Feedback

সাহিত্য

বর্ষাকালের একাল সেকাল

বর্ষাকালের একাল সেকাল
August 14
12:10pm
2020
Rejaul karim
Sadarpur, Faridpur:
Eye News BD App PlayStore

আজকে যাকে বন্যা বলে অভিহিত করি বিশ শতকের আশির দশক পর্যন্ত তা স্বাভাবিক পানিও ছিল না। স্বাভাবিক পানি এর চেয়ে বেশি ছিল। বর্ষার পানিতে আমন ধানের ক্ষেত কতই না শোভা পেত, গ্রামগুলো ছোট ছোট দ্বীপের মতো উঁকি মারত। শুকনো মৌসুমে বাড়িগুলো দেখাত টিলার মতো। গ্রামের বাড়িগুলো ভূমি থেকে ১০-১২ হাত উচু ছিল মানে মাটি কেটে উচু করা হত। গ্রামের সব পরিবারেই এক বা একাধিক নৌকা থাকত। নৌকা না থেকে উপায় কী? ঘর থেকে পা ফেলতে নৌকা লাগত। ফসল ঘরে তুলতে নৌকা, মাছ ধরতে নৌকা, স্কুলে যেতে নৌকা, হাটে যেতে নৌকা, বেড়াতে যেতে নৌকা, এ বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি যেতে নৌকা, এমনকি পায়খানা করতেও নৌকা লাগত।


যার নৌকার সামর্থ ছিল না তার ভেলা (কলাগাছ দিয়ে ভেলা বনানানো হত) ছিল। আষাঢ়-শ্রাবনকে আমরা বর্ষাকাল বলি। আসলে বর্ষাকাল ছিল চার মাস (আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র ও আশ্বিন)। এ চারটি মাস নৌকাই ছিল আমাদের বাহন, জীবনের সঙ্গি। প্রত্যেকদিন নৌকা নিয়ে, নৌকা বেয়ে আমরা স্কুলে যেতাম। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে নৌকা বাইচ লেগে যেত। বর্ষাকালে প্রচুর নৌকা বাইচ হতো। আমরা উপভোগ করতাম। আমি নিজেও নৌকা বাইচে অংশগ্রহণ করতাম। একই নৌকায় হিন্দু-মুসলমান মাল্লা থাকত। বাইচের নৌকায় বোল হত। বোলের উত্তরে মুসলমানরা বলতাম আল্লাহবোল, হিন্দুরা বলত হরিবোল। মানুষ নৌকা নিয়ে দূর দূরান্তে চলে যেত নৌকা বাইচ উপভোগ করতে। ফরিদপুর অঞ্চলের বাইচের নেীকাগুলোর নাম ছিল ছিপ নৌকা, বাছারি, জয়নগরি প্রভৃতি। সদরপুর উপজেলার খেজুরতলায় চৈতারকূলে ভাদ্র মাসের এক তারিখে বড় বাইচ হত।


বাইচ উপলক্ষে খেজুরতলার আশেপাশের কয়েকগ্রামে আত্মীয়স্বজন বেড়াতে আসত, কতই না আনন্দ হত! যে চৈতারকূলে চৈত্রমাসে দশ হাত পানি থাকত, সে চৈতারকূল এখন পলিবালি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। চৈতারকূলের মাছের স্বাদই ছিল আলাদা!   ঘরের পাশেই ছিল পানি। আর পানিতে ছিল মাছ। পানিতে জাল পেতে রাখলেই পাওয়া যেত মাছ। জালও ছিল হরেক রকমের। পাড় জাল, সরপুঁটি জাল, কৈয়া জাল, খেপলা জাল, হ্যাংলা জাল, মই জাল, ঘোটা জাল ইত্যাদি। চিংড়ি, বেলে জাতীয় মাছ ধরার জন্য ছিল দোয়ারি। আমি দোয়ারি পেতে চিংড়ি ধরতাম। খালে বিলে ও নদীতে ছিল ভেসাল। এছাড়া একটু বড় মাছ মারার জন্য ছিল বিভিন্ন ধরণের কোচ, ফুলকোচ, যুতি।


ক্ষেতভরা থাকত আমন ধান। দিনের বেলা নৌকা নিয়ে বড় মাছ খোঁজা হত। ধান ক্ষেতে মাছ শেওলা ক্ষেত বা নড়াচড়া করলে বাতাস কম থাকলে ধানগাছ নেড়ে উঠত। তখন নেড়ে উঠা ধানগাছের জায়গায় জুতি বা কোচ দিয়ে কোপ মেরে মাছ ধরা হত। ছোট মাছ মারার জন্য ছিল টেঁটা।  কোমর পানি, বুক পানিতে পাট ও আখ কাটা হত। অনেক সময় ঠাঁই না পাওয়া না গেলে তা ডুব দিয়ে কাটা হত। পানিতে পাট কেটে ক্ষেতের পানিতে তা ডুবিয়ে রাখা হত। কিছুদিন পর পচন ধরলে কোমরপানি বরাবর মই বেঁধে তার উপর দাঁড়িয়ে পাট আঁশ ছাড়া করা হত। সাথে সাথে পাট পানিতে ধুয়ে নৌকায় রাখা হত। পাটখড়ি পরে আনা হত। বর্ষার পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে আমন ধান বেড়ে উঠত।


সে সাথে বেড়ে উঠত শাপলা, শাপলাফুল। শাপলাফুলে বাংলার গ্রাম-গঞ্জে একটা আলাদা মৌন্দর্য, রূপ ফুটে উঠত। সে রূপ-সৌন্দর্যের জন্যই শাপলাকে জাতীয় ফুল করা হয়েছিল। শাপলার ফুল থেকে ঢেপ হত। ঢেপ থেকে হত খই। তখন বর্ষায় বেশি পানি না হলে মানুষ চিন্তায় পড়ে যেত। কেননা পানি ছাড়া দেশীয় আমন ধান হতে পারত না। আমন ধানই ছিল একমাত্র ভরসা। কেননা তখন ইরিগেশন শুরু হয়নি। বর্ষায় পানি নেই মানে আমন ধান নেই। 


এখন দেশে বর্ষাও নেই, পানিও নেই। মাটি কেটে ভিটে তৈরি না করে মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি করে। একটুখানি পানি হলেই তা তলিয়ে যায়। আর তাকে বলে বন্যা। পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়া যাচ্ছে না, পাট কাটতে হয় শুকনো জমিতে, তা মাথায় বা ভ্যানে করে নিতে দূর দূরান্তে জাগ দিতে। খালে বা ডোবার পঁচা পানিতে পাট জাগ দিতে হয়, যে পানি অস্বাস্থ্যকর। আগে বর্ষায় পানি হত। পানিতে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো এবং তা ধোয়া কত আরাম এবং স্বাস্থ্যকর।


পানিতে জমি প্লাবিত হত, জমি এমনিতেই উর্বর হত, সার দিতে হত না। দেশে বর্ষা নেই, পানি নেই। যা একটু হয় তাকে বলে বন্যা। মিডিয়া পড়ে ঝাঁপিয়ে। নদীতে পানির গভীরতা নেই ২০ হাত। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলে বেড়ায় পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগে মুরব্বিদের নিকট শুনতাম পদ্মায় ৮০ হাত কাছি (মোটা দড়ি) ঠাঁই পায় না। এখন পদ্মার নেই গভীরতা, একটু পানি হলেই বলা হয় বিপদ সীমা অতিক্রম করেছে। নদীর পানির বিপদ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, তখন নদীতে নরমাল পানি থাকত ৫০-৮০ হাত। এখন নদীতে পানি থাকে না দশ হাত, যেখানে সেখানে চর পড়ে আছে, ফেরি, লঞ্চ, ট্রলার চলতে করতে হয় বছর জুড়ে ড্রেজিং।


আবার বছরের পর বছর পলি বালি পড়ে নদীর তীরগুলো গেছে উচু হয়ে। তার উপর পদ্মার দুই তীরের শত শত খাল ও ছোট নদীর মুখে বসানো হয়েছে স্লুইচ গেইট। করা হয়েছে বেড়ি বাঁধ। স্বাভাবিক গতিতে পানি জমিনে ছড়িয়ে পড়তেই পারে না। মাঝেমধ্যে বেশি চাপ হলে বাঁধ ভেঙ্গে হুড়মুড় করে একসঙ্গে পানি ঢুকে পড়ে আর তাকেই মিডিয়া কভারেজ দিচ্ছে বন্যা বলে। এখন বন্যায় যে পানিটুকু হয়, এতটুকু পানি যদি আগে হত, তাহলে মানুষ হাহুতাশ করে মরত। কেননা পানির সাথে ছিল জীবিকার সম্পর্ক। পানি নেই ধান নেই, মাছ নেই, জমির উর্বরতা নেই।  এখন নদীতে পানিও কম, আবার যতটুকু আছে স্লুইচগেইট ও বেড়িবাঁধের কারণে ভেতরে ঢুকতে পারে না। পানি চলে যায় সরাসরি সাগরে।


তারপরে দু’এক সময়ে যখন পানি ঢুকে হুড়মুড় করে ঢুকে, তাতে কিছু এলাকার বাড়িঘর তলিয়ে যায়। আর বলা হয় বন্যা। বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ার কারণ উচু ভিটি তৈরি করে বাড়ি করা হয় না। বাড়ি করা হয় সমতলভূমিতে। নেই নৌকা। পানি নেই নৌকা দিয়ে কী করবে? আগে যে জমিতে বর্ষাকালে ১০ হাত পানি থাকত, মাছে করত দাপাদাপি এখন সেখানে শুকনো। পদ্মা যমুনার দু’ধারের ছোট নদীগুলো পরিণত হয়েছে রুগ্ন নদীতে, হয়েছে ভরাট, খালের অস্তিত্ব যাচ্ছে বিলীন হয়ে। আগে নদীতে যে ঢেউ ছিল, গর্জন ছিল এখন তাও নেই। মানুষের সাথে প্রকৃতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।     


রেজাউল করিম  সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ  সরকারী রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। 

মোবাইল নম্বর ০১৭১৮২২৬০৯৫ 

ইমেইল rejaulkarim1975@gmail.com      

All News Report

সম্পর্কিত সংবাদ

ট্রেন্ডিং

ইউনিয়ন পরিষদের কক্ষে তরুণীকে ধর্ষণ করলেন চেয়ারম্যান

ইউনিয়ন পরিষদের কক্ষে তরুণীকে ধর্ষণ করলেন চেয়ারম্যান

আইরাকে নিয়ে জলকেলিতে মিথিলা

আইরাকে নিয়ে জলকেলিতে মিথিলা

বৃদ্ধার জালে ধরা পড়লো তিন লাখ টাকার ভেটকি মাছ

বৃদ্ধার জালে ধরা পড়লো তিন লাখ টাকার ভেটকি মাছ

রিফাত হত্যা: মিন্নিসহ প্রাপ্ত ১০ আসামির রায় কাল

রিফাত হত্যা: মিন্নিসহ প্রাপ্ত ১০ আসামির রায় কাল

বেড়াতে এসেও ধর্ষণ এর শিকার গ্রেপ্তার ৩

বেড়াতে এসেও ধর্ষণ এর শিকার গ্রেপ্তার ৩

সন্তান জন্ম না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো: তসলিমা নাসরিন

সন্তান জন্ম না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো: তসলিমা নাসরিন

নুরদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

নুরদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

কণ্ঠশিল্পী আকবরের জন্য আজীবন হাসপাতাল ফ্রি করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

কণ্ঠশিল্পী আকবরের জন্য আজীবন হাসপাতাল ফ্রি করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

সাবেক ছাত্রলীগ নেতার দ্বারাই ফাঁস হয় সিলেটের ধর্ষণের ঘটনা

সাবেক ছাত্রলীগ নেতার দ্বারাই ফাঁস হয় সিলেটের ধর্ষণের ঘটনা

আল কুরআনের ৩০ পারার কাব্য অনুবাদ

আল কুরআনের ৩০ পারার কাব্য অনুবাদ

সৌদিআরবে চলতি সপ্তাহ থেকে তুরস্কের পন্য নিষিদ্ধ

সৌদিআরবে চলতি সপ্তাহ থেকে তুরস্কের পন্য নিষিদ্ধ

আমতলীতে মামলা তুলে নিতে বাদীকে বিএনপি নেতার জীবন নাশের হুমকি

আমতলীতে মামলা তুলে নিতে বাদীকে বিএনপি নেতার জীবন নাশের হুমকি

ধর্ষকের যৌনাঙ্গ জনসম্মুখে কর্তন আইন চেয়ে আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়ালেন জালাল

ধর্ষকের যৌনাঙ্গ জনসম্মুখে কর্তন আইন চেয়ে আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়ালেন জালাল

নওগাঁয় এতিমদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালন করলেন যুবলীগ নেতা বিমান

নওগাঁয় এতিমদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালন করলেন যুবলীগ নেতা বিমান

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নিহত ২

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নিহত ২

সর্বশেষ

‘মাল’ এবং ‘হ্যাশের’ মানে কী, জানালেন দীপিকা

‘মাল’ এবং ‘হ্যাশের’ মানে কী, জানালেন দীপিকা

জাপান আত্মহত্যা প্রবণ দেশ, আত্মহত্যার তালিকায় যুক্ত হলেন তারকা তাকেউচি ইউকো

জাপান আত্মহত্যা প্রবণ দেশ, আত্মহত্যার তালিকায় যুক্ত হলেন তারকা তাকেউচি ইউকো

কার্টুন সিরিজ ‘রুদ্র’ এবার যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশেও

কার্টুন সিরিজ ‘রুদ্র’ এবার যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশেও

চলচ্চিত্র ছেড়ে কক্সবাজারে চিত্রনায়িকা মৌসুমী

চলচ্চিত্র ছেড়ে কক্সবাজারে চিত্রনায়িকা মৌসুমী

লকডাউনের পর ডিপজলের সাভারের বাড়িতে জয়া আহসান!

লকডাউনের পর ডিপজলের সাভারের বাড়িতে জয়া আহসান!

রাজ কাপুর ও দিলীপ কুমারের পৈতৃক ভিটা কিনে নিচ্ছে পাকিস্তান সরকার

রাজ কাপুর ও দিলীপ কুমারের পৈতৃক ভিটা কিনে নিচ্ছে পাকিস্তান সরকার

দুই বাংলার জনপ্রিয় নায়িকা নুসরাত ফারিয়া

দুই বাংলার জনপ্রিয় নায়িকা নুসরাত ফারিয়া

জনপ্রিয় জুটি মেহজাবিন-নিশোর সঙ্গে ডিনারের সুযোগ

জনপ্রিয় জুটি মেহজাবিন-নিশোর সঙ্গে ডিনারের সুযোগ

দুই বন্ধুর ধর্ষেণ শিকার দুই বোন

দুই বন্ধুর ধর্ষেণ শিকার দুই বোন

শেষ হলো ‘বিলাপ’র শুটিঙের ওয়েব সিরিজ

শেষ হলো ‘বিলাপ’র শুটিঙের ওয়েব সিরিজ

সুশান্তের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক কথা স্বীকার সারার, বিশ্বস্ত ছিলেন না সুশান্ত

সুশান্তের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক কথা স্বীকার সারার, বিশ্বস্ত ছিলেন না সুশান্ত

রিয়া চক্রবর্তীর জামিন খারিজের আবেদন এনসিবির

রিয়া চক্রবর্তীর জামিন খারিজের আবেদন এনসিবির

বিনা প্রয়োজনে’ কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষেধ

বিনা প্রয়োজনে’ কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষেধ

জাতীয় পরিচয়পত্রের সবকিছু এখন অনলাইনে

জাতীয় পরিচয়পত্রের সবকিছু এখন অনলাইনে

সীমান্তে নিখোঁজ হওয়ার ১১ দিন পর মৃতদেহ উদ্ধার

সীমান্তে নিখোঁজ হওয়ার ১১ দিন পর মৃতদেহ উদ্ধার