About Us
শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
তরিকুল ইসলাম
প্রকাশ ২৪/০৮/২০২০ ০৮:২৩পি এম

রিয়েল হিরো আখির দু`আখিতে মানবিক স্বপ্ন

রিয়েল হিরো আখির দু`আখিতে মানবিক স্বপ্ন Ad Banner

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় সংস্থা (ইউএনওসিএইচএ) কর্তৃক ‘রিয়েল লাইফ হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত খুলনার রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের কিশোরী আখি বাকী জীবন মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। নিজেকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি সমাজের ঝরে পড়া শিশুদের ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। কোভিড-১৯ এর মহামারী রোধে কম দামে মাস্ক তৈরি করে গরিব মানুষের কাছে বিক্রি করায় ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবিক দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ তাকেসহ বাংলাদেশের ৪ জনকে এই ‘রিয়েল লাইফ হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া আঁখি এখন রূপসা তথা খুলনার গর্ব।


জমিজমার অভাবে উপজেলার বাগমারা গ্রামের খালা বাড়িতে ঘর তুলে বসবাস আখিদের। বাবা মাসুদ মোল্লা ও মা আনোয়ারা বেগম স্থানীয় মাছ কোম্পানিতে কাজ করতেন। এ্যাজমার কারণে পিতা মাসুদ মোল্লা মাছ কোম্পানীর কাজে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। মা আনোয়ারার একার রোজগারে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ৫ম শ্রেণী পাশ করা আখি দারিদ্রতার কবল থেকে রক্ষা পেতে লেখা-পড়া বন্ধ করে মা ও বোনের সাথে মাছ কোম্পানীতে কাজে যোগ দেয়।


বয়সে শিশু হওয়া আখি চিংড়ির মাথা ছাড়ানো কাজ করতে থাকে। এমতাবস্থায় ২০১৮ সালে ওয়ার্ল্ড ভিশন পরিচালিত ‘জীবনের জন্য প্রকল্পের’ আবেদা সুলতানার নজরে পড়ে আখি। এসময় আবেদা সুলতানা আখিকে মাছ কোম্পানী থেকে বের করে এনে স্কুলে ভর্তি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বয়স বেশি হওয়ায় স্কুলে ভর্তি করতে না পেরে তাকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের ‘জীবনের জন্য প্রকল্পের’ মাধ্যমে কাপড় সেলাইয়ের কারিগরি ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে আখিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ওই প্রকল্প থেকে তাকে একটি সেলাই মেশিন ও কিছু থান কাপড় দেয়া হয়।


শুরু হয় আখির নতুন জীবন। কোভিড-১৯ শুরুর দিকে যখন চড়া মূল্যে মাস্ক বিক্রি হতে থাকে তখন আখি নিজের তৈরি মাস্ক স্বল্প মূল্যে বিক্রি করার পাশাপাশি অসহায় মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করতে থাকে। শুধু মাস্ক নয় তার নিপুন হাতে পুথি দিয়ে ব্যাগসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে বাড়ির সামনে ছোট একটি দোকান করে বিক্রি করতে থাকে। কোভিড-১৯ রোধে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় তার এই কর্মকান্ড ওয়ার্ল্ড ভিশনের মাধ্যমে পৌঁছে যায় জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় সংস্থায়। 


আখি জানায়, যখন করোনাভাইরাসের শুরুর দিকে তখন বাজারে মাস্ক পাওয়া যাচ্ছিল না। কিছু কিছু দোকানে পাওয়া গেলেও সেগুলোর দাম ছিল উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের এলাকার দরিদ্র মানুষ সেগুলো কিনতে পারতো না। যখন জানলাম যে করোনা থেকে মুক্ত থাকতে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে তখন আমি নিজেই মাস্ক তৈরি করে কম দামে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যাতে এলাকার দরিদ্র মানুষ মাস্ক পরতে পারে। যাদের একদম টাকা পয়সা নেই তাদেরকে বিনামূল্যে আমার তৈরিকৃত মাস্ক দিয়েছি। তিনি বলেন আমাকে জাতিসংঘ যে স্বীকৃতি দিয়েছে, তার সম্পুর্ণ অবদান আবেদা আপা ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের। সেদিন যদি উনি আমাকে মাছ কোম্পানী থেকে তুলে এনে হাতের কাজ শেখায়ে সহায়তা না করতেন, তাহলে আজ আমার স্থান কোথায় হতো জানিনা। 


আখি আরো জানায়, বাবা-মা ও আমরা তিন ভাই-বোন খালার জমিতে ঘর তুলে বসবাস করি। মাথা গোঁজার জন্য নিজেদের কোন জমি-জমা নেই। আজকের এই সাফল্য পরিপূর্ণ সফলতা আসবে সেই দিন, যেদিন আমি একটি গার্মেন্টস করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ঝরে পড়া শিশুসহ অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারবো। তিনি বলেন-ইতিমধ্যে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদী ও তার সহধর্মীনি শারমিন সালাম আমার স্বপ্ন পুরণে আমাকে আশ^াস দিয়েছেন। 


ওয়ার্ড ভিশনের সাউর্থান বাংলাদেশ রিজিওনের রিজিওনাল কমনিকেশনস্ কো-অর্ডিনেটর সুবর্ণ চিসিম এ প্রতিবেদককে বলেন, আজকের যে আখি সে আমাদের জীবনের জন্য প্রকল্পের একটি সুবিধাভোগী মেয়ে। এই প্রকল্পে আমরা ঝড়ে পড়া শিশুদের নিয়ে কাজ করি। আখি পুনরায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার উপযোগী না থাকায় আমরা তাকে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি মেশিন ও সারঞ্জম প্রদান করি। তার মধ্যে অনেক প্রতিভা রয়েছে।


বর্তমানের করোনা পরিস্থিতিতে তার অবস্থান থেকে কিছু করার চিন্তা নিয়ে সে নিজে মাস্ক তৈরি করে অনেক কম মূল্যে ও ফ্রি বিতরণ করে। এই সুন্দর উদ্যোগটি আমরা আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরি। সেখান থেকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় সংস্থা (ইউএনওসিএইচএ) তথ্য সংগ্রহ করে রিয়েল হিরো উপাধিতে ভ’ষিত করে। এজন্য আমি খুবই খুশি। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্খার সাথে যুক্ত করে দেয়ার ব্যবস্থা করবো। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করি। 


উপজেলা নির্বাহি অফিসার নাসরিন আক্তার বলেন, বর্তমান করোনা পরিস্খিতিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের আখিকে ইউএনওসিএইচএ কর্তৃপক্ষ ”রিয়েল হিরো” মনোনিত করায় আমি আখিসহ তার পরিবারকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আখিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদান করা হবে। এছাড়া আখির চাহিদা অনুযায়ী ভবিষ্যতে আমাদের সাধ্যের সর্বোচ্চটা করা হবে ইনশাআল্লাহ।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ

Verified আই নিউজ বিডি ডেস্ক
প্রকাশ ১৮/০৬/২০২১ ০৬:৪৮পি এম