Md Masum Badshah - (Dhaka)
প্রকাশ ১৩/০৯/২০২১ ০১:১৪এ এম

আনন্দ সংশয়ে খুলে গেলো স্কুল-কলেজ

আনন্দ সংশয়ে খুলে গেলো স্কুল-কলেজ
দীর্ঘ দেড় বছর পর মহামারীর সংশয় কাটিয়ে খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রোববার সকাল থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মুখে মাস্ক পড়ে প্রথমবারের মত ক্লাসে মুখোমুখি হবেন। এতে দেশব্যাপী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে।

একইসঙ্গে নতুন রঙে সেজে উঠেছে রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তবে দেশের উত্তর ও মধ্যভাগে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে অনেক বিদ্যালয় এখনই পাঠদানে যেতে পারছে না।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। একই কথা বলছেন, জনস্বাস্থ্যবিদ ও অভিভাবকদের একাংশ। যদিও তারা চান স্থবির শিক্ষা ব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরে আসুক।

অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে। এর আগে জাতীয় কারিগরি কমিটি অন্তত ৮০ শতাংশ শিক্ষক-কর্মচারীকে টিকাদানের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।

এই কমিটি মনে করছে, করোনার শুরু থেকে নানা ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি প্রতি পালনে ব্যর্থতার নজীর আছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বেলায় এই শঙ্কা আরও বেশি দেখা দেবে। অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি শনিবার জামালপুরে বলেছেন, সংক্রমণ বেড়ে গেলে ফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হবে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, করোনার ৫৪৩ দিনের বন্ধে অসংখ্য শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। অনেকের বাল্য বিয়ে হয়েছে। শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। তাদের চিরস্থায়ী বিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।

ইন্টারনেট প্রযুক্তির দুর্বলতায় গ্রামের শিক্ষার্থীরা শহরের চেয়ে ব্যাপক পিছিয়ে পড়েছে। অনলাইন দুনিয়ায় আসক্ত হয়ে অনেকে বিপথে চলে যাচ্ছে। এসব বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তিগ্রাহ্য।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেছেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর কথা বিবেচনা করে দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষা দ্রুত চালু করা হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশা করোনায় শিক্ষার ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে স্কুল, কলেজ খোলার পর তা দ্রুত কাটিয়ে উঠবে।

এরই মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি হিসেবে ১৯টি নির্দেশনা জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। এসব নির্দেশনা মেনেই প্রস্তুতি নিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। একইসাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য আলাদা করে ১৬ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর কয়েকটি বিদ্যালয় ও কলেজের প্রাঙ্গণে পা রাখতেই বোঝা গেল কর্মব্যস্ত সবাই। কেউ বেঞ্চ-টেবিল পরিষ্কার করছেন, কেউ এগুলোতে জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছেন, কেউ আবার স্কুল প্রাঙ্গণে টাঙিয়ে দিচ্ছেন সচেতনতামূলক বিভিন্ন ব্যানার।

ঢাকায় এখন করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়েছে। সেই বিবেচনায় কোথাও যাতে এডিস মশার লার্ভা থাকতে না পারে সে দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

ইস্কাটন গার্ডেন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী বলেন, স্কুল খোলার প্রস্তুতি হিসেবে যাবতীয় কাজ শেষ। সরকারের নির্দেশনা মেনে প্রতিটি বিষয় বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যবিধিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সব শিক্ষক-কর্মচারী টিকা নিয়েছেন। বিশেষ করে হাত ধোয়া এবং মাস্ক পরার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। স্কুল প্রাঙ্গণে হাত ধোয়া ও তাপমাত্রা পরিমাপ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

করোনা কালেই রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিয়েছেন অধ্যাপক আমেনা বেগম। যোগদানের পর এখনও শ্রেণিকক্ষে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাননি তিনি।

দীর্ঘদিন পরে হলেও কলেজ খোলার খবরে উচ্ছ্বসিত এই শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীরা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ। দীর্ঘদিন পর কলেজ খুলবে, আমরা শিক্ষার্থীদের দেখবো, ক্লাস করাবো- এ এক অন্যরকম আনন্দ।

গ্রামের শিক্ষার্থীরা বেশি আনন্দিত

টানা দেড় বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় গ্রামের শিক্ষার্থীদের বিরক্তির শেষ নেই। গতকাল মোবাইলে একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, গ্রামে ইন্টারনেট নেই, প্রযুক্তি নেই। শহরের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে গেলেও আমরা পিছিয়ে পড়েছি। স্কুল বন্ধ থাকায় পড়াশোনা গোল্লায় গেছে। আমাদের মতো আমাদের অভিভাবকরাও চিন্তিত ছিলেন। এখন বিদ্যালয় খলায় আশা দেখতে পাচ্ছি।

অভিভাবকরা বলছেন, অনেক বাচ্চা পড়াশোনাই ছেড়ে দিয়েছে। স্কুল খোলার খবরে আমাদের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। পরিস্থিতি যাইহোক বিদ্যালয় আর কোনোভাবেই যাতে বন্ধ না হয় এই অনুরোধ করেন তারা।

উদ্বিগ্ন ইংলিশ মিডিয়ামের অভিভাবক

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শতভাগ টিকার আওতায় না এনে স্কুল কলেজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম প্যারেন্টস ফোরাম। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক মঞ্জুর সাকলায়েন বলেন, আমরা স্কুল, কলেজ খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।

তবে আমরা চাই আমাদের বাচ্চাদের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের আশঙ্কা টিকা না দিয়ে স্কুল খুলে দিলে পরিস্থিতি ম্যাসাকার হবে। যুক্তরাষ্ট্রে স্কুল খুলে দেওয়ার পর পাঁচ লাখ শিশু করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বলে তারা জানান।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (বিআইজিডি) ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯ ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালিত হয়।

প্রাথমিকের জন্য নির্দেশনা

সরাসরি শ্রেণি পাঠদানের আগেই শিক্ষকরা অভিভাবকদের সঙ্গে মোবাইল ফোন অথবা ভার্চুয়ালি যোগাযোগ করে জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের জরুরি তথ্য অবহিত করবেন। শনিবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে।

নির্দেশনায় জানানো হয়, কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি ও পরামর্শক কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোলার বিষয়ে কোভিড-১৯ স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রস্তুত করে ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।

ওই স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর মোতাবেক প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরাসরি পাঠদান করার আগে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের মোবাইল ফোন, ভার্চুয়াল মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে ‘করণীয় ও বর্জনীয়’ বিষয়, সঠিকভাবে মাস্ক পরার নিয়ম, যেসকল শিক্ষার্থীদের কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ থাকবে তাদের বাড়িতে কোয়ারেন্টিন/আইসোলেশনে থাকা এবং তাদের সেবা-শুশ্রূষা করার নির্দেশনা প্রদান, যেসকল শিক্ষার্থী কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ নিয়ে বাড়িতে কোয়ারেন্টিন/আইসোলেশনে থাকবে তাদের অনুপস্থিতি হিসেবে গণ্য হবে না- এসব তথ্য অভিভাবকদের অবহিত করবেন।

সংক্রমণ বাড়লে বন্ধ করে দেয়া হবে

শনিবার জামালপুর সার্কিট হাউজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ফলে সংক্রমণ বেরে গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফের বন্ধ করে দেয়া হবে। শিক্ষার্থীদের পরিবারে কেউ করোনা সংক্রমিত হলে তাঁকে বিদ্যালয়ে না যাওয়ার অনুরোধ করেন দীপু মনি। বছরের শেষভাগে এসএসসি ও এইচএসসির পাশাপাশি পঞ্চমের প্রাথমিক সমাপনী, অষ্টমের জেএসসি-জেডিস এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী।

আবাসিক হোস্টেল খুলতে ১৪ নির্দেশনা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক শিক্ষার্থীদের হোস্টেল চালু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ১৪ নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। সুতরাং হোস্টেল চালুর ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধির পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ