শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১
SATYAJIT DAS - (Habiganj)
প্রকাশ ০৯/১০/২০২১ ০৩:৪৬এ এম

Chile took the ear!: কান নিয়েছে চিলে !

Chile took the ear!: কান নিয়েছে চিলে !
সেলিম আহমেদ,বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক।

কবি শামসুর রহমানের বিখ্যাত এক কবিতা ‘পন্ডশ্রম’। কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন হলো- ‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে। কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে, আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।...’। এই কবিতাটি পড়েন নাই এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম।

‘কান নিয়েছে চিলে’-এই প্রবাদও বহুকাল থেকে গ্রামে প্রচলন আছে। অথচ কানে হাত না দিয়েই চিলের পিছনে ছুটে চলছে অতিউৎসাহী কিছু মানুষ। যেমনটা হচ্ছে আমাদের প্রাণের শিক্ষাপীঠ মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার দক্ষিণ লংলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঐতিহ্যবাহী ‘ লংলা আধুনীক ডিগ্রি কলেজে ’।

গত দুইদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহার স্যার নাকি বোরকা পরে কলেজে যেতে নিষেধ করেছেন? তাকে কলেজ থেকে বহিস্কার করতে হবে। অনেকে আবার হুমকিও দিয়েছে স্যারকে যেখানে পাবেন, আক্রমণ করা হবে, এমনকি হত্যারও হুমকি দিয়েছেন অনেকে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে (০৭ অক্টোবর ২০২১)রোজ বৃহস্পতিবার সকালে একটি ধর্মীয় সংগঠনের কুলাউড়ার এক নেতার ফেসবুকে পোস্টটি দেখে ফোন করলাম তাকে আসল ঘটনাটি জানার জন্য।

কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতে-তিনি বলছেন প্রকৃত ঘটনা তিনি জানেন না। আরেকজনের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেখে তিনি পোস্ট করছেন। এরপর ফেসবুকে স্যারের বহিস্কার ও বিচার দাবি করা আরো অন্তত ১০ জনকে ফোন করলাম বিষয়টি জানার জন্য। কিন্তু তারা কেউই প্রকৃত ঘটনা জানেন না বলে জানালেন।

তারা এও বলছেন, ফেসবুকে দেখে তারা নিজেদের ওয়ালে পোস্ট করেছেন। এটাকে ইস্যু বানিয়ে এলাকায় অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন অনেকে। তবে একজনও লোকও খুঁজে পেলাম না যে, সে প্রকৃত ঘটনা জানে বা তার কাছে ঘটনার প্রুফ/প্রমাণ রয়েছে।

প্রকৃত ঘটনা হলো, আমরা যারা এই কলেজে অতীতে পড়েছি বা এখন পড়ছেন কিংবা এলাকার সচেতন মানুষ তারা সবাই জানি শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে লংলা কলেজে রয়েছে অত্যন্ত কড়াকড়ি। রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসে নিয়মিত ড্রেস পরে যেতে হয়, মোবাইল ফোন নিয়ে কলেজে যাওয়া যায় না। ক্লাস করতে হয় নিয়মিত। কলেজের লেখাপড়ার মান অত্যন্ত ভালো। যার ফলে গোঠা মৌলভীবাজারজুড়ে রয়েছে এই কলেজের সুনাম।

কলেজের একাধিক শিক্ষক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, কলেজে প্রতিদিন করা হয় ড্রেস মনিটরিং। সপ্তাহে একজন শিক্ষক ওই ড্রেস মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। চক্রাকারে ঘটনার দিন মাজহার স্যারের দায়িত্ব ছিল ড্রেস মনিটরিং করার।

ওইদিন বেশ কিছু শিক্ষার্থী রংবেংয়ের বোরকা পরে কলেজে এসেছিল। এদের অধিকাংশ কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রথমবর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে এখনো একমাস হয়নি। তখন, মাজহার স্যার বোরকা পরা ওই শিক্ষার্থীদের কলেজের নিয়ম সম্পর্কে বুঝাচ্ছিলেন।

তিনি তাদের বলেন, তোমরা বোরকা পরে এসেছো কানো সমস্যা নেই। বোরকা কলেজের কমন রুমে রেখে কলেজ ড্রেস পরে ক্লাস করতে পারো। (যা অতীতে আমাদের ক্লাসমিটসহ সিনিয়র-জুনিয়র অনেক ছাত্রীকে দেখেছি বোরকা পরে কলেজে আসতো, কলেজে এসে কমন রুমে বোরকা খুলে কলেজ ড্রেস পরে ক্লাস করতো।

আর যদি মনে করো বোরকা পরে ক্লাস করতে চাও, তাহলে কলেজের ড্রেসকোড অনুযায়ী বোরকা বানিয়ে নিও। এখানে আমি দোষের কিছু দেখি না। নবাগত শিক্ষার্থীদের কলেজের শৃঙ্খলা সম্পর্কে জানালো কলেজের দায়িত্ব।

আমি যখন কলেজে পড়তাম তখনকার একটা ঘটনা বলি, প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে আমি এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম। তখন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন শ্রদ্ধেয় মুহিবুল রহমান বুলবুল স্যার। আমি তখন দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ওই সময় প্যান্টে একাধিক পকেট ওয়ালা প্যান্ট বের হয়েছে।

শখ করে আমি একাধিক পকেটওয়ালা একটি প্যান্ট কিনলাম। একদিন ওই প্যান্ট পরে কলেজে গেলাম, বুলবুল স্যার ও যুক্তিবিদ্যা ম্যডামসহ কয়েকজন শিক্ষককে আমরা খুব ভয় পেতাম। তারা যাতে প্যান্ট দেখতে না পারেন সেজন্য লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

বুলবুল দেখে ফেললেন। ডাক দিয়ে নিলেন স্যারের রুমে, কাঁচি বের করে প্যান্টের পকেটগুলো কেটে দিলেন। তখন স্যারের ওপর বিষণ রাগ হলেও পরে বুঝেছি স্যার আমার ভালো জন্য করেছেন। এখানে শৃঙ্খলা শিখেছি বলে আজও সুশৃঙ্খলভাবে থাকতে পছন্দ করি।

কুলাউড়ার রবিরবাজারের লংলা কলেজে পড়েছেন কিংবা ওই এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের অত্যন্ত প্রিয় ব্যাক্তি মাজহার স্যার। তিনি একজন স্বাধীনচেতা, ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ, অত্যন্ত মেধাবী ও সৃষ্টিশীল শিক্ষক। তার কথার যাদু মুগ্ধ করে সবাইকে। কলেজে থাকতে দেখেছি, যাদের ইতিহাস সাবজেক্ট না তারাও তাদের ক্লাসে এসেছেন। তার মনোমুগ্ধকর কথা শোনার জন্য।

মাজহার স্যার চুনারুঘাটের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান। তার আত্মীয়-স্বজন সবাই দেশ বিদেশে ভালো অবস্থানে রয়েছে। শ্রেণীকক্ষের বাইরেও স্যারের সঙ্গে আমার হৃদিক সম্পর্ক থাকায় স্যারের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা আমার। স্যার চাইলে ঢাকায় বিলাশবহুল জীবন যাপন করতে পারতেন। কিছু মাতৃভমির প্রতি অসম্ভব ঠাঁন থাকায় পড়ে আছেন এই অজোঁপাড়া গায়ে।

আমার আরেক প্রিয় শিক্ষক বর্তমানে ভাটেরা কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ আলী তরিক স্যার তার লেখা বলেছেন, জাতীয় পর্যায়ে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়্যীদ স্যার যেমন স্থানীয় পর্যায়ে মাজহার স্যারও তেমন আলোকিত মানুষ গড়ার প্রচেষ্ঠায় লিপ্ত।

আমি স্যারের সঙ্গে পুরোপুরি সহমত পোষণ করছি। একবার মাজহার স্যারকে আমি বললাম, স্যার আপনার আত্মীয় স্বজনতো সবাই দেশ-বিদেশে ভালো অবস্থানে আছেন। আপনি কেন এখানে পড়ে আছেন। স্যার বলছেন, সবাই যদি মাতৃভমিকে ভুলে যাই, তাহলে মাতৃভ‚মির কী হবে। মায়ের প্রতি ভালোবাসার কারনে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের কথা চিন্তা করে আমি এখানে যার।

স্যারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, বোরকা পরে না আসার পাশাপাশি তিনি ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত এনেছেন। আমি এই প্রসঙ্গে একটি কথাই বলছে, আমি ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম। স্যারের এমন কোনো ক্লাস আমি মিস করি নাই।

কখনও ধর্মীয় অনুভ‚তি নিয়ে আঘাত করতে শুনি নাই। ক্লাসে বাইরেও একদশকের বেশি সময় থেকে স্যারের সঙ্গে আমার হৃদিক সম্পর্ক। স্যারের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছি কুলাউড়া এমনকি চুনারুঘাটের বিভিন্ন এলাকার। কিন্তু কখনও ধর্মীয় অনুভ‚তি নিয়ে কথা বলতে শুনি নাই। আমি কেন মাজহার স্যারের কোন চরম শত্রুও বলতে পারবে না যে,তাঁর দ্বারা কোনো মানুষের ক্ষতি সম্ভব,ধর্মীয় অনুভতিতে আঘাত দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠেনা।

পরিশেষে বলব, আসুন আমরা ‘কান নিয়েছে চিলে’ এই প্রবাদ বিশ্বাস না করে ‘চিলের পেছনে ছোটা’ বন্ধ করি। আমরা যেন গুজবে কান না দেই। কলেজের দীর্ঘ গৌরবউজ্জল ঐতিহ্যকে যেন বিনষ্ট না করি।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ