কোনো প্রস্তাবেই সাড়া নেই বেসিক ব্যাংকের খেলাপিদের

বেসিক ব্যাংকে

রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল আগেও। তাতে সাড়া দেননি খেলাপিরা। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধার ক্ষেত্রেও। বিশেষ এ সুবিধা পেতে অন্যান্য ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহকরা যখন তোড়জোড় শুরু করেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণখেলাপিরা তখনো নির্বিকার। যদিও ঋণখেলাপিদের বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়ে সম্প্রতি জারি করা প্রজ্ঞাপনটি স্থগিত করেছেন উচ্চ আদালত।

জানা যায়, বেসিক ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের বড় অংশেরই কোনো খবর নেই ব্যাংকের কাছে। চেষ্টা করেও এসব খেলাপি গ্রাহকের নাগাল পাচ্ছে না ব্যাংকটি। শুধু শীর্ষ ১৭ গ্রাহকের কাছেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এ গ্রাহকদের মধ্যে আমাদের বাড়ি লিমিটেডের কাছে খেলাপি ঋণ ৫৪৩ কোটি ২২ লাখ, অ্যামারাল্ড অটো ব্রিকস অ্যান্ড অ্যালিডের ২৩৬ কোটি, ফিয়াজ গ্রুপের ১৯৫ কোটি, ওয়েল টেক্স অ্যান্ড এইডের (আদিব ডায়িং) ১৯২ কোটি, মাইমকো কার্বন লিমিটেড অ্যান্ড অ্যালাইডের ১৬৬ কোটি, ভাসাভি ফ্যাশন অ্যান্ড অ্যালিডের ১৫৮ কোটি, অ্যারিস্টোক্র্যাট গ্রুপের ১৩৪ কোটি, রাইজিং গ্রুপ ১৩২ কোটি, আরআই এন্টারপ্রাইজের ১৩১ কোটি, ডেলটা সিস্টেম লিমিটেডের ১২৮ কোটি, অ্যামারাল্ড অয়েল অ্যান্ড অ্যালিডের ১২৪ কোটি, ম্যাপ অ্যান্ড মুলার গ্রুপের ১২২ কোটি, আইজি নেভিগেশন লিমিটেডের ১২০ কোটি, বে নেভিগেশন লিমিটেডের ১১৭ কোটি, ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপব্রেকিং লিমিটেডের ১১৪ কোটি, প্রোফুশন টেক্সটাইল লিমিটেডের ১১২ কোটি এবং মা টেক্সের কাছে ১১১ কোটি টাকা। এসব খেলাপি গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করেও অর্থ আদায় করতে পারছে না বেসিক ব্যাংক। ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগেও সাড়া দিচ্ছে না তারা।

এ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মাজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, শুধু শীর্ষ খেলাপিই নয়, অন্য ঋণখেলাপিদের কাছ থেকেও টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। অধিকাংশ ঋণখেলাপির বিরুদ্ধেই ব্যাংকের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে ব্যাংক খেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এছাড়া ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে গ্রাহকদের পর্যাপ্ত জামানতও রাখা হয়নি। বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালার আলোকে কিছু গ্রাহকের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার আশা ছিল। সেটিও এখনো দেখা যায়নি।

অতীতের লুটপাটের চূড়ান্ত ধাক্কা লাগে বেসিক ব্যাংকের ২০১৬ সালের নিট মুনাফায়। বছরটিতে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকায়। এরপর ২০১৭ সালে ৬৮৪ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে বেসিক ব্যাংক। ২০১৮ সালেও ৩৫৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে ব্যাংকটি। টানা ছয় বছর বেসিক ব্যাংক নিট লোকসান দিয়েছে ৩ হাজার ১৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেও (জানুয়ারি-মার্চ) প্রায় ৯০ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান গুনেছে ব্যাংকটি।

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ ছিল ১৪ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার ঋণ। খেলাপি হওয়া ঋণের ৯৯ শতাংশই মন্দ মানের (ব্যাড অ্যান্ড লস)। একই সময়ে বেসিক ব্যাংক ৪৪৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে।

বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে আমরা রাতারাতি আমানত ও ঋণের সুদহার ৬-৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছিলাম। কিন্তু যাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এটি করেছে, তারাই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। ঋণের সুদহার কমানোর কারণে বেসিক ব্যাংক বড় লোকসান দিয়েছে।

এদিকে অনেক দিন থেকেই ব্যাংকর পুরো কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। ১০ মাস ধরে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ শূন্য। মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদমর্যাদার একজন ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পালন করছেন। রুটিন কাজের বাইরে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো তত্পরতা নেই বললেই চলে। ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতার কারণে পরিচালনা পর্ষদও ঝিমিয়ে পড়েছে। শুধু আমানত সংগ্রহ, বিভিন্ন সেবা সংস্থার বিল ও ফি জমা নেয়া, কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও সেবা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বেসিক ব্যাংকের কার্যক্রম।

গত সোমবার দুপুর ১২টায় ব্যাংকটির কারওয়ান বাজার শাখায় গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। কোনো গ্রাহক নেই ব্যাংকে। গল্পগুজব করে সময় কাটছে কর্মকর্তাদের। প্রায় একই পরিস্থিতি দেখা গেল বেসিক ব্যাংকের রাজধানীর দিলকুশা শাখায়। অথচ ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে তখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি এলাকার অন্য সব ব্যাংকের শাখাগুলোয় ছিল গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড়। শুধু মতিঝিল কিংবা কারওয়ান বাজার শাখার নয়, বরং ব্যাংকটির ৭২টি শাখায়ই প্রায় একই পরিস্থিতি। বেসিক ব্যাংকের বেশির ভাগ শাখার ঋণ বিতরণ পাঁচ বছর ধরে বন্ধ।

১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড বা বেসিক নামে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটির সাফল্য ছিল গর্ব করার মতো। সরকারি ব্যবস্থাপনায়ও বাণিজ্যিক ব্যাংক ভালো করতে পারে, এর উদাহরণ ছিল বেসিক ব্যাংক। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয় ব্যাংকটির বিপর্যয়। ২০১৩ সালে এসে প্রথমবারের মতো লোকসানে পড়ে ব্যাংকটি। এরপর লোকসানের পাল্লা কেবল ভারীই হয়েছে বেসিক ব্যাংকের।

বেসিক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সালেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি প্রায় ৬৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। পরবর্তী সময়ে তা কমে ২০১২ সালে ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। পরের বছরই ৫৩ কোটি টাকা লোকসান করে ব্যাংকটি। ২০১৪ সালে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির লোকসান বেড়ে হয় ৩১৪ কোটি টাকা।

বেসিক ব্যাংকের বিপর্যয়ের শুরু ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর হাতে। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ওই সময়েই ঘটে বড় অংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা। সে সময় বেসিক ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে ছিলেন কাজী ফখরুল ইসলাম। বেসিক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবদুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ১৪১ কোটি টাকা, যা সে সময় পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের ৪ শতাংশ। এর পর থেকেই বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ২০১৮ সাল শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ, প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা করে মূলধন ও সঞ্চিতি ঘাটতি নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। গত ছয় বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দেয়া বেসিক ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি আরো বাড়ছে। মূলধন জোগান দিতে বেসিক ব্যাংককে সরকার এরই মধ্যে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দিয়েছে। এর পরও সরকারের কাছে আরো ৪ হাজার কোটি টাকা চেয়ে আবেদন করেছে বেসিক ব্যাংক।

বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মাজিদ বলেন, এমডি নিয়োগ দেয়ার জন্য একটি শক্তিশালী সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটি অনেক চেষ্টা করে যোগ্যদের একটি প্যানেল তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। অথচ এতটি মাস চলে গেল, বেসিক ব্যাংক এমডি পেল না। এমডি নিয়োগ নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে আমি শুধু বেদনাহতই নই, ক্ষুব্ধও।

Comments

comments