাসি। তাই পাহাড়, নদী, বন-জঙ্গল দেখে বেড়াই।" গল্পের কথা হলেও কথাটি সত্য। সেটি না হলে গ্রামে থেকে সাহিত্য চর্চা ও জীবিকা নির্বাহের প্রয়াস তিনি করতেন না। রমা বন্দোপাধ্যায় আমার স্বামী বিভূতিভূষণ গ্রন্থে লিখেছেন যে, 


"আমরা যখন ইছামতীতে নাইতে যাই, ঘুরি তার পাড়ে পাড়ে, বাবলার নুয়ে পড়প শাখা যেখানে জল ছোঁয় ছোঁয়, ঝরে পড়া বাবলার ফুল যেখানে তীরের মতো ছুটে চলে ইছামতীর ঘোলাজলের বুকের ওপর দিয়ে। সজল হলুদ ফুলগুলি, ভাটির দিকে চলতে থাকে স্রোতের সঙ্গে। পাড়ে দাঁড়িয়ে কি সুন্দর যে লাগে!" বনে-বাদাড়ে নিসর্গের নিবিড় আলিঙ্গনে হারিয়ে যেতেন। বিভূতিভূষণের সাথে তিনিও বেরিয়ে পড়তেন বনে-জঙ্গলে, গভীর অরণ্যে।  বিভূতিভূষণও ছিলেন ভ্রমণপিপাসু অস্থির চিত্তের মানুষ।


প্রেম, প্রকৃতি ও ঈশ্বর তার লেখার প্রধান শক্তি। প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্যের ফলে তার গল্পগুলি হয়ে উঠেছে প্রকৃতির সমান বৈচিত্রময়। সরল প্রকাশভঙ্গি ও ঋজু শব্দশৈলি জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ। আপাতদৃষ্টিতে সরল গদ্য মনে হলেও এর ভাবনা সুগভীর এবং সমাজের শিকরের সাথে যুক্ত। পাঠ করলে বুঝতে পারি যে তিনি অতি সহজ ভাষায় লিখেছেন। কিন্তু এই সহজ ভাষায় লিখতে গিয়ে ওনাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। অন্নদাশংকর রায় বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের " সিধুচরণ' গল্পের বরাত দিয়ে তার ছোটগল্প সম্পর্কে বলেছেন, "ওরকম একটি ছোটগল্প লেখা সহজ কর্ম নয়। বিভূতির অনেকগুলি গল্পই দেখতে সহজ কিন্তু আসলে কঠিন।" হ্যা, কথাটি সত্যই বটে। অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার নিব চালিয়েছেন এসব সরল গদ্যে। 


বিভূতিভূষণের প্রকৃতি ও দারিদ্র শ্রেণি মানুষের প্রতি আনুগত্য   স্ত্রীকে লিখিত চিঠিপত্র থেকে জানা। তিনি চাকরির সুবাদে এখানে ওখানে ঘুরছেন। কোন চরিত্র ভেসে আসছে চোখের সামনে, তাই রঙ মিশিয়ে পাঠযোগ্য করে তুলছেন সাহিত্যের ভাষায়। শিকারী, কবি, বিক্রমখোল গল্পগুলি সেবিষয়গুলিরই প্রতিনিধিত্ব করে। একদিস স্ত্রী রমা বন্দোপাধ্যায়কে চিঠিতে লিখছেন, "চারদিকে শৈলশ্রেণি মন্ডিত অপূর্ব দৃশ্য-- বন, খুব জঙ্গল। কাল এক যায়গায় বেড়াতে গিয়ে ভালুকের ও বাইসনের পায়ের চিহ্ন লক্ষ্য করেছি। এখানে বাঘের বড় উপদ্রব শুরু হয়েছে আজ ২-৩ মাস। গত ১৫দিনে তিনজনকে বাঘে নিয়েছে"


ঠিক এটিই স্থান পেল তার "বাঘের মন্তর" গল্পে। এভাবেই নানা বাস্তব জীবনে ঘটিত নানা কাহিনির প্রবেশ ঘটেছে তার গল্পে। রমা বন্দোপাধ্যায়ও মনে করতেন লেখক কল্পনা করে লিখেন না বরং চারপাশে যা দেখেন তাই লিখেন। ভৌতিক ও পৌরাণিক গল্পেও হাত চালিয়েছে সুনিপুণভাবে। "তালনবমী" গল্পগ্রন্থটি এরকমই ধাঁচের গল্প দিয়ে সাজানো। তাছাড়াও 'স্বপ্ন বাসুদেব, রাজপুত্র, ভৌতিক পালঙ্ক, কবিরাজের বিপদ, রহস্য, অশরীরী, ভূত,তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প সমৃদ্ধ করেছে আমাদের গল্প ভান্ডারকে। মরফোলজি রোমান্স, খোলগল্প এগুলি রচিত হয়েছে রোমান্টিক ধারণাকে কেন্দ্র করে। 


তৎকালীন সমাজের নারীদের পিছয়ে থাকা কিংবা পুরুষদের নারীদের প্রতি যে মনোভাব সেগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি দিনের কথক, মনি ডাক্তার, উমারাণী, উপেক্ষিতা গল্পে। মনি ডাক্তার গল্পে  একজন ডাক্তার তার বউকে ভেবে মনে করছেন, "তাহার একটু সেবা পাইতে ইচ্ছা হয়"। নারীদের শুধুমাত্র কাজের মানুষ ভাবার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।


সেটি দেখা যায় উমারাণী গল্পের মাধ্যমে। উমা চরিত্রটি চিরায়ত দাসবৃত্তির নারীত্বের প্রতীক। তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ, তার মনোবৃত্তিক প্রয়াস এবং চাহিদার সীমা গন্ডীর মধ্যে মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার পুরুষকে সেবা-শুশ্রুষা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে প্রথাগত নিয়ম মেনে নেবার স্বাভাবিকতা। ঠিক এরই ক্ষেদোক্তি উপেক্ষিতা গল্পে লেখকের দিদি চরিত্রটির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলছেন, " কত পরাধীন আমরা জানো তো ভাই।" 


বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের ছোটগল্পও লিখেছেন। নীলগঞ্জের ফালমন সাহেব, অনুশোচনা, অন্তর্জলি, থনটন কাকা ইত্যাদি। ব্রিটিশদের উপনিবেশিকতাবাদের ফলে তারা সারা পৃথিবী ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশ-বিভুঁই হয়ে পড়ে তাদের বাসস্থান। যার ফলে সংস্কৃতি ও জীবন যাপন প্রণালীও ধারণ করতে হয় সেই দেশগুলির সংস্কৃতির অনুসারে। নীলগঞ্জের ফালমন সাহেবও তেমন একটি গল্প। এখানে ফালমন চরিত্রটি জন্মসুত্রে বিট্রিশ হলেও ভাষা ও সংস্কৃতিগত দিক থেকে ভারতীয়। সামাজিকীকরণ ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে ফালমন নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করে না। থনটন কাকা গল্পটির মূল প্রেক্ষাপট খনিজ সম্পদ। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মূল্যবান খনিজ সম্পদ। থনটন নামক ভূতাত্বিক করেন তারই খোঁজ। 


আদিবাসী নেত্রী এলিশাবা কুইকে কেন্দ্র  বোতাম গল্পটি রচিত হয়েছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম চরিত্র এলিশাবা কুই। কনট্রাকটরের(লেখক) সাথে নাটকীয় পরিচয় ও নাটকীয় সাক্ষাৎ গল্পটির আবেদন বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ। লেখকের গল্পটিকে তুচ্ছার্থক পরিণতিতে নিয়ে গেলেও এর আবেদন কমেনি। আদিবাসীদের আন্দোলনের পথিকৃতকে তুলে ধরার সিনেম্যাটিক ভঙ্গি আকর্ষণীয়।


শেষকথা, বিভূতির গল্পে একটি সীমাবদ্ধতা বার বার পরিলক্ষিত হয়। সেটি হলো, প্রায় প্রতিটি গল্পের চরিত্রগুলিকে অসীম দূর্ভোগের শিকার হতে হয় এবং সবার পরিণতি হয় করুণ।  যাক সে কথা,  বিভূতিভূষণের গল্প আলোচনা কিংবা সমালোচনা করার সাধ্য আমার নেই।  তা না থাকা সত্ত্বেও সে দুঃসাহস দেখালাম কিঞ্চিত আলোচনার মাধ্যমে। আমি যা বলেছি তা আমার দৃষ্টিকোন দিয়ে। তা কোন প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। সত্যানুসারে আমার কথাগুলি পরিবর্তন করা যেতেই পারে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Md. Al-Amin Rana - (Dhaka)
প্রকাশ ২১/০৬/২০২১ ০১:১৫পি এম
Shamem Ahmed - (Dhaka)
প্রকাশ ১৯/০৬/২০২১ ১২:৩২পি এম
MD Rayhan Kazi - (Dhaka)
প্রকাশ ১৩/০৬/২০২১ ১০:০৮পি এম
MD hedaetul Islam - (Sirajganj)
প্রকাশ ১১/০৬/২০২১ ০২:২৭পি এম