SATYAJIT DAS - (Habiganj)
প্রকাশ ১৩/০১/২০২২ ০৭:৩৩পি এম

Importance of Makar Sankranti: পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি'র শুভ সময় ও গুরুত্ব

Importance of Makar Sankranti: পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি'র শুভ সময় ও গুরুত্ব
ad image
পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উৎসব পালন করা হয়। এই দিন বাঙালিরা বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। তার মধ্যে পিঠা খাওয়া, ঘুড়ি উড়ানো অন্যতম। সারাদিন ঘুড়ি উড়ানোব পরে সন্ধ্যায় পটকা ফুটিয়ে ফানুস উড়িয়ে উৎসবের সমাপ্তি করে। ভারতের বীরভূমের কেন্দুলী গ্রামে এই দিনটিকে ঘিরে ঐতিহ্যময় জয়দেব মেলা হয়। বাউল গান এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। মূলত জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি ক্ষণ। 'মকরসংক্রান্তি' শব্দটি দিয়ে নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়ে থাকে।

ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী 'সংক্রান্তি' একটি সংস্কৃত শব্দ,এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। ১২টি রাশি অনুযায়ী এরকম সর্বমোট ১২টি সংক্রান্তি রয়েছে।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে,বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় এই দিবস বা ক্ষণকে ঘিরে উদযাপিত হয় উৎসব।নেপালে এই দিবসটি মাঘি নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে উদযাপিত হয়। অবশ্যিকভাবে দেশ ভেদে এর নামের মতোই উৎসবের ধরনে থাকে পার্থক্য।বাংলাদেশের পুরান ঢাকায় পৌষসংক্রান্তি সাকরাইন নামে পরিচিত।

ভারতবর্ষের মতো একটি উষ্ণ অঞ্চলে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামপ্রদ সময় শীতকাল। এখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার এবং অন্যান্য উপহার ছাড়াও পৌষমেলার মাধ্যমে পৌষসংক্রান্তি উদ্যাপিত হয়। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বাউল গানের আসর বসে। এছাড়াও এই দিনে ঢাকার নবাবগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গরু দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে চন্দ্রখোলা ও বিল্পপল্লী সবুজ সংঘ্যের মাঠে জমজমাট আয়োজন করা হয়।প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব পৌষ পার্বণ বা মকর সংক্রান্তি,যা পৌষ মাসের শেষ দিন পালন করা হয়। গত দু'বছর ধরে করোনা ভাইরাসের কারণে অন্যান্য একাধিক উৎসবের ছন্দ যেমন পতন হয়েছে,এবছরও সেই আনন্দে ভাটা পড়তে চলেছে একই কারণে। তবে হিন্দু ধর্মে,এই উৎসবকে ঘিরে শোনা যায় নানা লোককথা।
 
সংক্রান্তি'কথাটির অর্থ গমন করা। নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ করাকে সংক্রান্তি বলা হয়। শুভ কাজগুলি এদিন থেকেই শুরু হয়।

নতুন ফসল তোলার উৎসবই মকর সংক্রান্তি। এদিনে দক্ষিণায়ন শেষে সূর্যের উত্তরায়ণ পালিত হয়।
মকর সংক্রান্তিতে মহাভারতে পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যা ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন। আবার শোনা যায় সূর্য এদিন নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনির বাড়ি এক মাসের জন্য ঘুরতে গিয়েছিলেন।তাছাড়াও শোনা যায় এই বিশেষ দিনে দেবতাদের সঙ্গে অসুরের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। অসুরদের বধ করে তাদের কাটা মুন্ডু পুঁতে দেওয়া হয়েছিল মন্দিরা পর্বতে। সেজন্যেই অশুভ শক্তির বিনাশ হয়ে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা হয় এইদিনে,বলেই বিশ্বাস করেন সকলে।

মনে করা হয়, মকর সংক্রান্তিই মরসুমের নতুন ফসল ওঠার প্রথম দিন ও শীতকালের শেষ দিন। সংক্রান্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালিদের বেশ কয়েকটি নিয়মাচার। এই বিশেষ দিন দূরে কোথাও যাত্রা করা ঠিক না এবং অন্য কোথাও গেলেও রাতে বাড়ি ফিরে আসার নিয়ম। সংক্রান্তির আগে বাঙালিরা ঘরবাড়ি, রান্নার বাসন পরিষ্কার করেন এবং অশুভ শক্তিকে বিদিয় জানান।

ভারতের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সাগরদ্বীপে প্রত্যেক বছর আয়োজন হয় গঙ্গাসাগর মেলার। কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে পুণ্যস্নান ও বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয়। গঙ্গায় পবিত্র স্থান করতে সেখানে দূর দূর থেকে আসেন লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী। এই বছর করোনা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই রয়েছে কড়া নিয়মবিধি। জোড় দেওয়া হচ্ছে 'ই-স্নান' -এর উপর।

এছাড়াও পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় মেলা হয়। বীরভূমের কেন্দুলি গ্রামে এ দিনটি জয়দেবের মেলা হয়।বাংলাদেশের ঢাকা,সিলেট,চট্টগ্রাম সহ নানা জায়গায় মাছের মেলা ও পিঠা উৎসব উদযাপিত হয়। জয়দেবের মেলায় বাউল গান হলো মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এদিনই টুসু উৎসব বা মকর পরবে মেতে ওঠেন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও সংলগ্ন এলাকার মানুষ। নাচে গানে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন তারা। টুসু বা মকর উপলক্ষ্যে এলাকায় একাধিক মেলাও বসে। যার অন্যতম পোরকুলের মেলা।

ভারতের পশ্চিমবাংলায় এই বিশেষ দিনটিকে পৌষ সংক্রান্তি বা পৌষ পার্বণ নামে পরিচিত। গ্ৰাম বাংলার বিভিন্ন বাড়িতে আলপনা দেওয়া হয়। তাছাড়াও ঘরে ঘরে পিঠে- পুলি-পায়েস তৈরি করে নতুন মাসকে স্বাগত জানানো হয়। সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই চলে তার প্রস্তুতি। এই পৌষ সংক্রান্তিতে মূলত চালের গুড়ো, ময়দা, নারকেল, দুধ, গুড় দিয়ে বিভিন্ন পিঠে তৈরি হয়। তার সঙ্গে তিল, কদমা এইসব খাওয়ার রীতিও রয়েছে।

গ্ৰেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী হিন্দুদের প্রধান উৎসবগুলির মধ্যে মকর সংক্রান্তি বছরের সর্বপ্রথম উৎসব। এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পালিত হয়। অঞ্চল ও জায়গা ভেদে মকর সংক্রান্তির নিয়মকানুন হয়তো আলাদা কিন্তু এর মাহাত্ম্য হিন্দুদের কাছে সব জায়গায় এক। ঘুড়ি ওড়ানোর জন্যে মানুষ এক জায়গায় একত্রিত হয় এই সময়।বেশিরভাগ বছর মকর সংক্রান্তির দিন অপরিবর্তিত থাকে। সাধারণত ১৪ জানুয়ারই পড়ে মকর সংক্রান্তির দিন। এবছরও এই বিশেষ দিনটি পড়েছে ১৪ জানুয়ারি,শুক্রবার।

মকর সংক্রান্তি ২০২২ -এর শুভ সময়ঃ-
জ্যোতিষী অরবিন্দ শুক্লা জানাচ্ছেন,এবছর ১৪ জানুয়ারি ও ১৫ জানুয়ারি দুটি দিনই পুণ্যকাল ও স্নান,দানশীলতার জন্য শুভ। তবে সবচেয়ে বেশি শুভ ১৪ জানুয়ারি।ভারতের বেনারসের পঞ্চাঙ্গে শুভ সময় সন্ধ্যার সময় বলা হলেও,ভারতের রাজধানী দিল্লির পঞ্চাঙ্গে বলা হয়েছে দুপুরের সময়। উত্তরায়ণ কালের সংক্রান্তির শুভ সময় ১৪ জানুয়ারি শুক্রবার দুপুর ২:৪৩ থেকে ৫:৪৫ পর্যন্ত হবে। জ্যোতিষাচার্য,মানুষকে তাদের বাসস্থান এবং পঞ্চাঙ্গের ভিত্তিতে মকর সংক্রান্তি উদযাপন করার পরামর্শ দিয়েছেন।

মকর সংক্রান্তির শুভ দিনে যে কাজগুলো করবেনঃ-
(১) এই দিনে নদীতে স্নান করা শুভ বলে মনে করা হয়,তবে তা সম্ভব না হলে বাড়িতে জলে কালো তিল রেখে স্নান করতে পারেন।
(২) এই উৎসবে শনিদেবকে খুশি করা খুবই শুভ বলে মনে করা হয়। কালো তিল দান করে আপনি তাঁকে খুশি করতে পারেন।
(৩) এই দিনে তিল দিয়ে জল পান করুন। এছাড়াও, তিলের লাড্ডু খাওয়া এবং তিলের তৈরি যে কোনও জিনিস খাওয়া খুব শুভ বলে মনে করা হয়।
(৪) মকর সংক্রান্তিতে খিচুড়ি খাওয়াও খুব শুভ বলে মনে করা হয়। উপবাসের পর প্রসাদ হিসেবে খিচুড়ি খেতে পারেন।

যে কাজগুলো করবেন নাঃ-
(১) এই দিনে দানের বিশেষ স্বীকৃতি রয়েছে। যদি কোনও ভিক্ষুক বা গরীব আপনার বাড়িতে কিছু চাইতে আসে,তবে ভুল করেও তাঁকে খালি হাতে পাঠাবেন না। তাঁকে খিচুড়ি এবং অন্যান্য জিনিস দান করুন।
(২) হিন্দু ধর্মে,এই দিনটিকে শুভ বলে মনে করা হয়, তাই এই দিনে যে কোনও ধরণের নেশা থেকে দূরে থাকা উচিত। অ্যালকোহল বা অন্যান্য নেশাদ্রব্য সেবন করা অশুভ বলে মনে করা হয়।

(৩) যাঁরা উপবাস রাখেন তাঁরা প্রতিটি নিয়ম মেনে চলেন,কিন্তু যাঁরা উপবাস রাখেন না,তাঁদেরও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। স্নান ও পূজার আগে কোনওভাবেই খাবার খাওয়া উচিত নয়।

মকর সংক্রান্তির দিনে কোন কোন জিনিস দান করা শুভঃ-
(১) তিল:- মকর সংক্রান্তির দিনে তিল দান করার প্রথা রয়েছে। কালো তিল ও তিলের তৈরি বস্তু দান করলে পুণ্য লাভ করা যায়। শনিকে প্রসন্ন করার জন্য তিল দান করা উচিত। এছাড়াও সূর্য এবং বিষ্ণুও তিল দান করলে প্রসন্ন হন। মকর সংক্রান্তির দিনে তিল দান করার পিছনে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। নিজের ক্ষুব্ধ পিতা সূর্যের পুজো করার জন্য তিল ব্যবহার করেছিলেন শনি। এর থেকে আনন্দিত হয়ে সূর্য তাঁকে আশীর্বাদ দেন যে যখনই তিনি মকর রাশিতে আসবেন,তখন তিল দিয়ে পুজো করলে ও তিল দান করলে তিনি প্রসন্ন হবেন। তিল দান করলে শনি দোষ দূর হয়।

(২) খিচুড়ি:- এদিন খিচুড়ি দান করলে পুণ্য ফল লাভ করা যায়। এদিন চাল ও কালো বিউলি ডাল দান হিসেবে দেওয়া হয়। কালো বিউলি ডালের দান করলে শনি প্রসন্ন হন। এর ফলে ব্যক্তির ওপর থেকে শনি দোষ দূর হয়। চাল দান করলে অক্ষয় ফল লাভ করা যায়।

(৩) গুড়:- মকর সংক্রান্তির দিনে গুড় দান করা, গুড়ের তৈরি জিনিস খেলে বিশেষ ফল লাভ করা যায়। জ্যোতিষে গুড় বৃহস্পতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এদিন গুড় দান করলে শনি,বৃহস্পতি ও সূর্য প্রসন্ন হন।

(৪) নুন:- এদিন নুন দান করার প্রথাও প্রচলিত আছে। শাস্ত্র মতে মকর সংক্রান্তির দিন নুন দান করলে অশুভ শক্তির বিনাশ হয়। খারাপ সময় কেটে যায়। তাই মকর সংক্রান্তিতে নুনের দান শুভ।

(৫) গরম পোশাক:- কোষ্ঠিতে শনি ও রাহুর দোষ দূর করার জন্য মকর সংক্রান্তির দিনে উলের কাপড় দান করা শুভ। এদিন দরিদ্র অসহায় বা কোনও আশ্রমে উলের পোশাক,কম্বল দান করা উচিত।
(৬) দেশি ঘি:- মকর সংক্রান্তির দিনে দেশী ঘি ও এর দিয়ে তৈরি মিষ্টি দান করা শুভ। ঘী বৃহস্পতি ও সূর্যের সঙ্গে সম্পর্রকযুক্ত। এ কারণে মান-সম্মান, যশ ও সুখ-সুবিধা লাভ করার জন্য দেশী ঘি দান করা উচিত।

(৭) রেড়ি:- গঙ্গা স্নানের পর দরিদ্র ব্যক্তিদের রেড়ি দান করা উচিত।

(৮) নতুন বস্ত্র:- দরিদ্র ও অসহায়দের এদিন নতুন বস্ত্র দান করা উচিত।

(৯) পাখিকে দানা খাওয়ানো:- মকর সংক্রান্তির দিনে পাখিকে দানা খাওয়ানো শুভ।

(১০) গরুকে সবুজ ঘাস খাওয়ানো:- গরুকে সবুজ ঘাস খাওয়ালে পুণ্য অর্জন করা যায়।

(১১) তেলের দান:- মকর সংক্রান্তির দিন সূর্যের পুজো করার পর শনিকে প্রসন্ন করার জন্য তেল দান করা উচিত।

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ